জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও বিএনপির নেতা হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ অনিয়ম দূর্নীতির তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভে তুলে ধরেছেন তারিই পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সদস্য সেলিম হোসেন।
এনিয়ে ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লাইভে অপপ্রচার ও সংবাদ প্রকাশের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে জেলার গোপীনাথপুরের ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপির নেতা হাবিবুর রহমান। সেখানে সেলিম হোসেন ও আব্দুল বাছেদ বাদে বাকী ইউপি সদস্য উপস্থিত ছিলেন। শনিবার বেলা ১১টায় গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, আমার ইউনিয়ন পরিষদের ৭নং ওয়ার্ডের দীঘিরপড়া কাশিড়া এলাকায় সড়ক উন্নয়ন কাজ চলছিল সে সময় ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন কাজে বাঁধা প্রদান করেন। আমার ইউনিয়নে আমি সহ ১৩ জন সদস্য এর মধ্যে উল্লেখিত সেলিম হোসেন, আব্দুল বাছেদ বিগত পতিত সরকারের আ.লীগ নেতা ছিলেন। এর মধ্যে তারা বিভিন্ন মামলায় পালাতকও রয়েছেন। এই সেলিম আমার বিভিন্ন কাজে বাঁধা প্রদানসহ নানা অনিয়মের সাথে জড়িত। নানা অনিয়মের জন্য তাঁকে পরিষদ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হয়। তার প্রেক্ষিতে সে গত ২৭ মার্চ রাতে ক্ষিপ্ত হয়ে আমার নামে নানা রকম অনিয়মের কথা সোশ্যাল মিডিয়া ফেইসবুকে অপপ্রচার করে। সে আমার নামে বিভিন্ন মিথ্যা কথাবর্তা বলে, এতে আমার সম্মানহানী হয়েছে। তিনি বলেন সেলিম মেম্বার যে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে তা সম্পন্ন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ইউপি সদস্য সেলিম কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব না দেয়ায় ইউপি পরিষদ অনাস্থা প্রস্তাব আনবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, একই দিনে বেলা ২টায় ইউনিয়নের কাশিড়া বাজারে নিজস্ব অফিসে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন। সেখানে দু’জন ভুক্তভোগীও উপস্থিত ছিলেন বলে দেখা গেছে।
অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন বলেন, মাতৃত্বকালীন ভাতার সুবিধাভোগীর তালিকায় নাম উঠাতে ৮-১০ হাজার টাকা করে ঘুষ নেন চেয়ারম্যান। ভাতা ভোগীর পর সেই কার্ড আবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিবর্তন করে ফের অন্য জনের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে তাঁর নাম তালিকায় তুলে দেন। অনেকের কাছ থেকে তালিকায় নাম তুলে দেওয়ার কথা বলে ঘুষ নিলেও তালিকায় তাঁদের নাম আসেনি উঠাননি তিনি, পড়ে সেই ঘুষের টাকা ফেরৎও দেননি তিনি।
ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন আরও বলেন, কাবিটা প্রকল্পের আওতায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে দীঘিপাড় গ্রামে ইট সোলিং রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছিল। এ প্রকল্পের সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান সেটি আমরা কেউ জানতাম না। মিস্ত্রিরা রাস্তার কাজ করছিলেন। এ রাস্তার কাজে ভাঙাচুড়া ইট ব্যবহার করা হচ্ছিল। লোকজন নিম্নমানের ইট সোলিং রাস্তার কাজের কথা আমাকে জানান। আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে ভাঙাচুড়া ইট দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করতে দেখে ছবি তুলেছি। ভালো ইট দিয়ে কাজ করার কথা বলেছি। এতে ইউপি চেয়ারম্যান আমার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। তিনি আমার বিরুদ্ধে প্রকল্পে কাজ বন্ধ করার অভিযোগ তুলে আমাকে সময় বেঁধে দিয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ দেন। আমি বৃহস্পতিবারে নোটিশের জবাব দিয়েছি ইউপি চেয়ারম্যান তা গ্রহন করেনি। ইউএনও কার্যালয়ে গিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দিয়েছি। ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ঘুষ ছাড়া কাজ করেন না। তিনি মাতৃত্বকালীন ভাতার সুবিধাভোগীর তালিতায় নাম উঠাতে ৮-১০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। অনেকের এখনো মাতৃত্বকালীন সুবিধাভোগীর তালিকায় নাম উঠেনি। তিনি তাঁদের টাকাও ফেরত দেননি। আমার ওর্য়াডে ছয় জন মাতৃত্বকালীন ভাতা পেতেন। তাঁদের মুঠোফোন নম্বর পরির্বতন করা হয়েছে। কেউ এক বছর আবার কেউ দশ মাস ধরে ভাতা পাচ্ছেন না। ভাতাভোগীদের ৫৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এঘটনায় মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগী মোছাঃ মহিদা কাশিড়া খলিফাপাড়ার ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। এরপর ১৫ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়। ভাতাভোগীরা বাঁকি টাকা এখনও ফেরত পাননি। এছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ৭ টন জিআর বরাদ্দ হয়েছিল। ইউপি চেয়ারম্যান চালের কাউকে ৪ হাজার আবার কাউকে দশ টাকা দিয়েছেন।
ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন আরও বলেন, গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদ অনিয়ম-দূর্নীতিতে জর্জরিত। গ্রাম আদালতের ফৌজদারি ফিস ২০ আর দেওয়ানী ১০ টাকা ফিস। ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে ফৌজদারী ও দেওয়ানীর ফিস ৩০০ টাকা করে নেওয়া হয়। মোটা অঙ্কের টাকা হলে বয়স কম-বেশি করে জন্ম নিবন্ধনও মেলে। ওয়ারিসান সনদ ৫০ টাকা পেতে নেওয়া নিয়ম কিন্তু ২০০ টাকা করে ফিস নেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ভুক্তভোগী তছলিম উদ্দিন বলেন, আমার মেয়ের মাতৃত্বকালীন ভাতার তালিকায় নাম উঠানোর জন্য চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের হাতে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছিলাম। মেয়ে আমার কয়েক মাস টাকা পেয়েছিল। তাঁর পর হিসেব নম্বর পরিবর্তন করে আবার একজনকে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) রাত ৯টায় “সেলিম মেম্বার কাশিড়া” নামে ফেসবুক আইডি থেকে ২৫ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে ধরে লাইভে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ-দূর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৭নং ওয়ার্ডের সাধারণ সদস্য সেলিম হোসেন।
এনএ/