১৪/০২/২০২৬, ১৬:৪৪ অপরাহ্ণ
28 C
Dhaka
১৪/০২/২০২৬, ১৬:৪৪ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

গণভোট কী? বাংলাদেশসহ ইতিহাসে আলোচিত যত গণভোট

সংস্কারের উদ্যোগে দেশে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে গণভোট। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জনগণের সরাসরি মতামত জানার এই প্রক্রিয়াই মূলত গণভোট, যা ইংরেজিতে পরিচিত ‘রেফারেন্ডাম’ নামে। এতে সাধারণ নাগরিকরা ভোটের মাধ্যমে জানান—কোনো প্রস্তাব তাঁরা গ্রহণ করছেন, নাকি প্রত্যাখ্যান করছেন। অর্থাৎ সংসদ বা সরকারের পরিবর্তে সিদ্ধান্ত দেয় জনগণ।

বিজ্ঞাপন

বহু দেশেই গণভোট আয়োজনের ইতিহাস রয়েছে। তবে অল্প কয়েকটি দেশই এর প্রকৃত সফলতা পেয়েছে। সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু করে নরওয়ে, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য—দেশগুলোতে জনগণের রায় বদলে দিয়েছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। অন্যদিকে কিছু গণভোটের প্রভাব ছিল সীমিত।

গণভোটের সূচনা হয় ফ্রান্সে

গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৭৯৩ সালে ফ্রান্সে, যখন নাগরিকদের সরাসরি মতামত নেওয়া হয় নতুন সংবিধান (মন্টানিয়ার্ড কনস্টিটিউশন) অনুমোদনের বিষয়ে। পরে আধুনিক ফ্রান্সে ‘প্লেবিসাইট’ নামে পরিচিত ভিন্ন ধরনের গণভোটের প্রচলন ঘটে, যেখানে সরকার নির্দিষ্ট প্রস্তাব বা নীতিকে জনগণের কাছে সরাসরি উপস্থাপন করে।

১৭৯৩ সালের ভোটে প্রায় সব অংশগ্রহণকারী নাগরিক নতুন সংবিধানের পক্ষে রায় দেন। এটি ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের এই উদ্যোগ শুধু ইতিহাসে পথপ্রদর্শক নয়, বরং বিশ্বব্যাপী সরাসরি গণতন্ত্রের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

১৯৫৮ সালে ফরাসি নেতা চার্লস দ্য গল নতুন সংবিধান অনুমোদনের জন্য গণভোট আয়োজন করেন। বিপুল সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত হয় ফ্রান্সের পঞ্চম প্রজাতন্ত্র (ফিফথ রিপাবলিক)—যা আজও কার্যকর।

সর্বশেষ ২০০৫ সালে দেশজুড়ে জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফ্রান্সে।

সুইজারল্যান্ড: সরাসরি গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র

বিশ্বের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিত গণভোটের জন্মভূমি হলো সুইজারল্যান্ড। ১৮০২ সালে সেখানে প্রথম আংশিকভাবে নাগরিক মতামত নেওয়া হয়।

১৮৪৮ সালে নতুন সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর গণভোটকে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। তখন থেকে সুইস নাগরিকরা নিয়মিতভাবে জাতীয় ও স্থানীয় স্তরে আইন, নীতি ও সংবিধান সংশোধনে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন।

আজও সুইজারল্যান্ডে বছরে একাধিক গণভোট হয়। সরকার জনগণের রায় অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করে—তাই দেশটিকে বলা হয় ‘সরাসরি গণতন্ত্রের জন্মভূমি।’

নরওয়ে: গণভোটে অর্জিত স্বাধীনতা

এই ভোট ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম সফল গণভোট হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এতে ছিল সর্বাধিক জনসম্পৃক্ততা ও সার্বজনীন ঐক্য।

১৯০৫ সালে নরওয়ের জনগণ গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করেন, তারা আর সুইডেনের অধীনে থাকবে না। বিপুল সমর্থনে নাগরিকরা স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেন এবং নরওয়ে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে।

যুক্তরাজ্য: ব্রেক্সিটের ঐতিহাসিক রায়

২০১৬ সালের ‘ব্রেক্সিট’ গণভোটে যুক্তরাজ্যের জনগণ ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন—দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বের হবে। ভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষে জয়ী হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার।

সরকার জনগণের রায় মেনে নেয় এবং ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বের হয়ে আসে।
এটি আধুনিক গণতন্ত্রে জনগণের ইচ্ছার সরাসরি প্রয়োগের অন্যতম উদাহরণ।

তুরস্কে ৭ গণভোট

তুরস্কে এখন পর্যন্ত সাতটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—যার প্রতিটি সংবিধান সংশোধন বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

(১) ১৯৬১: সামরিক অভ্যুত্থানের পর নতুন সংবিধানের অনুমোদনে গণভোট। ৬২% ‘হ্যাঁ’।
2️⃣ ১৯৮২: নতুন সংবিধান অনুমোদনে ভোট। ৯১% ‘হ্যাঁ’।
3️⃣ ১৯৮৭: রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনুমতি। খুব সামান্য ব্যবধানে (৫০.২%) অনুমোদন।
4️⃣ ১৯৮৮: স্থানীয় নির্বাচন আগাম করার প্রস্তাবে ৬৫% ‘না’।
5️⃣ ২০০৭: সংবিধানে পাঁচটি সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদিত।
6️⃣ ২০১০: ২৬টি সংশোধন প্রস্তাবে ৫৮% ‘হ্যাঁ’।
7️⃣ ২০১৭: সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল শাসনব্যবস্থা চালু—৫১.৪% ‘হ্যাঁ’।

২০১৭ সালের গণভোটটিকে সবচেয়ে বিতর্কিত ধরা হয়, কারণ এতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

চিলি: তিনটি গণভোটে পরিবর্তনের ইতিহাস

চিলিতে মোট তিনবার জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৮৮: স্বৈরশাসক আগুস্তো পিনোশের শাসন বাড়ানোর প্রস্তাবে ৫৬% ‘না’। ফলে একনায়কতন্ত্রের অবসান।
২০২০: নতুন সংবিধান প্রণয়নে অনুমোদন—৭৮% ‘হ্যাঁ’।
২০২২: নতুন সংবিধান অনুমোদনে ভোট—৬২% ‘না’; প্রস্তাব বাতিল হয়।

বাংলাদেশে গণভোটের ইতিহাস

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—দুটি প্রশাসনিক ও একটি সাংবিধানিক।

1️⃣ ১৯৭৭: রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসন বৈধতা যাচাই—৯৮.৯% ‘হ্যাঁ’।
2️⃣ ১৯৮৫: হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির বৈধতা যাচাই—৯৪.৫% ‘হ্যাঁ’।
3️⃣ ১৯৯১: সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের গণভোট—৮৪.৩৮% ‘হ্যাঁ’।

আবারও গণভোটের পথে বাংলাদেশ

২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব দেয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।

‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া অনুযায়ী—সংবিধানের ৪৮টি সংশোধনী প্রস্তাব গণভোটে উপস্থাপন করা হবে।

গণভোটে ব্যালটে প্রশ্ন যেমন থাকবে

“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং এর তফসিল-১ এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?”

‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটে নির্ধারিত বাক্সে ভোট দিতে হবে।

এদিকে গণভোটে সমর্থন পেলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা ২৭০ দিনের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ না হলে গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।

ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে বা একই দিনে গণভোট আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে।

পড়ুন: শতভাগ প্রস্তুত ইসি, ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন