চট্টগ্রাম নগরের ঐতিহাসিক কোর্ট হিল এলাকায় অবস্থিত বহু পুরোনো স্মারক ‘জিরো পয়েন্ট’ নতুন রূপে ফিরেছে। দীর্ঘদিনের অবহেলায় জীর্ণ হয়ে পড়া এই স্থাপনাটি সংস্কার শেষে আবারও ফিরে পেয়েছে তার ঐতিহাসিক মর্যাদা। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে সংস্কার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর শনিবার (৭ মার্চ ২০২৬) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ঐতিহ্যবাহী এই জিরো পয়েন্ট।
সংস্কারকৃত জিরো পয়েন্ট উদ্বোধনের সময় জেলা প্রশাসক বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, “একটি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যই মূলত তার সংস্কৃতির শেকড় নির্ধারণ করে। আমাদের সংস্কৃতির ইতিহাস কতটা প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ—তা এই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মাধ্যমেই জানা যায়। একই সঙ্গে এটি আগামী প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনাও দেয়।”

জেলা প্রশাসক জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর কোর্ট হিল এলাকায় পরিদর্শনে গিয়ে জিরো পয়েন্টের জীর্ণ ও অবহেলিত অবস্থা তার নজরে আসে। পরে এর ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকেই চট্টগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু চিহ্নিত করার জন্য সেখানে একটি স্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে ‘জিরো পয়েন্ট’ নামে পরিচিতি পায়।
তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম আমাদের দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এটি হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৮৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দুটি জেটির মাধ্যমে বন্দরের যাত্রা শুরু হয়। সেখান থেকেই এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটে।”
তিনি আরও বলেন, সে সময় ব্যবসা-বাণিজ্যের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং বিভিন্ন স্থানের দূরত্ব ও পরিমাপ নির্ধারণের সুবিধার্থে ব্রিটিশ সরকার একটি কেন্দ্র বা নির্দিষ্ট বিন্দু স্থাপন করে, যা পরবর্তীকালে জিরো পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত হয়।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে জিরো পয়েন্টের বর্তমান কাঠামোটি প্রথম নির্মাণ করা হয়। পরে ২০০১ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সীমিত পরিসরে কিছু সংস্কার কাজ করা হলেও স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও নান্দনিকতা ধরে রাখতে বড় পরিসরে সংস্কারের প্রয়োজন ছিল।
জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জিরো পয়েন্টের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এর সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেন। তার প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে স্থাপনাটিকে আরও দৃষ্টিনন্দন, পরিচ্ছন্ন এবং দর্শনার্থী ও পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন করা হয়।
সংস্কার শেষে নতুন নান্দনিক অবয়বে জিরো পয়েন্ট এখন চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নগর সৌন্দর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক বলেন, “আমাদের ঐতিহ্য আমাদেরই সংরক্ষণ করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধরে রাখা প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই আমরা জিরো পয়েন্টকে নতুনভাবে পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি।”
তিনি এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের ধন্যবাদ জানান।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহ সংরক্ষণ এবং নগরের সৌন্দর্যবর্ধনে জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
পড়ুন: আরও ৬ মাস যুদ্ধ চালাতে পারবে ইরান
আর/


