বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর। তবে কুমিল্লার পাড়াগুলোতে তার নাম বহু আগে থেকে আলোড়ন তুলেছে। তখন সে শুধুই এক ছেলে, মাঠে বল আর ব্যাট নিয়ে খেলা করত।
কুমিল্লার পাড়ার ছেলেরা আজও মনে রাখে আদালত পাড়া থেকে মুন্সেফবাড়ি পর্যন্ত প্রাইমারি স্কুলের মাঠে যে ক্রিকেট খেলা হতো। ছোট ছোট লড়াই, তিন থেকে পাঁচ ম্যাচের সিরিজ, আর বিজয়ী দলের জন্য কাঠের তৈরি ‘শিল্ড’। ডিক বল আর ব্যাট হাতে ছোট্ট ছেলেটি বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।
কুমিল্লার বেশ কয়েকজন প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বলেন, সে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছে ১৯৮০ সালে, পুলিশ লাইন মাঠে কুমিল্লা ইউনিয়ন ক্লাব ও ইগলেস ক্লাবের মধ্যে। ঢাকার জাহাঙ্গীর শাহ বাদশা ও নাদির শাহও মাঠে উপস্থিত ছিলেন। তখন থেকেই তার চোখে ক্রিকেটের উচ্ছ্বাস দেখা যেত।
আসিফ আকবরের পরিবারও কুমিল্লার গর্বের। বাবা প্রয়াত অ্যাডভোকেট আলী আকবর সুপরিচিত আইনজীবী ছিলেন, মা প্রয়াত রোকেয়া আকবর গণসঙ্গীত শিল্পী এবং ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে শিক্ষিত ও কর্মঠ সবাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নাম লিখিয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে। পরে কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে এইচএসসি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কুমিল্লা ক্রিকেটার্সের কোচ এমদাদুল হক ইমদু প্রথমেই তার ক্রিকেট প্রতিভা দেখেন। ১৯৮৮ সালে নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটে নজরকাড়া পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সবাইকে মুগ্ধ করেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে স্কুল ও কলেজে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে অংশ নেন।
নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটে অংশগ্রহণ ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৯ সালে তার অধিনায়কত্বে কুমিল্লা জিলা স্কুল প্রথমবার শিরোপা জেতে। আন্তঃকলেজ ক্রিকেটে ১৯৯১ সালে কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯ বছর পর প্রথমবার কলেজটি এই শিরোপা ঘরে তোলে। কুমিল্লা জেলা ক্রিকেট লীগের অভিষেক ঘটে নবম শ্রেণিতে। ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের হয়ে অপরাজিত ৫৭ রান করেন। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে খেলতে গিয়ে ২৭ রানে ৬ উইকেট নেন। চট্টগ্রাম লীগে বার্ডস বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে খেলেন। অভিষেক ম্যাচে ৭৮ রান ও ৪ উইকেট অর্জন করেন।
মাসুদ স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে কুমিল্লা ক্রিকেটার্স বনাম ইলেভেন ব্রাদার্স ক্লাবের ম্যাচ ছিল স্মরণীয়। দলের রান তখন কম, ১৭ রানে ৫ উইকেট পড়ে যায়। আসিফ ও সতীর্থ জুটি অপরাজিত থেকে দলকে ১৩৭ রানে পৌঁছে দেয়। আসিফ খেলেন ৫০ রানের ইনিংস, কিন্তু ম্যান অব দ্য ম্যাচ হননি। ১৯৮৮-১৯৯৩ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কুমিল্লা জেলা যুব ক্রিকেট দলের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন। ১৯৯২-৯৩ সালে ঝিনাইদহ জোনাল চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে কুমিল্লা। ফাইনাল রাউন্ডে ঢাকার কাছে পরাজিত হলেও দ্বিতীয় দেশের সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ফাইনাল রাউন্ডে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিরুদ্ধে বোলিংয়ে হ্যাটট্রিক করেন।
সিনিয়র দলে ১৯৯৩ সালে চাঁদপুরে একবার অংশ নেন। কুমিল্লা ক্রিকেট লীগের অধিনায়কত্বে ৭ বার চ্যাম্পিয়ন হন – ব্রাদার্স ইউনিয়ন ৩ বার, ওয়ান্ডারার্স ২ বার, মনিপুরী এ সি ১ বার, ইউনাইটেড কমার্স ১ বার।
কুমিল্লা ক্রিকেটার্সের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে আসিফ ক্লাবের প্রশাসনিক দায়িত্বও নিয়েছেন। প্রধান কোচ অনুপস্থিত থাকলে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো তার হাতে। খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকেও প্রমাণ করতে হতো। ঢাকা দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লীগে খেলার সুযোগ পেলেও বিবাহ ও উচ্চশিক্ষার কারণে ক্রিকেটকে দূরে সরিয়ে দেন। কুমিল্লার ক্রিকেটাঙ্গন হারায় একজন সম্ভাবনাময় অলরাউন্ডারকে।
এদিকে কুমিল্লার গবেষক ও সংগঠক আহসানুল কবীর বলেন, আসিফ আকবর কুমিল্লাকে অন্তরের অন্তঃস্হল থেকে ধারণ করে। সে যেখানে, যে অবস্থাতেই থাকুক কুমিল্লাকে তুলে ধরবেই। এর জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতেই হবে।
পড়ুন : কুমিল্লায় চোর সন্দেহে যুবককে গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল


