ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনে শেষ মুহূর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। শুরুতে কয়েকটি আসনে একক প্রার্থীর এগিয়ে থাকার ধারণা থাকলেও মাঠপর্যায়ের প্রচার-প্রচারণা ও ভোটারদের সাড়া শেষ সময়ে এসে হিসাব-নিকাশ জটিল করে তুলেছে।
খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। নব্বই-পরবর্তী চারটি সংসদ নির্বাচনে এখানে বিএনপি প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। এবারও দলটির হয়ে লড়ছেন মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ের সময়ও তিনি এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁকে অন্যতম জনপ্রিয় নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে এ আসনে জামায়াতের মহানগর সেক্রেটারি শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল প্রার্থী হওয়ায় ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সাবেক কাউন্সিলর হেলাল ওয়ার্ডভিত্তিক প্রচার-প্রচারণা এবং নারী কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন। এতে করে একতরফা লড়াইয়ের ধারণা বদলে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হয়েছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে খুলনা-৩ (খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী) আসনেও। বিএনপির কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সক্রিয় এবং দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে জনপ্রিয়। তবে জামায়াতের মহানগর আমির মাহফুজুর রহমান প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই জোরালো প্রচারণা চালিয়ে সমর্থন আদায়ে সক্রিয় হয়েছেন। ভোটারদের মতে, শেষ সময়ে এসে এ আসনেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান দীর্ঘদিন ধরে প্রার্থী হয়ে আসছেন। বিগত চারটি নির্বাচনে পরাজিত হলেও এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় শুরুতে তাঁকেই এগিয়ে রাখা হচ্ছিল। কিন্তু জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীর সরব প্রচারণা ভোটের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হিন্দু অধ্যুষিত এ আসনে কৃষ্ণ নন্দীর সক্রিয়তা ভোটের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
খুলনা-৪ (রূপসা-তেরখাদা ও দিঘলিয়া) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা সাখাওয়াত হোসেনও মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। ফলে এ আসনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে।
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে জামায়াতের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার অতীতে এমপি ছিলেন। এবার বিএনপির হয়ে লড়ছেন সাবেক এমপি আলী আসগার লবী। একইভাবে খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনেও বিএনপির মনিরুল হাসান বাপ্পী ও জামায়াতের মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে।
খুলনার ছয়টি আসনে এবার ১৩টি রাজনৈতিক দলের মোট ৩৮ জন প্রার্থী অংশ নিয়েছেন। তবে তীব্র লড়াই মূলত ১২ জন প্রার্থীকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত। পাঁচটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এবং একটি আসনে বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের শরিক দলের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
যদিও প্রার্থীরা নিজেদের বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, অতীতে অংশগ্রহণমূলক প্রতিটি নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি জয়ী হয়েছে এবং জনগণের আস্থা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল বলেন, পরিবর্তনের প্রত্যাশায় মানুষ নতুনভাবে ভাবছে এবং নিরাপদ, কর্মমুখর শহর গঠনের প্রত্যাশায় ভোট দেবে।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আ স ম জামশেদ খোন্দকার জানিয়েছেন, নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে এবং ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এদিকে জেলা বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান মনিরুজ্জামান মন্টু দাবি করেন, ছয়টি আসনেই তাঁদের প্রার্থীদের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। তবে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেষ মুহূর্তে প্রচারণার গতি ও মাঠের সক্রিয়তাই নির্ধারণ করবে খুলনার ছয় আসনের চূড়ান্ত ফলাফল।
পড়ুন- মৌলভীবাজার ৫৫৪ কেন্দ্রে পাঠানো হল নির্বাচনী উপকরণ
দেখুন- নারীরাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির যোদ্ধা: প্রধান উপদেষ্টা


