খুলনা বিভাগে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতি হচ্ছে উদ্বেগজনক হারে। গত এক সপ্তাহে বিভাগের ১০ জেলায় মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২০ জন। তাদের মধ্যে ৫৮ জন এখনো চিকিৎসাধীন। অনেক রোগীর শরীরে দেখা দিচ্ছে নতুন নতুন উপসর্গও। গত শনিবার মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। এদিকে অন্যান্য রোগীদের সাথেই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গু কর্ণারের কথা বললেও কোন ওয়ার্ডে নেই এর অস্তিত্ত্ব।
বেশির ভাগ ওষুধই বাহির থেকে কিনতে হচ্ছে রোগীদের। ডেঙ্গু চিকিৎসায় সব থেকে বেশি ব্যবহৃত উপকরণ স্যালাইন হাসপাতাল থেকে দেওয়া হচ্ছে না অভিযোগ রোগীদের। আবার অনেক রোগী ভর্তি হয়ে অবস্থান করছেন না হাসপাতালে। সংক্রমণ আরো বাড়ার আশংঙ্কা চিকিৎসকদের। উপসর্গ দেখা দিলে আতংকিত না হয়ে হাসপাতালে আসার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সরেজমিন খুমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন ওয়ার্ডে যত্রতত্র চিকিৎসা নিচ্ছেন ডেঙ্গু রোগীরা। তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোন কর্ণার নেই। সাধারণ ওয়ার্ডে ও মশারি বিহীন বিছানায় চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা। ডেঙ্গু রোগী লিটন সরদারকে দেখা যায় ১৯-২০ ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্যান্য সকল রোগীর সাথেই। রোগীর বিছানায় মশারি টানানো দেখা যায়নি।
এ ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স জানায়, জায়গা না থাকায় এ বছর ডেঙ্গু কর্ণার করা হয় নাই।
হাসপাতালে ভর্তি রেজিস্ট্রারে নাম থাকলেও কিছু ডেঙ্গু রোগীকে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে খুজে পাওয়া যায় নাই। নার্সদের দাবি অনেকেই ভর্তি হয়ে এদিক সেদিক চলে যায় বা ঘুড়ে বেড়ায়। এছাড়া রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, ঠিকমত ওষুধ সেলাইন সরবরাহ করছে না। সব বাহির থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।
খুমেক হাসপাতালের তথ্য মতে, ডেঙ্গু আক্রান্তে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ৫৮জন। ৪৪ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। জুন মাসের শেষ ১৫ দিন ২২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ জন। আর চিকিৎসাধীন আছেন ৮জন।
এর মধ্যে গত শনিবার এক শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এ নিয়ে চলতি বছরে খুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খুমেকে ভর্তি বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার মোঃ রিয়াজুল বলেন, চিকিৎসা ভালোই দিচ্ছে হাসপাতাল থেকে। কিন্তু ওষুধ সব বাহির থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। সাথে সেলাইনও আমরা কিনে নিয়ে আসছি।
আরেক রোগীর স্ত্রী বলেন, তার স্বামী ক্ষেত-খামারে কাজ করে। হয়তো সেখান থেকে মশার কামড়ে ডেঙ্গু হতে পারে। প্রথমে তাকে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। জ্বর না কমায় পরীক্ষা করে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। পরে খুলনায় নিয়ে আসি। এখানে চিকিৎসা ভালো। তবে বেশীর ভাগ ওষুধ কিনে আনতে হয়।
এ বিষয়ে খুলনা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা থাকলেও সিটি করপোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। আগের তুলনায় আরও বেশি মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়োজন হলেও মনে হচ্ছে আগের থেকে তা কমিয়ে ফেলেছে তারা। হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এবং ডেঙ্গু ইউনিটের ফোকালপারসন ডা. খান আহমেদ ইশতিয়াক বলেন, বর্ষাকাল শুরু হওয়ার পর থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে জুন থেকে সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু রোগীর বৃদ্ধি পাওয়ারই মৌসুম। আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে এবং সংক্রমন বাড়ছে।
বেশীর ভাগ রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু ইউনিট আলাদাভাবে করা না হলেও আমাদের টিম সর্বাত্মক সহযোগিতার সাথে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া তিনি সকলকে আরো বেশী সচেতন থাকার পরামর্শ দেন। এবং উপসর্গ দেখা দিলে আতংকিত না হয়ে হাসপাতালে আসার পরামর্শ দিয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের সকল প্রস্তুতি আছে। আমরা হাসপাতালের পরিবেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়া মশক নিধনের জন্য সিটি করপোরেশনের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছি। খুমেক হাসপাতালে সকল ধরনের কিটস পর্যাপ্ত আছে। খুমেকের মেডিসিন পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে ডেঙ্গু কর্ণার রাখা হয়েছে। সেখানে ডেঙ্গু রোগীর মশারি সরঞ্জাম আছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ডা. মোঃ মজিবুর রহমান জানান, মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার এবং হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখতে প্রতিটি জেলাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পড়ুন: জুলাই পদযাত্রা বাস্তবায়নে খুলনায় এনসিপির ছয় সেল
এস/


