ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে খুলনা-১ আসনে (দাকোপ–বটিয়াঘাটা) ধীরে ধীরে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু না হলেও দলীয় কর্মসূচি ও ব্যক্তিগত যোগাযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন প্রার্থীরা। ভোটের অঙ্কে এবারও সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে উঠে এসেছে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারদের ভূমিকা।
দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩ হাজার ৫৪২ জন। ভোটকেন্দ্র ১১৯টি এবং বুথ রয়েছে ৬৩৭টি। রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাব অনুযায়ী, মোট ভোটারের প্রায় ৪৬ থেকে ৪৮ শতাংশই সনাতন ধর্মাবলম্বী। ফলে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে এই ভোটব্যাংক বরাবরের মতোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই আসনে প্রধান লড়াইয়ের আভাস মিলছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে দলের সাবেক জেলা সভাপতি আমীর এজাজ খানকে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে কৃষ্ণ নন্দীকে, যিনি দলটির ডুমুরিয়া উপজেলা সনাতনী শাখার সভাপতি।
হিন্দু অধ্যুষিত এই আসনে জামায়াতের এমন প্রার্থী নির্বাচন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সনাতনী ভোট ভাগাভাগির সমীকরণ বদলাতেই এই কৌশল নিয়েছে দলটি।
নব্বই পরবর্তী আটটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, খুলনা-১ আসনে সনাতনী ধর্মাবলম্বী প্রার্থীদের বিজয়ের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এ সময়ে মাত্র একবার—১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে—বিএনপি প্রার্থী জয়ী হন। এছাড়া একবার শেখ হারুনুর রশীদ ও একবার শেখ হাসিনা নির্বাচিত হলেও অধিকাংশ নির্বাচনেই বিজয়ী হয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রার্থীরা।
এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। মনোনয়ন যাচাই শেষে এ আসনে বৈধ প্রার্থী ১০ জন, যার মধ্যে ৬ জনই সনাতন ধর্মের।
বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খান পাঁচবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তার দাবি, প্রতিটি নির্বাচনেই বিএনপির ভোট বেড়েছে এবং এবার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “সব ধর্মের মানুষই আগের নির্বাচনগুলোতে প্রতারিত হয়েছে। সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষও এখন পরিবর্তন চায়। নানা বিভ্রান্তি থাকলেও ভোটাররা ধানের শীষের পক্ষেই একজোট হচ্ছে।”
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী বলেন, পরিবর্তনের রাজনীতির জন্য জামায়াতই বিকল্প। তিনি আরও বলেন, “আনুষ্ঠানিক প্রচার না থাকলেও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করছে। শুধু হিন্দু নয়, সব শ্রেণির মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি।”
এই আসনে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন— সিপিবির কিশোর কুমার রায়, ইসলামী আন্দোলনের আবু সাঈদ, সম-অধিকার পার্টির সুব্রত মণ্ডল, খেলাফত মজলিসের ফিরোজুল ইসলাম, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির প্রবীর গোপাল রায়, স্বতন্ত্র প্রার্থী সুনীল শুভ রায়, জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর হোসেন এবং জেএসডির প্রসেনজিৎ দত্ত। এদের মধ্যে কয়েকজনের রয়েছে আগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা।
দাকোপ এলাকার নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট নিতাই গোলদার মনে করেন, ভোটাররা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। “প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কিন্তু উপকূলীয় এলাকা হিসেবে জলবায়ু ঝুঁকি, নদীভাঙন ও জীবিকাসংকট—এই বিষয়গুলোতে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে ভোটারদের আস্থা পাওয়া কঠিন হবে।”
সব মিলিয়ে খুলনা-১ আসনে এবারের নির্বাচনে সনাতনী ভোটের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। শেষ পর্যন্ত এই ভোটব্যাংক কোন দিকে ঝুঁকে পড়ে, তার ওপরই নির্ভর করবে জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত হিসাব।
পড়ুন- নেত্রকোনায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সহিংসতা: প্রশাসনের কাছে অভিযোগ


