মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দুস্থ ও অসহায়দের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফের চালের ২৫ শতাংশ দাবি ঘিরে উত্তেজনা, হট্টগোল ও হামলার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় উপজেলা পরিষদ চত্বরে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
বুধবার(৪ মার্চ) দুপুর ১টার দিকে গাংনী উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে চোরাচালান প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিজয় দিবস পালনের প্রস্তুতি সংক্রান্ত সভা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। সভায় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
অভিযোগ ওঠে, ভিজিএফের চালের ২৫ শতাংশ ভাগ দাবি করাকে কেন্দ্র করে প্যানেল চেয়ারম্যানদের সমর্থকরা কাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম হুসাইনের ওপর হামলার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সভাকক্ষে থাকা সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে উত্তেজনা প্রশমিত করেন।
প্যানেল চেয়ারম্যান সমর্থকদের দাবি, জামায়াতের এমপি মো: নাজমুল হুদা-এর নাম ব্যবহার করে কাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা আলম হুসাইন উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে ভিজিএফের ২৫ শতাংশ চাল দাবি করেন। চেয়ারম্যানরা এ দাবিকে নীতিমালাবহির্ভূত উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
এ ঘটনার জেরে গত কয়েকদিন ধরে বিএনপি-সমর্থিত প্যানেল চেয়ারম্যানদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বুধবারের প্রস্তুতি সভায় প্রবেশ করে তারা হট্টগোল সৃষ্টি করেন এবং একপর্যায়ে আলম হুসাইনকে মারধরের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিএনপি-ঘনিষ্ঠ প্যানেল চেয়ারম্যানদের ভাষ্য, বিধি অনুযায়ী ইউনিয়ন ও পৌরসভা ভিজিএফ কমিটি প্রকাশ্য সভায় উপকারভোগীদের তালিকা প্রণয়ন করবে। সেখানে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাল দাবি করা সম্পূর্ণ নীতিমালা পরিপন্থী। দুস্থদের চাল নিয়ে ভাগাভাগির অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিন আগে ধানখোলা ইউনিয়নে ভিজিএফের কার্ড বণ্টনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার পর গাংনী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলফাজ উদ্দীন কালু বলেন, আজকের ঘটনাটি দুঃখজনক। তবে অতীতে আমিও চেয়ারম্যান থাকাকালে এ সভাকক্ষে হামলার শিকার হয়েছিলাম।
গাংনী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বাবলু বলেন, আমি চেয়ারম্যান থাকাকালে একই স্থানে হামলার শিকার হয়েছিলাম। তবে আজকের ঘটনা কাম্য নয়। বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা উচিত।
এছাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আওয়াল ও পৌর বিএনপির সভাপতি মকবুল হোসেন মেঘলাও ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।
গাংনী উপজেলা জামায়াতের আমির রবিউল ইসলাম বলেন, হামলা বা হট্টগোল অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আমরা কোনো সভায় অংশ নেব না।
গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার দাশ জানান, সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
ধানখোলা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মন্টু দাবি করেন, জামায়াত নেতারা ৩৫ শতাংশ চাল দাবি করেছিলেন। এ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর গাংনী উপজেলায় মোট ৪৬৮.৪৫ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা ৪৬ হাজার ৮৪৫টি কার্ডের বিপরীতে বিতরণ করা হবে। ইউনিয়নভিত্তিক কার্ডসংখ্যা হলো, কাথুলী ৩৫৭০, তেঁতুলবাড়িয়া ৪৯২৭, কাজিপুর ৬৩৫৬, বামন্দী ৪২৭৫, মটমুড়া ৭১২০, ষোলটাকা ৩৯১৬, সাহারবাটি ৩৬৯৩, ধানখোলা ৬৫৯৯, রায়পুর ৩৪০৯ এবং গাংনী পৌরসভা ৩০৮৫টি।
সরকারি বিধি অনুযায়ী, যেসব পরিবার ভূমিহীন বা ভিটাবাড়ি ছাড়া জমি নেই, দিনমজুর বা নারী শ্রমিকের আয়ে নির্ভরশীল, উপার্জনক্ষম পূর্ণবয়স্ক পুরুষ সদস্য নেই, স্বামী পরিত্যক্তা বা তালাকপ্রাপ্তা নারী, অক্ষম ও অসচ্ছল প্রতিবন্ধী— কেবল তারাই ভিজিএফের সহায়তা পাওয়ার যোগ্য।
সাহারবাটি ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আসমা তারা অভিযোগ করে বলেন, আমাদের ৩৬৯৩টি কার্ডের মধ্যে থেকে ২৫ শতাংশ চাল দাবি করা হয়েছে।”
ষোলটাকা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আফরোজা খাতুন বলেন, দুস্থদের জন্য সরকার চাল দিয়েছে। সেখানে ২৫ শতাংশ ভাগ চাওয়া অগ্রহণযোগ্য।”
বামন্দী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান শাহ আলম বলেন, ২ মার্চ ভিজিএফের ২৫ শতাংশ চাল ভাগ নেওয়ার বিষয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছিল।
এ বিষয়ে কাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম হুসাইনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, কাউকে ভাগ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিধি অনুযায়ী তালিকা প্রণয়ন করে প্রকৃত দুস্থদের মাঝে চাল বিতরণ করতে হবে। বিতরণ শেষে মাস্টাররোল জমা দিতে হবে। হামলার চেষ্টা অনভিপ্রেত।
অন্যদিকে এমপি মো: নাজমুল হুদা বলেন, কাউকে কোনো ভাগ দিতে হবে না। প্রকৃত দুস্থরা সহায়তা পেলেই যথেষ্ট। সভায় হামলার চেষ্টা বা হট্টগোল করা ঠিক হয়নি।
উল্লেখ্য, চাল দাবির বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে সম্প্রতি গাংনী উপজেলা জামায়াতের কার্যালয়ে চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ঘটনার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
পড়ুন- ৬ সিটিতে প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট
দেখুন- হাইকোর্ট না রাজপথ এই স্লোগান দিতে বাধ্য করবেন না: নাহিদ ইসলাম


