২২/০২/২০২৬, ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ
19.8 C
Dhaka
২২/০২/২০২৬, ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

গল্প : কালপুরুষ

পৌষের শেষ। মাঘের কুয়াশা গায়ে হিম ধরায়। সূর্য মাথার উপরে তখন। দূরের উঠোনে খাবারের খোঁজে মা মুরগি। সদ‍্য জন্মানো তেরটি ছানা চিঁ চিঁ রব তুলেছে চারপাশে। কোন একটা পোকা ধরে অদ্ভুত স্বরে বাচ্চাদের কাছে ডাকছে মুরগিটা।

“খুকক… খুককক… খুকককক…”

মায়ের আওয়াজ শুনে গোল হয়ে ঘিরে ধরেছে বাচ্চারা। দূরের আকাশে চিল উড়ে যাচ্ছে। নিচে সতর্ক চোখ। সুযোগ পেলেই ছোঁ মেরে পালাবে বাচ্চা মুখে। মা মুরগিটা তাই বারবার উপরে তাকাচ্ছে। মনে তার অজানা আশঙ্কা। যদি কিছু ঘটে যায়।

একটু দূরে বসে আলম জেডা। পানের রস গিলে ফেলে সুপারি চূর্ণ বিচূর্ণ করছে তার দাঁত। কুটকুট আওয়াজ বেরুচ্ছে জেডার মুখ থেকে। সামনে উঠোনে ছড়ানো অবারিত চিনাবাদাম। তিনি পাহারা দিচ্ছেন।

ক্ষণে ক্ষণে কানে এসে বাজছে একটা আওয়াজ। ক্ষীণ কণ্ঠস্বরের কাতর অনুনয় যেন। গোটা দিন দুই ধরে, থেকে থেকে কানে বাজছে। জেডার মন উদাস হয়।

এই ভরদুপুরেও কানে বাজছে যন্ত্রণার ধ্বনি। গলায় ঝোলা গামছায় কপালের ঘাম মুছে তিনি হাঁটছেন বিছিয়ে রাখা বাদামের উপর। আলতো পায়ে উল্টে দিচ্ছেন বাদাম।

পায়ের চাপে অদ্ভুত একটা আওয়াজ খেলে গেলো উঠোন জুড়ে। জেডা আরও সতর্ক হলেন। তার পায়ের আওয়াজ ধীরে ধীরে কমতে লাগলো।

উঠোন লাগোয়া বড় রাস্তা। সে রাস্তা জুড়ে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছেন দু’জন। আব্বা । সাথে তার বন্ধু শামসুল করিম।

আব্বার পায়ে দ্রুত চলার তাল। কপাল বেয়ে ঘাম বেরিয়েছে তারও। দু’কদম পিছিয়ে শামসুল করিম সাহেব। আব্বার ডাক্তার বন্ধু।

আব্বা পেছন ফিরে তাকালেন। বড় রাস্তা দিয়ে হুশ করে একটা ট্রাক চলে গেলো। তখনও এরশাদ সাহেব ক্ষমতায়। দুই বেগমের তীব্র আন্দোলনে মাঘের শীতের মতন কাঁপছেন তিনি।

“ঠক…ঠকক….ঠককক…”


রবিবারের দুপুর। আজ আর স্কুলে যাননি আব্বা। ভোর হতেই ছুটেছেন হাতিয়া টাউন হলে। সেখান বসেন ডাক্তার শামসুল করিম। হাতের পসার ভালোই।

সুদূর কুমিল্লার চন্দ্রগঞ্জে বাড়ি তার। আব্বার সাথে পরিচয় দীর্ঘদিনের। দু’জনে বন্ধুত্ব হয়েছে বেশ কয়েকবছর।

এর আগেও তিনি এমুখো হয়েছেন। ঈদে কিংবা বিশেষ দিনে, হাওলাদার বাড়িতে তিনি এসেছেন।

তবে আজকের সময়টা অন‍্যরকম। ঠিক যেন উত্তরের জঙ্গল থেকে আসা কাঠঠোকরার একটানা আওয়াজের মতো। বুকে কাঁপন ধরায়। ভরদুপুরে। সোজা বুকে গিয়েই যেন লাগে।

“ঠুক… ঠুকক… ঠুককক…”

আব্বার পায়ের গতি বাড়লো। চোখ তখন উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে। তিনি আবারও তাকালেন পেছনে।

কালো রঙের প্রেসিডেন্ট ব‍্যাগ হাতে এগিয়ে আসছেন শামসুল করিম। তার চোখ নির্ভার। তিনি থামলেন।

– হুনো সাবুদ্দিন সাব, আগেই কইসিলাম… আঁর বাইগ্না কষ্ট দিবো। কতা বুল না ঠিক কইলাম কও।

– কতা ঠিক কইসেন ভাই। অন আঁর মিসেসের কী অইবো কন। বেচারী কষ্ট কইত্তেসে আইজ দুইদিন। কোন উপায় তো আর দেইখতেসিনা। হাসপাতালে যে নুমু, হিয়ানেওতো খাইল‍্যা স‍্যালাইন লাগাই হোতাই থুইবো।

– আল্লা বরসা। গরে চলো। চালমার মারে আঁই বইন ডাইকসি। আঁর বইনের বিফদ আল্লাই উদ্দার কইরবো। তুঁই শুদু আল্লা আল্লা করো। আগে চলো বিত্রে। দেখি কী অবস্তা।


আব্বা রান্না ঘরের উঠোন পেরিয়ে পুকুর পাড়ে এলেন। হাঁসের পাল ভেসে বেড়াচ্ছে। পুকুরের সিঁড়িতে বসে বড্ডা আপা। খেলছে। মন বিষন্ন।

কালো আর নীল রঙের মিশেলের ফ্রক পরা। পুরনো কয়লা ছুঁড়ে মারছে পুকুরে। পানিতে ঢেউ তুলে সে কয়লা ডুবছে গভীরে। আপার চোখে পানি। আব্বাকে দেখে যেন গড়িয়ে পড়লো।

– আব্বা, আম্মার কী অইসে, খাইল‍্যা কান্দে কিল্লাই? আইজ দুইদিন দরি হুতি রইসে। আইজ্জা ইসকুলেও যাই নো হিয়ারলাই। সুমানি তো খাইল্লা কান্দে। লুমানি তো বুকের দুদ চা অ নো কিচ্চু মুখে তোলে না। হারাদিন ক‍্যাঁ ক‍্যাঁ করে।

– আল্লা বরসা মা। দোয়া করো। তঁর বাই আইবো দুইন্নাইত। আল্লা আল্লা করো।

আব্বার কথা শুনে হাসি খেলে গেলো আপার মনে। খেলনা বাটি নিয়ে ধুলো মাটিতে একাকার মেঝ আপা।

লুমা আপা রিজু বুজির কোলে। তার ঘুম আসি আসি করছে। আব্বা একবার কোলে নিয়ে কপালে চুমু খেলেন। তার দীর্ঘশ্বাসে উড়ে গেলো লুমা আপার চুল।

আব্বা সামনে পা বাড়ালেন। চারপাশে যেন মৃত‍্যুর ঘ্রাণ। আম্মা কাতরাচ্ছেন তখনো। ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরিয়েছে মিনিট দশেক আগেই। দিন দুই আগে শুরু আম্মার প্রসব বেদনা।


সেদিন মাঘের দুপুর। এই পৌষ পেরুলো বলে। টিনের ফুটো গলে রোদ এসে আলো জ্বালছে পুরো রান্না ঘরে।

সারি সারি পেতে রাখা বেতের মোড়া পেরিয়ে ঢেঁকির বাম দিকে উত্তরের কোনায় শুয়ে আম্মা। গায়ে পাতলা কাঁথা। তিনি ঘামছেন।

বিশাল রান্না ঘরের এই কোনার অংশে ঠাঁই মিলেছে তার। আঁতুড় ঘর। চৌকির চারপাশ ঘেরা মশারিতে। মশারি ঢেকেছে পাতলা কাঁথা।

অন্তঃরালের আড়ালে তখন জীবনের আসি আসি। আম্মা লড়ে যাচ্ছেন বিরামহীন। পাশে বড্ডা চাচী আম্মা। লতি দাদী। রিজু বুজি।

আম্মার আর্তনাদে যেন উড়ে গেলো পেয়ারা গাছের ডালে বসা তিলা ঘুঘু। জানালার বাইরের দিকে। কাজী পেয়ারা গাছের ডালে ছিলো ঘুঘু যুগল। নীড় বাঁধবে বলে। এপাশে বদ্ধ জানালার আলো আঁধারিতে অপেক্ষা তখন জন্মের।

সাল তখনো নব্বইয়ের ঘর ছোঁয় নি। আরও বছর খানেক বাকি গণঅভ‍্যুত্থানের। দেশ উত্তাল হচ্ছে।

রবিবার দুপুর বেলা। ঘরে ঢোকার আগে আব্বা শব্দ করলেন গলায়। কাশির মতো অনেকটা।


“উঁহহু… ওঁহহো… ওঁহহো….”

কাশির শব্দে ঘোমটা আরও টেনে দিলেন বড্ডা চাচী আম্মা। আম্মা তখন প্রায় অচেতন। টানা বেদনায় তিনি ভেঙে পড়ছেন চুর চুর করে।

মাঘের মধ‍্যদুপুরেও তার কপাল বেয়ে ঘামের আঁকিবুকি। একটু সরে বসলো লতি দাদী। তার আগে আঁচলে মুছে দিলো আম্মার মুখ।

প্রসব বেদনায় কেঁপে কেঁপে উঠছেন তিনি। ক্ষণে ক্ষণে। শ্বাসের ধ্বনিতে নানান ব‍্যঞ্জনার আঁকিবুকি। এর আগেও তিনবার সয়েছেন। জন্ম ব‍্যাথা।

বড্ডা আপা এসেছেন আশির শুরুতে। তার বছর দুই বাদে মেঝ আপা। আর লুমা আপা এসেছে বছর দুই আগে। গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে শিখেছে মাত্র।

সাতবাড়িয়া গ্রাম। বনেদী হাওলাদার বাড়ী। দাদা মোবাশ্বের তখনো নাতির মুখ দেখেননি। বড় ছেলে আব্বার ঘরে পরপর তিন নাতনী। বড্ডা আপা। মেঝ আপা আর লুমা আপা।

বড্ডা কাকাও বাবা হলেন। বড্ডা চাচী আম্মার কোল আলো করে এসেছেন এলু আপা। চোট্ট দাদুর কিছুটা যেন মনই খারাপ হলো। নাতনীদের ভিড়ে তিনি এবার বাতি চান। বংশের। নাতি চাই তার।

সময় গড়াচ্ছে। আব্বার মুখে রাজ‍্যের চিন্তা। কী করে তার বিপুলকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করা যায়। ডাক্তার শামসুল করিমের কথাও তার মাথায় ঘুরছে। তিনি কী করে বুঝলেন, এবার পুত্র সন্তান আসবে।

আব্বা মমতা নিয়ে তাকালেন আম্মার চোখে। ঘনকালো ঐ চোখের বেদনায় যেন নিজেই বিদ্ধ হচ্ছেন তিনি।

আম্মা ব‍্যাথায় চিৎকার করে উঠলেন। শামসুল করিমের কপালের ভাঁজ যেন আরও গভীর হলো। তিনি গম্ভীর হলেন।

– সাবুদ্দিন সাব, বইনের অবস্তা তো খুব একটা সুবিধার ঠেইকতেসে না। এইখানে ওসুদপাত্তির ব‍্যবস্থা তো জানেনই। এক কাম করেন। একটা ক‍্যাপসুল লাইগবো। ওচখালী পাওয়া যাইবো। যত তাতাই আনা সম্ভব আনাইতো অইবো। আর একটা ইনজেকশন দিয়ে দিতেসি। ব‍্যাথা বাইড়বো তাতে। তা ভাইগ্না দুইন্নাইতে আইবো বুইজলাম। এতো হুলুস্তুল কইত্তেসে ক‍্যান? মাত্র না আট মাস?

– হ ডাক্তার সাব। বিপুল তো খাইতেও পারে নাই কিচু। অ হ‍্যাডে আইসে হইজ্জন্ত। খানা মুখে তুইলতে পারেনো আমনের বইনে। শুদু, হানি বাতেরে হেঁয়াজ মরিচ দি কঁচালী খাইসে। আর চাগলের দুদ খাইসে মাস দুই। আহারে বেচারি।

আব্বার কথা শুনে খুব একটা ভাবন্তর হলো না ডাক্তার সাহেবের। তিনি জানেন সব। এ বাড়ীতে তিনি আগেও এসেছেন। আমাদের প্রজন্মের সবার জন্মে তিনি ছিলেন। ভরসা হয়ে।

আব্বা চিন্তায় পড়লেন। ওছখালী অনেক দূরে। সাইকেলে ঘণ্টা খানেক পথ পেরিয়ে তবেই ফার্মেসি।

তিনি তাকালেন আম্মার দিকে। আটচল্লিশ ঘণ্টা পেরুতে চললোা। আরও সময় কি বাকি আছে? নাকি? তিনি আম্মার মুখে তাকালেন।


ঘোমটা তখনও আম্মার কপাল ঢেকে রেখেছে। রিজু বুজি সামনে এলেন এবার। কোলে লুমা আপা। পেটের ক্ষিদেয় কাঁদছে সে।

বুজি আম্মার বাম পাশে শুইয়ে দিলো লুমা আপাকে। আপা আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছে আম্মার দিকে। বড্ডা চাচী আম্মা নড়ে চড়ে বসলেন। দূরে পর্দার ফাঁক গলে চোট্ট দাদু তাকিয়ে।

বড্ডা দাদু বসে বড় রুমে। যেটাকে আমরা বলি আইতনা ঘর। তিনি পান চিবুচ্ছেন। আম্মার জন‍্য তার মনটা হুহু করে উঠলো।

তার বড় বউমা তখন জীবনের ছন্দে আছে। তাল হারালেই আঁধার নামবে জীবনে। তিনি কায়মনোবাক‍্যে মহান রবের কাছে দোয়া করছেন।

সময় গড়াচ্ছে। দূরে গরুর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে গোয়াল ঘর থেকে। প্রতিদিন সকালে আম্মা যান সেখানে। এই শরীরেও যত্ন করে গায়ে হাত বুলিয়ে দেন। গত দু’দিন তার দেখা না পেয়ে গরুটাও যেন অস্থিরতা প্রকাশ করছে।

আম্মা ব‍্যাথার দমকে নড়ে উঠছেন বারবার। ডাক্তার সাহেবের হাত তখন প্রেসিডেন্ট ব‍্যাগে। তিনি খুঁজছেন ইনজেকশন। মুহূর্তেই তার হাতে উঠে এলো সিরিঞ্জের কেইস। স্টেনলেস স্টিলের। টিনের ফুটো গলে আসা কিরণ যেন প্রতিফলিত হচ্ছে স্টিলে পড়ে।

তিনি খুঁজে বের করলেন অ‍্যাম্পুল। সন্তর্পণে। কাঁচের শিষিতে আম্মার বেদনা। ডাক্তারের টোকা পড়লো অ‍্যাম্পুলে। জীবনদায়ী ঔষধ তখন টুংটুং আওয়াজ তুলছে ডাক্তারের হাতে।

বড্ডা চাচী আম্মা ঘোমটা আরও টেনে দিলেন মাথার। আম্মার পায়ে হালকা মালিশ করছেন তিনি। সরিষার তেলের সাথে রসুনের ঘ্রাণ যেন ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। নিবিষ্ট মনে তিনি আল্লাহকে ডাকছেন।

আম্মা ঘামছেন। লজ্জা পাচ্ছেন। পর্দার বরখেলাপেই যেন আটকে গেছেন তিনি। সন্ধিক্ষণে। জীবন মৃত‍্যুর। যন্ত্রণার ভারেও লুমা আপাকে কাছে টেনে নিলেন তিনি।

ডাক্তার তখন তৈরী। গামছা দিয়ে অ‍্যাম্পুলের নীল রঙের বর্ডারে জোরে চাপ দিলেন তিনি। টুক করে একটা শব্দ হলো শুধু। ভাঙা অ‍্যাম্পুলে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে পুরোটা নিলেন তিনি।

শুধু হালকা শব্দ করলো লুমা আপা। দাঁত উঠেছে তার। কিড়মিড় করে কামড়াচ্ছে যা পাচ্ছে সামনে। আম্মার বাম হাতেই যেন কামড় বসালো সে। ব‍্যাথায় নড়ে উঠলেন আম্মা।

– ও মা গো…..

বড্ডা চাচী আম্মা বিছানা থেকে কোলে তুলে নিলেন লুমা আপাকে। পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে নিলেন। আম্মা তখনও অস্বস্তিতে। প্রসবের বেদনায় নীল হয়ে যাচ্ছেন যেন। সময়ের তালে।

– দেখি, বইন, এই ইনজেকশনটা শইল‍্যে গেলে ব‍্যাথা বাইড়বো। ভাই আচিলাম না হাতিয়া। কুমিল্লাত গেসিলাম। আমনের বইনেরও শইল সুবিদার না খুব একটা। দশটায় আইয়া গাঁডে হুঁইচলাম। হেরবাদে দেইখলাম সাবুদ্দিন সাবরে। হুইনাই রওনা অইসি। চা বইন, এক্কানা এমি হিরেন চাই। আশা করি, আল্লা দিলে, দ্রুত কাম সাইরবো। চাই সাবুদ্দিন সাব, আঁর বইনেরে এক্কানা ডাইনের মি কাইত করান। বইন আমনেও এককানা দরেন।


বড্ডা চাচী আম্মার দিকে ইঙ্গিত করলেন ডাক্তার সাহেব। সময় গড়াচ্ছে। দূরের উঠোনে আলম জেডার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। বাদামের উপরে তিনি হাঁটছেন ধীরে ধীরে।

আম্মা তখন প্রায় অচেতন। লুমা আপাকে রিজু বুজির কোলে দিয়ে আম্মাকে কাত হতে বললেন বড্ডা চাচী আম্মা। কোমরে দিলে তবেই দ্রুত কাজ শুরু করবে অক্সিটোসিন।

আব্বাও এসে হাত লাগালেন। সাবধানে আম্মাকে বাম পাশে কাত করাচ্ছেন আব্বা আর চাচীআম্মা ।

বড্ডা দাদুর হাতের লাঠির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন দূরে। পর্দার অন্তরালে।

ডাক্তার শামসুল করিম তৈরী। ইনজেকশন থেকে ধীরে ধীরে কয়েকফোঁটা ফেলে দিয়ে তিনি বাতাস মুক্ত করলেন। বিসমিল্লাহ বলে ধীরে ধীরে পুশ করলেন ব‍্যাথার ঔষধ।


– ইনজেকশন দেয়া হইসে, অন আল্লা আল্লা করেন। দশ হনরো মিনিটের মইদ‍্যে আল্লার রহমতে ব‍্যাতা বাইড়বো। বইন, দুইদিন ম‍্যালা কষ্ট কইরসেন। আর কিচুক্কন সইহ‍্য করেন। আল্লা উদ্দার কইরবো।

ইনজেকশন শেষে আম্মার উদ্দেশ‍্যে বললেন তিনি। আম্মাকে সোজা করে শোয়ানো হলো। ভেজা কাপড়ে মুখ মুছে দিচ্ছেন রিজু বুজি। দূরে আড়াল থেকে সব দেখছিলেন চোট্ট দাদু। পর্দা সরিয়ে।

আম্মার ব‍্যাথা বাড়ছে। ব‍্যাথার দমকে তীব্র হচ্ছে তার গোঙানি। থেকে থেকে নড়ে উঠছেন তিনি। পাশে থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি লতি দাদীর। তিনিই মূলত দাই মা।

– ভাই.. অক্ষণ কাম নাই আমগো। চলেন বাইরে যাই। ঐ ক‍্যাপসুলডা আনন লাইগবো। হেইডা শইল‍্যে গেলেই। আল্লা বরসা। বইন, আল্লারে ডাকো মনে মনে। সাহস রাখো ।

আম্মার দিক থেকে আব্বার দিকে চোখ ঘুরলো ডাক্তারের। আব্বা হাতে তুলে নিলেন, প্রেসিডেন্টে ব‍্যাগ। উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তার। ক্ষনিক তাকিয়ে আবারও বসে পড়লেন মোড়ায়।

– দেখি সাবুদ্দিন সাব, ব‍্যাগডা দেন। ওষুদ তো থাকন কতা। একটু ভালা কইরা খুঁইজা দেখি । বয়সডাও অইতেসে। মনভুলা রোগ।

দ্রুত ডাক্তার শামসুল করিমের হাতে গেলো কালো ব‍্যাগের বিশেষ চেম্বারে। জানালার কাছে গিয়ে হালকা আলোতে তিনি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। খুঁজছেন ঔষধ।

আম্মার ব‍্যাথা বাড়ছে ক্ষণে ক্ষণে। নাক মুখ বেঁকে যাচ্ছে যেন ব‍্যাথার চোটে। চাচী আম্মা শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

বড্ডা আপা এসে একটু দূরে বসে আছে মোড়ায়। কিছু যেন বুঝে উঠতে পারছে না সে।

ডাক্তার সাহেবের হাত তখনো খুঁজে বেড়াচ্ছে ঔষধ । আম্মার গোঙানির শব্দ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তিনি অস্থির হচ্ছেন। সেই অস্থিরতাই যেন ভর করেছে শামসুল করিমের হাতে। তিনি তখনো হাতড়াচ্ছেন ব‍্যাগ।

– যাক আল্লাহর রহমত। পাইসি বইন পাইসি। সাবুদ্দিন সাব, পাইসি। ব‍্যাগের কোনাত আচিলো। ভাইবসি শ‍্যাষ অইয়া গেসে। আল্লাহ বরসা। আর চিন্তা নাই।

আব্বার চোখে প্রশান্তি খেলে গেলো। তিনি সময়ের হিসেব কষছিলেন। ওছখালী যাওয়া আসার ঐ সময়টুকু তিনি বিপুলকে কষ্ট দিতে চান না।

তার ভরা সংসার। তিন মেয়ে তাদের। সেই সংসারে তিনি কালো ছায়া কী করে সহ‍্য করবেন। ডাক্তারের কথায় যেন স্বস্তি ফুটে উঠলো তার মুখে।

– আল্লাহ বিফদ দিসে। আল্লাহই উদ্দার কইরবো। দ‍্যান দ‍্যান, ডাক্তার সাব। খাবাই দি। এ রে রিজু, এক গেলাস হানি ল চাই। না। থাউক থাউক। আঁই উইটতেসি। তুই তোর মামীর মি খেয়াল রাখ। আহাইরে বেচারি…

আফসোসে গলায় আব্বা পানি আনতে উঠলেন। বড্ডা আপা এগিয়ে দিলো গ্লাস। তার মুখ থমথমে। স্কুলে যেতে হয়নি। আম্মার অসুস্থতা। তার শিশুমনেও বোধহয় ঝড় তুলেছে।


আম্মাকে হালকা উপরে তুলে ধরলেন চাচীআম্মা। তার হাতে তখন ঔষধ। ব‍্যাথা বাড়িয়ে তবেই মুক্তি দিবে সে। সাথে তো ইনজেকশন আছেই।

লালরঙের সেই ক‍্যাপসুল। আম্মা মুখে পুরলেন। ঠোঁট ছুঁয়ে কাঁসার গ্লাসে পানি। আম্মা স্তব্ধ হয়ে আছেন । যেন গিলতেই ভুলে গেছেন।

– বইন, চাবাইয়েন না। হানি দি গিলি খাই হালান। আর বেশিক্কন কষ্ট করন লাইগদনো। আম্নে হানি দি গিলি খাই হালান। আর মনে মনে আল্লারে ডাকেন।

ধীরে ধীরে একচুমুক পানি মুখে নিলেন আম্মা। সাবধানে আম্মাকে শুইয়ে দিলেন চাচী আম্মা।

আব্বা উঠে দাঁড়ালেন। মশারির চারপাশে ঘেরা কাঁথার পর্দা আবারও স্থির হলো আগের জায়গায়। পর্দার অন্তঃরালে বাড়ছে অপেক্ষা। আমার। আম্মার।

উঠোন ছাড়িয়ে বড় নারিকেল গাছের নিচে রাখা কাঠের তক্তায় বসলেন দুজনে। আব্বা আর ডাক্তার। সময়ের কাঁটা ঘুরছে ঢিমেতালে।

আব্বা ভাবছেন। সত‍্যি কি এবার পূত্রসন্তান আসবে। পরপর তিন কন‍্যা তার ঘর আলো করেছে।

তিনি নাম ধরে কম ডাকেন তার কন‍্যাদের। তিনি ডাকেন, বড় মা, মেঝ মা আর কালাচাঁন বলে।

তার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠছে। টানা আট মাস যুদ্ধ করছেন তিনি। তিনি নন, মূলত যুদ্ধ আম্মারই। প্রাণ সঞ্চার হয়েছে শরীরে তা ঠিক। তবে বমির বেগে কিছুই মুখে তুলতে পারছিলেন না আম্মা।

পুরোটা সময় জুড়ে তাই, স‍্যালাইনেই ভরসা । দিন বারো পরপর আম্মা অজ্ঞান হয়ে যেতেন। তারপর স‍্যালাইনেই ভরসা। এমনও দিন গিয়েছে, বমি করতে করতেই জ্ঞান হারাতেন তিনি।

মাছ প্রিয় আম্মার মুখে রোচেনা ইলিশ কিংবা কৈ। মুরগিতে ভরা খোঁয়াড়ের আমিষে আম্মার হৃদয় প্রিত হয়না।

যেন নিজে নন, অপরকে খাইয়ে তবেই শান্তি । খাওয়ার মধ‍্যে ঐ লোভ টুকুই। তাও ছাগলের দুধে ভিজিয়ে। লোভ মানে পাউরুটি।

আম্মা ঐ খেয়েই চলেছেন আটমাস। আর পারেননি। পৌষের ভোর রাতে, তীব্র শৈত্যপ্রবাহে শুরু হওয়া সেই বেদনা আম্মা বয়ে চলেছেন মাঘের মধ‍্যদুপুর অবধি।

ক্ষণে ক্ষণে ওঠা ব‍্যাথার দমকেও আম্মা রান্না করেছেন। হেঁশেল সামলাতে ভোলেননি। তার ভরা সংসার। বনেদী বাড়ীর বড় বউ।


সময় গড়ায়। বাতাসেও সেদিন বেগ ছিলো। হালকা রোদের শীতের মধ‍্যাহ্ন। আকাশে নীল মেঘ। সাদা সাদা হয়েও উড়ছে কিছু। হাওলাদার বাড়ীর পুকুরে আকাশের প্রতিফলন।


পুকুরের বড় শিকারী মাছটাও তখন স্থির। চুপ হয়ে আছে। লেজ নড়ছে না। সামনে তার খাবার। ছোট মাছ। ধরতেই হবে।

পুকুরের উল্টো দিকে দক্ষিনের কোনায় সিঁদুর রঙা আম গাছের বামে, কাঠবাদাম গাছে বাদুড়ের হানা। পাখায় লেগে পাকা বাদাম পড়ছে। নিচে থাকা শুকনো পাতার উপর। মর্মর সেই ধ্বনিতে যখন মুখরিত চারপাশ। তখন। ঠিক তখনই।

– ও আল্লা গোওওওওও…. ও খোদা…….

আম্মার আকাশ কাঁপানো আর্তনাদে উড়ে গেলো কড়ই গাছে চুপি চুপি বসে থাকা চিল। মুরগির বাচ্চা ধরবে বলে চুপ হয়ে ছিলো সে। যাতে বুঝতে না পারে কেউ। আম্মার বেদনার আর্তি যখন আকাশ ছুঁলো, ভয় পেয়ে ডানা ঝাপটালো শব্দ করে। তার দৃষ্টি আকাশ। সীমাহীন।

আব্বা চমকে উঠলেন। শামসুল করিম সাহেব আল্লাহকে ডাকছেন। বড্ডা আপা রান্নাঘরের দরজায় এসে তাকিয়ে রইলো আব্বার দিকে। আব্বার চোখে মুখে আতঙ্ক। মুখে আল্লাহকে ডেকে যাওয়া নিরন্তর।

আম্মার চিৎকার বাড়ছেই। একটু পর। ক্রমেই যেন ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে হঠাৎই আকাশ কাঁপিয়ে শুনতে পাই তার বেদনা।

আব্বা অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন। তার সব মনে পড়ছে। বিয়ের দিন থেকে শুরু করে এতো বছরের সব। সব এসে যেন একসাথে জমাট বাঁধছে তার মাথায়। আব্বা ঘামছেন।


আলম জেডা তখন উঠোনে। তিনি একমনে দোয়া করছেন আম্মার জন‍্য। বয়সে বড় তিনি আম্মার। আম্মাও শ্রদ্ধা করেন।

বড্ডা দাদু এমাথা থেকে ওমাথা অবধি হাঁটছেন। রান্নাঘরের দরজা থেকে বড় রুম অবধি। হাতে তসবিহ।

বড় রুমে একটা কাঁসার বাটিতে ভেজানো মরিয়ম ফুল। পানিতে চুবিয়ে রাখা। একটু পরপরচোট্ট দাদু গিয়ে উঁকি দিচ্ছেন। ফুল প্রসারিত হলো কি না।

সময় গড়াচ্ছে। কাঁথা দিয়ে ঘেরা আঁতুড় ঘরে তখন জন্মের আয়োজন। কোটি কোটি জনমের ভিড়ে আরও এক জীবনের অংশগ্রহনের আনুষ্ঠানিকতা যেন।

কী হবে তার চরিত্র? সব কি ঠিক হয়েই আসা হবে? নানান সমীকরনের জীবন, কোন ধাঁধায় গিয়ে আটকাবে কে জানে। সময় এগোয়।

“টিক..টিক…টিক….”

আম্মার বেদনা আকাশ ছুঁয়েছে। কাঁথার আস্তরনে বাড়ছে জন্মের রহস‍্য। পানি ভেঙে প্রাণের জন্মের নিয়মে যেন ধরাশায়ী আম্মা। পুরোটাই।

ক্রমেই তীব্র হচ্ছে বিশুদ্ধ বাতাসের দাবীদারের সংখ‍্যা। আম্মা লড়ছেন। প্রাণপণে।

আকাশের সূর্য তখন মধ‍্যভাগের ডানে হেললো। একটু করে। চোট্ট দাদুর চোখ তখনও মরিয়ম ফুলে। ফুল ছাড়িয়ে কখনো বা পানিতে যায়।

বড্ডা দাদুর দোয়া পাঁচ হাজার পেরিয়ে পরের হাজারে পড়লো। তসবিহর গুটিও যেন আওয়াজ তুলেছে।

“টুক…টুক…টুক…”

আব্বা তখনো কাঁপছেন। ভয়ে। কাঁদছেন চিন্তায়। আম্মার জন‍্য। ডাক্তার শামসুল করিম সাহেব উদাস নয়নে তাকিয়ে পুকুরে। আম্মার গলার আওয়াজ তীব্র হচ্ছে।

সময় বাড়ছে। রান্নাঘরে শোরগোল বেড়েছে। একসাথে গলা পাওয়া যাচ্ছে। রিজু বুজির উৎকণ্ঠা আম্মাকে ঘিরে।

– ও মামী, মামীগো… আর এক্কানা কষ্ট করেন। এইতো কাচাকাচি।

– ভাবী, ও ভাবী… এই তো, আর একটু। আল্লা দিলে, আর এক্কানা ভাবী।

বড্ডা চাচী আম্মার তৎপরতা বাড়ছে। এলু আপু তখনও ঘুমে। মোটে মাস নয় বয়স। চাচী আম্মার মনে তার শিশু সন্তানও। ফুরসৎ পেলেই পূবের ঘরে একবার উঁকি দিতে চান তিনি।

– সালমা, মা হুনো, আংগো মনিগারে এক্কানা চাই আইয়ো চাই। গুম ভাংইসে ন‍্যা। এক্কানা চাই আইও। গাত খাঁতা আচেনি চাইও চাই। হাজিল মাইয়া। ব‍্যাকের লাগে হীত, হেতির বোলে গরম। গাত খাঁতা গান টানি দিও।

চাচী আম্মার কথা শুনে বড্ডা আপা ছুটলো পূবের দিকে। এলু আপা তখনও পুরোপুরি হাঁটতে শিখেনি। ঘুম ভাংলে উঠে বসবে। হামাগুড়ি দিয়ে উল্টো পড়ে যেতে পারে বিছানা থেকে।

আম্মা কাঁদছেন। বাতাসের হলকা যেন বেরুচ্ছে ফুসফুস চিরে। ঘন ঘন। আম্মা হাঁপাচ্ছেন। ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছেন সাথে। বেদনায়। আহা জন্ম।

চোট্ট দাদু তখনো বসে রুমে। খাড়া কান আঁতুড় ঘরে। চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মরিয়ম ফুলে। তার বিশ্বাস। ফুল ফুটবেই। নাতীর মুখ তিনি দেখবেনই। বিপদে মুখ তুলে তাকাবেন পরওয়ারদিগার।

আম্মার জন‍্য তার মনে অপার দয়া। শৈশবে মা হারা মেয়েকে তিনি ঘরে এনেছেন। যাতনা দেন নি তিনি।

ভরা সংসারে তার নিজেরও খুব একটা ফুরসত নেই। চার নাতিনের পর তার একটা নাতি দেখার শখ। এইটুকুই তার দায়।

চোট্ট দাদুর নিবিষ্ট চোখের স্থির দৃষ্টি মরিয়াম ফুলে। ঘড়ির কাঁটা বয়ে চলে। উত্তরের ঘরে ডেকে ওঠে সরীসৃপ। লক্ষয সামনের মাকড়শা। যে জাল বুনেছে। ফাঁদের। টিকটিকির চোখ স্থির হয় লক্ষ‍্যে। বেজে চলে বুক। একটানা।

“টিক…টিক….টিক….”


উত্তরের পাঞ্জেগানা মসজিদে তখন ইমামের ব‍্যস্ততা। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তার আগে মনযোগ দিয়ে ওযু করলেন। হাওলাদার বাড়ীর পূত্রবধূর জন‍্য দোয়া করেছেন তিনি। মহান রবের কাছে।

ঘড়ির কাঁটা একের ঘর ছুঁয়েছে। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। এগিয়ে এলেন মাইকের সামনে। ব‍্যাটারির চার্জ ফুরিয়েছে। কখনো আওয়াজ হয়, কখনো হয় না। নামাজ শেষেই বাজারে ছুটবেন।


তিনি উঠে দাঁড়ালেন। মুখের সামনে মাইকের স্ট‍্যাণ্ড টেনে নিয়ে ফুঁ দিচ্ছেন। শব্দ আসছে হালকা। তার মন বিষন্ন হলো। আযান সবাই শুনতে পাবে না।

মালু হাওলাদার সাহেবকে এই বিপদের দিনে বলতে মন চায়নি তার। ব‍্যাটারি খারাপ হয়েছে গতরাতে। তিনি মাইকে টোকা দিলেন। হালকা একটা শব্দ হলো। যান্ত্রিক।


“ক‍্যাংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংংং”


এই শব্দে যেন নতুন সুর বাজলো চারপাশে। অনেক উপরে উড়তে থাকা চিল নিচে নামছে আগ্রহ নিয়ে। পুকুরের নীল জলে তার ছায়া পড়ছে। রাজার মতো নামছে সে, নিচে। দু’দিকে দু’পাখা ছড়িয়ে। ভয়ডরহীন।


নীচে পানিতে ছোট পূঁটি মাছের মনে তখন অবাক বিস্ময়। কোনটিরও বা ভয়। পেছনে ধেয়ে আসছে পানকৌড়ি। ডুবে। উপরে চিল। পানিতে পানকৌড়ি। মাঝখানে বেচারা পুঁটি।

সময় বয়ে চলছে। বড্ডা আপার চোখে তখন হলদে পাখি। উড়ছে এ ডাল থেকে ওডালে। মুখে তার গান।

“বউ কথা কও”

বড্ডা আপার চেখ আটকে গেলো। পুকুরের দক্ষিণের বরই গাছে। হলদে নাচন যেন। কানে সুর তোলে। আপা চঞ্চল হয়ে ওঠে। মন ভরা বিষন্নতা।

তার হাতে তখনও কাঠ কয়লা। বড় দেখে একটা ছুঁড়ে মারে সে। সামনে। পড়লো যেন ঠিক মাঝখানে। ভয় পেয়ে উড়ে গেলো চিল। পানকৌড়িও বুঝি দিশা হারালো। দৌড়ে জীবন বাঁচালো বেচারা পুঁটি।


পুকুর পার হওয়া বাতাসে উড়ছে আব্বার সাদা শার্টের হাতা। আব্বার চোখেমুখে অস্থিরতা। তিনি কাঁদছেন। আম্মার বেদনা যেন লেনা জল হয়ে ভরেছে আব্বার চোখে।

শামসুল করিম সাহেব স্থির। তিনি অভিজ্ঞ। আজ তিনিও স্থির। শুধু ঠোঁট নড়ছে। মনে পড়ছে প্রথম যেদিন এ বাড়িতে এলেন। তখন আম্মা কাঁসার গ্লাসে ঠাণ্ডা পানি দিয়েছিলেন। সাথে ছিলো পাকা বরই।

তিনি আম্মাকে বোন জানেন। তার মন কাঁপছে। বেদনায়। তিনি রবের কাছে ফানাহ চাইছেন। দু’হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছেন কাঠের তক্তা।

বাতাসে নড়ে ওঠে নারিকেল গাছের পাতা। যেখানে একটু নিচে রোজ সকালে রোদ পোহান আম্মা। সামনে থাকে বাদামের গোটা শুকনো গাছ । ভোরে উঠে রান্নাবান্না সেরে একটানা ছিলে যাওয়া ।

গোটা বাদাম যেন সময়ের হিসেবে আলাদা হতো গা বেয়ে। ঘামের ফোঁটা পড়ে ভিজতো শুকনো গাছের পাতা। বাম হাতে শাড়ীর আঁচল টেনে আম্মা ছিলে যেতেন ঘণ্টা দেড়েক ।

পাশে দাঁড়িয়ে বড্ডা আপা। মাথায় তেল দিয়ে গুনগুন করে গাইছে। হাঁটছে টুকটুক করে। অবাক চোখে তাকিয়ে চারপাশ। মেঝ আপা মুরগির লাফালাফি দেখছে। লুমা আপা বসে আম্মার পাশে। কাঠের পিঁড়িতে।


আম্মার মাথা ধরেছে। ভীষণ। সারাদিনের কাজ শেষে আম্মা ঘুমিয়েছেন। ভোররাতে লুমা আপার ক্ষিদে ঘুম ভাঙায় আম্মার। আম্মা ঘুমঘুম চোখে লুমা আপাকে জড়িয়ে ধরে।

হৃদয় গহীনে তখন আশঙ্কা। ভেতরে বয়ে চলা আটমাসের প্রাণে বুঝি অস্থির নড়নচড়ন। আম্মা ঘামতে শুরু করলেন। পাশে তখন আব্বার অবিরাম নাক ডেকে যাওয়া।


আম্মা ক্ষনিক থামলেন। মনে মনে ভ্রমে দুষলেন। লুমা আপাকে আরও কাছে জড়িয়ে ঠিক করে দিলেন আব্বার গায়ের মোটা কাঁথা। পৌষের ভোর তো।

আম্মার চেখ বুজে আসলো। খোঁয়াড়ের মোরগ সবে তার জানান দিবে ধরণীতে। গলা কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠবে। উত্তরের ঘরে বড্ডা আপা তখন গালে বসা মশার কামড়ে নড়ে উঠবে। মেঝ আপার গলার নিচে গিয়ে ঠেকবে তাবিজের শক্ত খোসা। ব‍্যাথায় কেঁদে উঠবে বেচারী। লুমা আপা আম্মার গায়ে পা তুলে দিবে। ঠিক তখনই। তখনই।

– ও আল্লাহ গো… গেচি গো…. এইগ্গো… হুনেন চাই… ও মা… মাগো….


তীব্র ব‍্যাথায় কেঁপে ওঠেন আম্মা। চিৎকারে ঘুম ভাঙে আব্বার। তারপর থেকে আজ মাঘের এক। আম্মা এখনো লড়ে যাচ্ছেন। থেকে থেকে জানান দিচ্ছে নতুন প্রাণ।

সময় তখনো বাকি মাস দেড়েক। কম জ্বালায়নি জীবন। আম্মাকে। নিদ্রাহীন আম্মার চোখ জানে জন্মের মূল‍্য। কই সে নিক্তি। কোন পাল্লায় মাপবো দায়?


আম্মা লড়ছেন সেই ভোর থেকে। অবশেষে পড়লেন বিছানায়। টাউন হল অনেক দূর। তখন ফোন ছিলো না। আব্বার স্কুল অনেক দূরে।

সারাদিনের ক্লাশ শেষে ফিরেছেন সাইকেলে। মধ‍্যরাতে। তখনও আম্মা কাতরাচ্ছেন। পরীক্ষার হলে ডিউটি ছিলোা আব্বার। চাইলেও কি বদলানো যায়।

পরীক্ষার হলে পুরোটা সময় আব্বার মনে তার বিপুল। বারবার হাতের ক‍্যাসিওতেই তার চোখ। তিনি খবর শুনতে চান। সুখবর।

সময় বয়ে যায়। খবর আসেনা। তিনি ছোটেন সাইকেলে। দেশ তখনও উত্তাল। নোয়াখালীর হাতিয়ার জাইল‍্যারআঁটখোলায় জন্মের আয়োজন দেশকে ছোঁয় নি। আব্বাকে ছুঁয়েছে। তিনি দ্রুত প‍্যাডেল চাপলেন।

ভোর রাতের সেই বেদনা আলো ফোটার আগেই মিলিয়ে গিয়েছিলো। ভুল সিগন‍্যাল ভেবে তাই স্কুলে ছোটা আব্বার। সময়ের হিসেব যেন ওলটপালট ঘুরছে ।

থেমে যাওয়া ব‍্যাথা বাড়ে প্রথম রাতে। লতি দাদী তখনই আসেন। বিছানা আলাদা হয়। কাঁথা ঘেরা অন্ধকার রান্না ঘরের কোনায় ঠাঁই হয় আম্মার। আব্বা আল্লাহকে ডাকতে শুরু করেন।


আম্মার সময় বইছে ঘামের হিসেবে। আধাপাকা কয়েকগোছা চুল লেপ্টে আছে মুখে। ডানপাশের গালে ছোট তিল।

যখন পান খান আম্মা। রক্ত রঙা হয়ে ওঠে আম্মার মুখ। কী দারুণ দেখতে। আমি লাজুক চোখে এখনো চুপিচুপি দেখি।


আম্মার ঠোঁটে এখনো লাজুক রঙা লাল। নাকের বামে তখনও ছিলো রত্নি দশেক সমান সোনার ফুল। ছাপা শাড়ীতে আম্মা তখন প্রায় অজ্ঞান।


আম্মার বাম পাশে বড্ডা চাচীআম্মা। শিয়রে বসে রিজু বুজি। আর অন‍্য পাশে লতিদাদী।


দুহাতে কাঁথা চেপে ধরে আম্মা চিৎকার করছেন। আটমাসের বেদনার তিনি অবসান ঘটাতে চান । আর কতোা। তিনি ক্লান্ত। সারাদিনের খাটুনি তার শক্তি খেয়েছে। আম্মা এখন শক্তিহীন।


মসজিদের হুজুর ঘড়িতে তাকালেন। সেকেন্ডের কাঁটা পেরুচ্ছে ঘর পঞ্চাশ। চোট্ট দাদুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মরিয়াম ফুলে। বড্ডা দাদুর হাতের তসবিহ হাজার সাত পূর্ণ করলো। লুমা আপা অবাক চোখে টিনের ফুটো গলে আসা রোদে লুকোচুরি খেলছে, মেঝ আপার হাতে বেনীর রাবার ব‍্যান্ড, বড্ডা আপা চুপিচুপি তাকিয়ে আঁতুড় ঘরে, আব্বা কাঁদছেন, মাথা পশ্চিমে, হাত উপরে, ঊর্ধ্বে, মহান রবের তরে,


– ওগো মহান রব, ও পাক পরওয়ার দিগার, আমার বিপুলরে আপনি আর কষ্ট দিয়েন না খোদা। ও আল্লাহ আর সন্তানরে আর কষ্ট দিয়েন না আল্লাহ, ও আল্লাহ আঁর দুদের মাইয়াগুনরে এতিম করি দিয়েন না খোদা, ও খোদা, আঁর বিপুল রে আর কষ্ট দিয়েন না। আর দুক্ক দিয়েয়েন না।


আব্বার জড়ানো গলার কথা ফুরোবার আগেই চুপ করে ঝরে পড়ে চেখের পানি। বড্ডা আপার চোখ চঞ্চল হয়ে ওঠে। মুখের রঙে ফুটে উঠে নানান খুশির রঙ, মেঝ আপা চুলের বেনী হারিয়েও তাকিয়ে অবাক চোখে সামনে। লুমা আপা হঠাৎই ভুলে গেলো আলোর খেলা, চোট্ট দাদুর চোখের মনিতে অদ্ভুত নাচন দেখা গেলো। বড্ডা দাদুর হাতের তসবিহর গুটি পড়ছিলো আরও দ্রুত, দাদুও যেন হঠাৎ থমকে গেলেন, মসজিদের ইমাম সাহেবের চোখ ফিরলো ঘড়ি থেকে। সেকেণ্ডের কাঁটা ১২ ঘর ছুঁলো। মুয়াজ্জিন সাহেব শুরু করলেন। দু’হাত ছুঁলো কানের লতি। আকাশে তখন মাঘের সূর্য। সাদা মেঘের ফাঁক গলে আলো এসে পড়ছে টিনে। টিনের ফুটো সে আলো পাঠিয়ে দিলো আঁতুড় ঘরে। মুয়াজ্জিনের মাইকের শব্দ যেন হঠাৎই আকাশ ছুঁলো। সাথে জুড়লাম আমিও।


– আল্লাহ হু আকবার আল্লাহ হু আকবার


– ওঁওঁওঁয়ায়য়া ওঁওঁওঁওয়ায়ায়া


– আলহামদুলিল্লাহ…… আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর কাচে লাক লাক শেকর। আম্মা কই গে। ও আম্মা। তাতাই আইয়েন। আমনের নাতী অইসে আম্মা। আংগে বাইস্তা অইসে। মাশআল্লাহ।


চোট্ট দাদু চমকে উঠলেন। পশ্চিম দিকেই মুখ করে বসেছিলেন তিনি। বড্ডা চাচী আম্মার চিৎকার করে বলা কথা তার কানে এসেছে। তিনি ছুটলেন। তিনি ছুটলেন। রান্না ঘরে। দ্রুত ছুটতে গিয়ে ধাক্কাও খেয়েছেন।

তাও একদৌড়ে তিনি আঁতুড়ঘরে। সেখানে তখন বড্ডা চাচী আম্মার কোলে আমি। আম্মা তখনো অচেতন। লতি দাদী বাতাস করছেন। এই ভরা মাঘের শীতেও। মুখে পানি ছিটাচ্ছেন রিজু বুজি। ডান হাতে আমাকে আলতো করে তুলে ধরে গালের সাথে গাল মিশিয়ে আদর করছেন বড্ডা চাচী আম্মা। আর বাম হাতে আম্মাকে নেড়ে যাচ্ছেন। ততক্ষণে আমার নাড়ী কাটার আয়োজন চলছে। বাঁধন ছেঁড়ার আয়োজন। লতী দাদীর হাতে তখন ব্লেড।


আমি হাত পা ছুঁড়ে কাঁদছি। অবাক হয়ে দেখছি সব। চোখ পিট পিট করছে। অদ্ভুত সব সুন্দর দেখছি। যা দেখছি তাই নতুন। ঠিক মাথার উপরে অন্ধকারে আমার চোখ।


আমি মাথা নাড়তে পারছি না। চুপি চুপি দেখছি আলো। দেখছি আঁধার। কখনো চাচী আম্মার গালের ঘ্রাণ এসে লাগে মুখে। ততক্ষণে বোধহয় ছিন্ন হলো মায়ের বাঁধন। মায়ার বাঁধন।


বড্ড অসময়ে এসেছি বোধয়। সময়েরও আগে। এটাই হয়তো ভাগ‍্যও। জন্মের ঐ সময়, মায়ের উদরে আমি কম দিয়েছি। বরং একমাস মাকে কাছ থেকে পেয়েছি বেশী। দু’চোখে দেখেছি বেশী।


নাড়ী কাটা হলো। বিচ্ছেদের বেদনা নিয়েই শুরু হলো জীবন। বড্ডা চাচী আম্মা আমাকে শুইয়ে দিলেন। আলতো করে। তার আগে নকশী কাঁথায় মুড়িয়েছেন। ভালো করে। তিনি আমাকে দিলেন আম্মার বুকে।


অন্দর ছেড়ে মায়ের বুকের ওমে আমি। মাকে ছুঁয়ে দেখছি চোখ খুলে। এই প্রথম। আমার আম্মা। পারভীন আরা বেগম বিপুল। আমি তাকিয়ে অবাক চোখে।

ঠোঁটের উপরের অংশে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ধীরে ধীরে কেঁপে উঠছি। আম্মার নিঃশ্বাসের তালে। ধীর লয়ে। আমার চোখ, আম্মার চোখে।

আমি আম্মাকে দেখছি। রিজু বুজির পাখার বাতাসে আম্মার ঘোমটা সরে যাচ্ছে। চোট্ট দাদু তখন আঁতুড় ঘরের সামনে। তার দৌড়ে বাতাসে দোল ওঠে পর্দার অন্তরালে।


– চাই, খাবো, আঁর নাতিরে আঁই হুরান কাফো গাতদি কোলে লইতামনো। আঁই তাতই নতুন শাই গান হরি লই। আঁর ব‍্যাইনে দিসে। আঁর নাতীর নানী দিসে আঁর লাই। শানাজ, বিপুল চোউক খুইলসে নি? আল্লা শান্তি দুক বেচারিরে। যে কষ্ট কইচ্চে। চাই, খাবো, নতুন শাই হরি আঁই আইতে আচি।


আমি শুনলাম আমার দাদীকে। আমার চোট্ট দাদু। খায়রুন নিসা। আম্মার চোখে তখন আন্দোলন চলছে। মুখে হালকা কাতর শব্দ। অবাক চোখে তাকালেন চোখ খুলে।

আমাদের চারপাশে তখন বড্ডা চাচী আম্মা। রিজু বুজি। লতি দাদী। আমি তাকিয়ে চতুর্দিকে। আম্মার মুখে হাসি খেলে গেলো। চোখে পানি।


– আল্লাহর রহমতে , আঁর বাইস্তা অইসে ভাবী। আম্মা তো হুনি এক্কেরে নাইচতে নাইচতে নতুন শাই হোইত্তো গেসে। এক্কেরে নাতিরে হুরান শাই হরি কোলে লন যাইতো ন। নতুন শাই হইরতো গেসে। হা… হা …হা….


বড্ডা চাচীআম্মার কথা শুনে আম্মার মুখে প্রশান্তি খেলে গেলো। আম্মা আমাকে খাওয়াবেন। বুকে জড়িয়ে নিলেন আরও। পাশে এসে দাঁড়ালো লুমা আপা। রিজু বুজি আদর করে কোলে তুলে নিলেন।


– বইন, আইও, বুজির কোলে আইও। চ। তঁর বাই অইসে। এক্কেরে লম্বা। চ, গার রঙ গানে গোরা। আল্লা বাঁচাই রাউক।

– বাআআআআইইইই… বাআআআআইইই…


লুমা আপা জপতে লাগলো। মেঝ আপা তখনো তাকিয়ে দূর থেকে। অবাক বিস্ময়ে। তার চুলের বেনী এলো মেলো। বড্ডা আপা একদৌড়ে আমার কাছাকাছি।


আব্বার খাড়া কানে তখন রান্নাঘরের শোরগোল। তার পায়ে যেন বিদ‍্যুৎ বইলো। এক দৌড়ে আঁতুড় ঘরে আব্বা।


চাচী আম্মা সালাম দিয়ে হাসি হাসি মুখে বসে তখনো। আমি আম্মার বুকে শুয়ে। দু’হাতে যত্ন করে জড়িয়ে আম্মা। আদরে। সাবধানে। পাছে ব‍্যাথা পাই।

– বাইসা, বাঁইচলে, আংগো বাইস্তা অইসে। হেতে সুস্ত আচে। হিশু কইচচে। হশশা অইবো। দরেন। সাবদানে বাইসা।


চাচী আম্মার কোল হয়ে আমি আব্বার কোলে । এই প্রথম দেখছি আব্বাকে। আব্বার কালে গোঁফ পেরিয়ে, কোল থেকে আমার চোখ আব্বার চোখে। গভীর। ঘন কালো।

আব্বার সাদা কালো চোখের গভীর গহীন থেকে টুপ করে পড়লো বেদনা। আনন্দ হয়ে। আমার চোখে। আমি কাঁদিনি। সেদিন আব্বার বেদনা এসে মিশেছিলো। আমার চোখে। তার আগে ছুঁয়েছে আমার এইটুকুন কপাল।


পাশে তখন দাঁড়িয়ে বড্ডা আপা। দূরে, অনেক দূরে তখন আলম জেডার অপেক্ষা । ভাইস্তাকে কোলে নেবেন তিনি। বড্ডা দাদু অপেক্ষায়। ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। আল্লার শুকরিয়া আদায় করছেন। নামাজেরও সময় হচ্ছে।


চোট্ট দাদু তখন পরছেন শাড়ী। নতুন । পাওয়া। উপহার। নানুবাড়ী থেকে তত্ত্ব এসেছিলো। দাদু গায়ে চাপালেন নতুন শাড়ী। তার নাতীকে কোলে নেবেন।

বংশের প্রদীপ। দু’ছেলের সংসারে পরপর চার নাতনির পর, তার প্রথম নাতি। তিনি তৈরী হলেন। অনেক দিন পর।


আমি তখন বড্ডা আপার কোলে। সিরিয়ালে মেঝ আপা। আমাকে কোলে নিতে গিয়ে ফেলে দিতে পারে, বড্ডা আপার আশংকায় অসত‍্য নেই। মেঝ আপা তাই চুপি চুপি দেখছে। আমাকে। আমার হাতের আঙুল। চোখ। পা।


– আপা, ইগা আংগো বাই নি?

– হ, ইগা আংগো তিনুগার বাই।

– লুমানিরে বেশী কোলে দিও না আপা, হিগা অ ন নিজেও ঠিক মতো আঁইটতো হারেনা। ইগা বাইরে হালাই দিবো।

– হিগারে চোকে চোকে রাখন লাইগবো। বুইজ্জত্তি। সুমা, চাচ্চা, ইগা কার মতন অইবো?

– আম্মার মতন লাগে, কেন্ডে আপা? চেরা চুরুতও সোন্দর আচে বাঁইচলে হেতের।

– যা, এঁইক করি কইচচা বইন, আবার মুখ লাইগলে।

– আল্লাহ মাপ করো… মাপ করো,….আংগো, দোশ গা ন, হাঁউচ গা ন, আংগো উগ্গা বাই।


তখনই এলেন চোট্ট দাদু। লাজুক চোখে আব্বা তাকালেন দাদুর দিকে। দাদুর মুখে জয়ের হাসি। তার বংশের প্রদীপ জ্বলছে। তিনি আজ আলোকিত। যেন নিজের আলোর এ রুপ। চাঁদের মতো ধার করা নয়।


আমি দেখছি। আমার ছোট্ট দাদুকে। মাঝ বয়সী। নতুন শাড়ীর চমকে সুখ ঠিকরে পড়ছে। হাসি হাসি মুখে দাদু তাকাচ্ছেন আমার দিকে। প্রায় ঘোলা হয়ে ওঠা চোখের কোনা জুড়ে জমছে লোনা জল।

সুখের জলের লোনায় ভরেছে তার বুক। বেদনা এবার ঝরে পড়বে। দাদু দু’হাতে জড়িয়ে উপরে তুলে চুমু খেলেন আমার মুখে।


পানের পাকা গন্ধে আমি চমকে উঠি। আহা বংশ। আহা প্রদীপ। আমি চমৎকৃত হই। কেঁপে উঠি। আনন্দে। দাদুর সেই গন্ধে আমি মাতোয়ারা হয়ে উঠি। পরম মমতায় যখন আমার গালে আলতো করে তিনি দু’ঠোঁট ছোঁয়ালেন। তখনই যেন আবদ্ধ হলাম আমি। আবেশে।


পাশেই তখন বড্ডা দাদু। তার আগে বার দুয়েক কাশির শব্দে ঘোমটা ওঠে আম্মার মাথায়। সাথে থাকা চাচী আম্মা, লতি দাদী আর রিজু বুজিও ঘেমটা টেনে নড়েচড়ে বসলেন।


বড্ডা দাদু এসে তাকালেন মুখে। কাঁচাপাকা দাড়ির একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ আমার চোখের পানে। তার দাড়ি এসে যেন লাগছে আমার গালে। আমি দেখছি। আমার রক্ত। আমার বংশ। আমার পূর্বপুরুষ মোবাশ্বির হোসেন হাওলাদারকে।


– কৈ গেলাগো? অ খাইল‍্যা গাল চাডে। মুখে কিস‍্যু দিসেনি ইগার মা?


– কী কন আম্নে। অন আর মদু টদু দ‍্যা না। অন আর হে দিন আচেনি। ইগার মার বুকে দেন। মার খানায় আসল খানা।



চোট্ট দাদুর উত্তরে বড্ডা দাদু দোয়া পড়ে আমার মাথায় ফুঁ দিলেন। আলতো করে আঙুল ছুঁয়ে দিলেন আমার গালে।

চোট্ট দাদু তখন আম্মার শিয়রে। বউয়ের শরীরে শক্তি যোগাতে হবে। আগেই, কম বয়সীমুরগির ঝোল করে রেখেছেন তিনি।

নতুন শাড়ীর আঁচলে আম্মার মুখের ঘাম মুছে আমার কাছে ফিরলেন চোট্ট দাদু। বড্ডাদাদুর কোল থেকে সাবধানে নিলেন আমাকে।


আব্বা পাশে দাঁড়িয়ে। চুপিচুপি দেখছেন আমাকে। চোট্ট দাদু এসে কোলে দিলেন আমাকে। আব্বার কোলে।


– নাতি অইসে, নাতি। আযান দেওন লাইগবো তো। বুলি গেসো ন‍্যা বাপ। তঁর বাপও বুয়া অইগেসে লাগজন। নাতি হাই আকাশের চাঁন হাইসে। আযান দেওন লাইগবো তো।


আব্বা কিছুটা লজ্জা পেলেন। তিনি নাকের কাছে এনে আমাকে শুঁকছেন। আব্বার গোঁফের হালকা খোঁচা এসে লাগছে গালে। আমিও আব্বার গন্ধ পাচ্ছি। কী যে এক ভালো লাগা গন্ধ। দূর থেকে তখন তাকিয়ে বড্ডা আপা।


– আম্মা, আঁই আযান দি? আমনের নাতির কানে কানে।

– বাঁইচলে হেইটাতো আরও ভালা অইবো। তুঁই বাপ। তাইলে তুঁই দ।


আম্মার ততক্ষণে জামাকাপড়ের বদল ঘটেছে। আমাকে সাবধানে আম্মার পাশে শুইয়ে দিলেন চোট্ট দাদু। আমি আম্মার বুকে। আলগা হয়ে যাওয়া বাঁধন হয়তো আবার জোড়া লাগাবার ধাঁধায় আটকেছে জীবন।


আব্বা দাঁড়ালেন পশ্চিমে ফিরে। লুমা আপা বড্ডা আপার কোলে। মেঝ আপা পাশে দাঁড়িয়ে। আম্মার কোলে আমি। খাচ্ছি।

চাচী আম্মা তখন চারপাশ গুছিয়ে নিচ্ছেন। কম তো এলোমেলো হয় নি । অবশেষে মিলেছে মুক্তি। তিনিও খুশি ভীষণ। বংশের প্রথম ছেলে সন্তান।


আব্বা মহান রবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় গলা চড়ালেন। মহান রাব্বুল আলআমিনের দরবারে তার আকুল অনুনয় ঝরে পড়ে যেন গলায়। মহান রবের আনুগত‍্য তিনি যেন অনেকটাই নুয়ে পড়েন। তিনি আযান শুরু করলেন। আমার কানের কাছে।

“আল্লা….হু….আকবর….. আল্লা…..হুআকবর”

সাঁইত্রিশ বসন্ত পার করে ফেলেছি। দারুণ ব‍্যাপার। জীবনের এই উপলব্ধি আগে তৈরী হয় নি। আমি এখন আটত্রিশের ঘরে। অনেকটাই বড় হয়ে গেছি। জীবন সুন্দর। সবার জন‍্য অনেক শুভকামনা। আমার জন‍্য দোয়া করবেন। ভালোবাসায় রাখবেন।


সেবার এক বিশেষ জন্মদিনের পরদিন আমার চোট্ট দাদু চলে যান আচমকাই। বছর চোদ্দ আগে। সে থেকে জন্মদিনের এই সময়টুকু আমাকে আর আনন্দ দেয়নি। বিষন্ন মনে যেন ফুটে ওঠে আমার সেই নতুন শাড়ী পরা চোট্ট দাদুর মুখ।

আমার খুব বলতে ইচ্ছে করে দাদুকে, কেন চলে গেলে আমার আগমনী দিনের সুরে। কেমন তীব্র সুর হয়ে বেজে যাও সেই থেকে। রোজ। বেদনা হয়ে ঝরে পড়ো আমার ক্ষতে।

মনের গভীর গহীন কোনে জমিয়ে রাখা তোমার অ‍্যালবামে ধুলো পড়ে দাদু। তা ঠিক। তোমাকে ভীষণ ভাবে মনে পড়ে। ভোলার উপায় নেই তো। কী করে ভুলবো বলো। আমার জন্মদিন পরদিনই যে তুমি ফুরিয়ে গেলে। অতলান্তে। অলকানন্দা জলে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : যশোরে সপ্তাহে একটি বই পড়ির জ্ঞানযাত্রা ও প্রতিবেশ অধ্যয়ন

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন