বিজ্ঞাপন

গাজার কফিনে পেরেক ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় তিন মাসের ‘যুদ্ধবিরতি’কে একটি দুর্দান্ত সাফল্য বলে ঘোষণা করেছেন। এখন তাঁর তথাকথিত ‘শান্তি পরিকল্পনার’ দ্বিতীয় ধাপে এগিয়ে যেতে চান। বাস্তবে এ সাফল্য দেখতে কেমন? গত অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের সেনারা ৪৬০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যার মধ্যে কমপক্ষে ১০০ শিশুও রয়েছে। ইসরায়েল আরও দুই হাজার ৫০০ ভবন ধ্বংস করেছে, যা ছিল ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সর্বশেষ টিকে থাকা স্থাপনা।

বিজ্ঞাপন

গতকাল শুক্রবার মিডল ইস্ট আইয়ের নিবন্ধে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ব্রিটিশ গবেষক-সাংবাদিক জনাথন কুকের তৈরি নিবন্ধে বলা হয়, খাদ্য, পানি, ওষুধ ও আশ্রয়সামগ্রীর অবরোধের মাধ্যমে ইসরায়েল গাজায় যে অব্যাহত মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, তাতে শীতের তাপমাত্রা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে হিমায়িত হয়ে প্রাণ গেছে কমপক্ষে আট শিশুর। যুদ্ধবিরতিকে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প গত শুক্রবার উপত্যকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ ঘোষণা করেন।

‘শান্তি’ এখানে ‘যুদ্ধবিরতি’ শব্দটির মতোই অরওয়েলিয়ান (মিথ্যা রাজনৈতিক ব্যবস্থা) অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি গাজার দুর্ভোগের অবসানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং এটি ‘বড় ভাই’ ধাঁচের আখ্যান তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত, গাজায় ফিলিস্তিনিদের চূড়ান্ত নির্মূলকে ‘শান্তি’ হিসেবে বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত। 

এ আখ্যানের মোড় হলো– হামাসকে নিরস্ত্র করার পর পর্ষদ গাজার পুনর্গঠনের কাজ শুরু করবে। আর অন্তর্নিহিত ধারণা হলো, ইসরায়েল পরিচালিত দুই বছরের গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে; যদিও কোনো পশ্চিমা নেতা এটিকে গণহত্যা বলে স্বীকার করছেন না বা আক্রমণে আসলে কতজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, তা খুঁজে বের করার কথা ভাবছেন না। কিন্তু, আমরা যেমনটি দেখব– শান্তি অবশ্যই পর্ষদের লক্ষ্য নয়। এটি ধোঁয়াশা ও আয়নার নিন্দনীয় অনুশীলন।

‘পর্ষদ’ শব্দটি কেবল রাজনীতির চেয়ে ব্যবসায়িক ভাষার প্রতি ট্রাম্পের অগ্রাধিকারের ইঙ্গিতই দেয় না, এটি গাজার ‘রূপান্তর’ থেকে তিনি যে ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করতে চান, তারও ইঙ্গিত দেয়। তাঁর পরিকল্পনা হলো, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গাজার ভাগ্যের ওপর যে কোনো নজরদারি থেকে বিরত রাখা। নিবন্ধে জনাথন কুক বলেন, ‘আমরা ভাইসরয়ের সময়ে ফিরে এসেছি। উপনিবেশবাদ আবারও গর্বিত রূপ নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।’ 

ল্যাবের ইঁদুর
ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর কেবল গাজার দখল পরিচালনার চেয়ে বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। প্রকৃতপক্ষে, বিভিন্ন দেশের কাছে পাঠানো বোর্ডের তথাকথিত ‘সনদে’ উপত্যকা ও এর ভবিষ্যতের কথা উল্লেখই নেই। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো আমন্ত্রণপত্র ফাঁস হলে তা থেকে জানা যায়, ট্রাম্প বোর্ডকে ‘বিশ্বব্যাপী সংঘাত সমাধানের জন্য সাহসী নতুন পদ্ধতি’ হিসেবে তাতে উল্লেখ করেছেন। 
আমাদের মধ্যে কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন– ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের ল্যাব ইঁদুর হিসেবে দেখে। এটা তারা করে অস্ত্র ও নজরদারি প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য এবং ফ্যাসিবাদী, সামরিকবাদী ও সম্প্রসারণবাদী মতাদর্শের প্রত্যাবর্তন থেকে রক্ষার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিকশিত নিয়ম পরিবর্তন করতে। 

যুদ্ধোত্তর যুগে যেসব গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও মানবিক স্থাপত্য স্থাপন করা হয়, তার মধ্যে ছিল জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। গাজায় দুই বছরের গণহত্যার শুরু থেকেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কারণ, ইসরায়েল ছিটমহলের বাড়িঘর, স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি ভবন ও বেকারিগুলোতে কার্পেট-বোমা মেরেছে। দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এ এজেন্ডা আরও সম্প্রসারণ পেয়েছে।

উপত্যকার পুনর্গঠনে জামাতা কুশনারের ‘মাস্টার প্ল্যান’
তীব্র ঠান্ডা, ক্ষুধা, চিকিৎসা ও আবাসন সংকটের মধ্যে গাজার বাসিন্দারা যখন নিমজ্জিত, তখন গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ‘নতুন পরিকল্পনা’ প্রকাশ করেছে। রয়টার্স জানায়, ঘোষণার দিনই বিমান হামলা চালিয়ে ইসরায়েল অন্তত পাঁচজনকে হত্যা করেছে। এটা যুদ্ধবিরতির সর্বশেষ লঙ্ঘন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থাটি খবরের সঙ্গে একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে এক শিশুকে কাফনের কাপড় সরিয়ে কাতর ভঙ্গিতে মৃত বাবার মুখ শেষবারের মতো দেখতে দেখা যায়। 

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার গাজা নিয়ে তাঁর ‘মাস্টার প্ল্যান’ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘শুরুতে আমরা একটি মুক্ত এলাকা তৈরি করব। সেখানে একটি হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকা রয়েছে। তারপর কী হবে, তা আপনাদের জানা আছে। একটা বিপর্যয়কর সফলতা আসতে যাচ্ছে।’ এর আগে কুশনার পুরো গাজাকে অবকাশযাপন কেন্দ্রে রূপান্তরের কথা বলেছিলেন। আর তাঁর শ্বশুর ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি এটাকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরি’ বানাবেন। 

নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়াল
রয়টার্স জানায়, ইসরায়েলের হামলায় সর্বশেষ নিহতদের মধ্যে চারজন গাজা সিটির জয়তুন উপকণ্ঠে কামানের গোলার আঘাতে নিহত হয়েছেন। একজন দক্ষিণ গাজায় গুলিতে নিহত হন। এর এক দিন আগে তিন সাংবাদিক, দুই শিশুসহ ১১ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরায়েল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর এ পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি।

পড়ুন: ভারী অস্ত্র নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, সর্বাত্মক যুদ্ধ চালাবে ইরান

দেখুন: গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টিতে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা মির্জা ফখরুলের |

ইম/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন