মানুষের আয়ু দিয়ে তার জীবন মাপা যায় না, জীবন মাপা হয় তার কর্ম দিয়ে। কিন্তু যখন কোনো কর্মঠ ও প্রাণবন্ত মানুষের জীবন প্রদীপ মাত্র ৪৬ বছর বয়সেই নিভে যায়, তখন সেই শোক কেবল ব্যক্তিগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে সামষ্টিক। গত ০৪ এপ্রিল ২০২৬, শনিবার সন্ধ্যার বিষণ্ণ আলোয় নাটোরের গুরুদাসপুরের চাঁচকৈর টেন রোজ ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তার এই মহাপ্রয়াণে চলনবিল জনপদের সাংবাদিকতা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল কেবল একজন সংবাদকর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মার্জিত রুচির মানুষ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সাবেক ছাত্র। তিনি নিজেকে সমাজ বিনির্মাণের কাজে নিয়োজিত করেন। গুরুদাসপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, চলনবিল প্রেসক্লাবের অন্যতম সদস্য ও বাংলাদেশের খবর সহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে তিনি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন।
তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ বাচিক শিল্পী ও উপস্থাপক। এলাকার যেকোনো আয়োজন বা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তার কণ্ঠস্বর ছিল অনিবার্য। ক্রীড়া অনুরাগী হিসেবে স্থানীয় তরুণদের উৎসাহিত করতে তিনি সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। তার সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ এবং পরোপকারী মানসিকতা তাকে ‘অজাতশত্রু’ হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত করেছিল।
মরহুমের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে জাতীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ে। শোক বার্তায় নেতৃবৃন্দ তার কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন, মাননীয় সংসদ সদস্য (নাটোর-৪) আলহাজ্ব আব্দুল আজিজ এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, “আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন আমার অত্যন্ত স্নেহাস্পদ এবং গুরুদাসপুরের একজন সম্পদ। তার মতো একজন দক্ষ সংগঠক ও সাংবাদিকের প্রয়াণ আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
সদ্য সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট নির্মাতা, মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী শোক জানিয়েছেন, মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
সাবেক সচিব ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী, জনাব সাইদুর রহমান তিনি আবু হেনা মোস্তফা কামালের অকাল প্রয়াণকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, সুমনের পরিবারের সাথে তার ঘনিষ্টতা উল্লেখ করে লিখেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল ছিলেন একটা নির্মল ও প্রানবন্ত ছেলে”।
মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় অঙ্গনে শোকের রোল পড়ে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নাটোর বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের বিকল্প ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা জনাব মো. মুকুল হোসেন গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিক সমাজে তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী নাটোর ইউনাইটেড প্রেসক্লাবের সভাপতি নাসিম উদ্দিন নাসিম এবং ইউনাইটেড প্রেসক্লাবের সদস্য ও নাগরিক টেলিভিশনের নাটোর জেলা প্রতিনিধি মেহেদী হাসান তানিম তার প্রিয় সহকর্মীর প্রয়াণে শোকাতুর হয়ে পরেন।
এছাড়া তার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সহযোদ্ধা সৈয়দ মুসাফির (বাচ্চু), মারজুক রাসেল ও মো.বাদশাসহ নাট্য ও সাহিত্য জগতের সুধীজনরা প্রিয় আবু হেনা মোস্তফা কামালের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন, শোক, সহমর্মিতা ও স্মৃতিচারণ করেছেন ।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল মৃত্যুকালে তার অশীতিপর পিতা মো. শাহাবউদ্দিন সাবু, মাতা, শোকাতুর সহধর্মিণী এবং দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র সন্তানসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মতো একজন অভিভাবকের চলে যাওয়া এই পরিবারের জন্য এক বিশাল পাহাড়সম শোকের বোঝা।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কর্ম ও স্মৃতি চলনবিলবাসীর হৃদয়ে অম্লান থাকবে। সাংবাদিকতার নৈতিকতা বজায় রাখা এবং সমাজের সাংস্কৃতিক মান উন্নয়নে তার যে একাগ্রতা ছিল, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।
যারা সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের উন্নয়নে নিজেদের নিবেদিত রাখেন তারা বরাবরই নিজের শরীর স্বাস্থ্যের প্রতি অমনোযোগী থাকেন। মৃত্যু একটি অনিবার্য বিষয় হোলেও তা আমাদের যেমন ব্যাতিত করে, মর্মাহত করে একই সাথে শিখিয়ে যায় জীবন ও কর্মের সাথে নিজের শারিরীক সুস্থ্যতার গভীর সাপেক্ষকতার গুরুত্বকে।
বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই আবু হেনা মোস্তফা কামাল (হ্যালো সুমন) ভাই এর প্রতিটি স্মৃতির প্রতি এবং মহান আল্লাহর দরবারে তার জান্নাতুল ফেরদাউস নসিবের দোয়া করি।
পড়ুন : নাটোরের গুরুদাসপুরে সাংবাদিক আবু হেনা মোস্তফা কামাল সুমনের অকাল প্রয়াণ


