জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রদলের বর্ধিত কমিটি ও হল কমিটিতে পদের জন্য হত্যা মামলার এক আসামী দৌঁড়ঝাপ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত হামিদুল্লাহ সালমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ৪৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি সম্প্রতি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে উঠেছেন এবং হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রত্যাশী।
গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একদল শিক্ষার্থীর হামলায় ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের (৩৯ ব্যাচ) ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা শামীম মোল্লা নিহত হন। ঘটনার পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে ৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে এবং তাদেরকে তাৎক্ষণিক সাময়িক বহিষ্কারও করে। পরে গত ১৭ মার্চ দিবাগত রাতে অনুষ্ঠিত এক সিন্ডিকেট সভায় শামীম মোল্লা হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে হামিদুল্লাহ সালমানসহ বাকিদের ৬ মাসের জন্য বহিষ্কার করে প্রশাসন।
এছাড়া, একই ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শামীম মোল্লার ভাই শাহীন মোল্লা বাদী হয়ে পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার অন্যতম আসামী হামিদুল্লাহ সালমান৷ এ মামলায় ইতোমধ্যে তিন জন আসামী কারাভোগ করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন তিনি৷ অভিযোগ উঠেছে জাবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ও সালমানের বাবা জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুর রহিম পাটোয়ারীর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সালমান অধরাই রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামিদুল্লাহ সালমানের বাবা মাওলানা আবদুর রহিম পাটোয়ারী চাঁদপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির। ২০১৮ সালে তাকে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷
শাখা ছাত্রদলের একাধিক শীর্ষ যুগ্ম-আহ্বায়ক জানান, “সালমান মূলত ছাত্রদলে ছাত্রশিবিরের অনুপ্রবেশকারী৷ তিনি ‘এন্টি আওয়ামী বিরোধী’ মনোভাবের কারণে ছাত্রদলের সাথে বেশ কিছু প্রোগ্রাম করেছেন। শাখা ছাত্রদলের ১৭৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে তার নাম নেই৷ সালমান ছাত্রদলের কেউ না।”
জাবি শাখা ছাত্রদলের বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির ২ যুগ্ম-আহ্বায়ক ও কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ছয় মাস পলাতক থাকার পর কোনো জামিন ছাড়াই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ছাত্রদলের কর্মসূচিতে সক্রিয় সালমান৷ শামীম মোল্লা হত্যা মামলার আসামীদের তখন কেন্দ্রীয় ছাত্রদল এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দলের কর্মী নয় বলে জানায়। এখন ছাত্রদলের কর্মী পরিচয় দিয়ে বর্ধিত কমিটি ও হল কমিটির পদের জন্য দৌঁড়ঝাপ করছেন হত্যা মামলার আসামী। এতে শিবির সংশ্লিষ্ট বা হত্যা মামলার কোন আসামী যদি ছাত্রদলের কমিটিতে পদ পায় তাহলে জাতীয়ভাবে ছাত্রদল বিতর্কিত হবে। এটা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দেখার বিষয়।”
এদিকে, হত্যা মামলার ‘পলাতক’ আসামী রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
জাবি ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক ঋদ্ধ অনিন্দ্য গাঙ্গুলি বলেন, “শামীম মোল্লা হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় কয়েকজন সাজাপ্রাপ্ত হলেও গ্রেপ্তার এড়িয়ে প্রকাশ্যে ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা করছেন কয়েকজন। ভিডিয়ো ফুটেজ থেকে শামীম মোল্লাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাতকারীদের চেহারা ও পরিচয় স্পষ্ট। ছয় মাসের বহিষ্কারের নাটকের মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত এড়িয়ে তাদের ক্যাম্পাসে পুনর্বাসিত করছে প্রশাসন। এই ঘটনা গণতন্ত্রের নামে চরম দ্বিচারিতা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি অবমাননার শামিল। এধরনের ঘটনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।”
এ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমাদের আগে জাবি কেন্দ্রীয় কমিটি বর্ধিত করতে হবে৷ বর্ধিত করার পর মেয়েদের হলগুলোতে কমিটি দিবো এরপর ছেলেদের হলে কমিটি দেওয়া হবে৷ সালমানের ব্যাপারে ছাত্রদলের কেন্দ্র থেকে যে নির্দেশনা আসবে, আমরা তা অনুসরণ করবো।”
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও জাবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়া বলেন, “হত্যা মামলার আসামীকে ছাত্রদল আশ্রয় দেয় না, দিবেও না। কেউ যদি নির্দোষ হন তাহলে ছাত্রদল কেন, যেকোন রাজনৈতিক দল তিনি করতে পারেন।”
এ বিষয়ে জানতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে একাধিকবার কল করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (পিবিআই) আনিসুর রহমাম বাপ্পি হামিদুল্লাহ সালমানের বিষয়ে বলেন, “সালমান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করছে এমনটি আমাদের জানা নেই৷ তবে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তার কোন রাজনৈতিক পরিচয় এখন পর্যন্ত আমাদের তদন্তে প্রভাব তৈরি করেনি৷”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আজিজুর রহমান বলেন, “শামীম মোল্লা হত্যার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সালমানসহ জড়িত যাদের ছাত্রত্ব ছিল তাদেরকে ৬ মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। বাকিদের সনদপত্র স্থগিত করা হয়েছিল। আর, প্রশাসন থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি কোন আসামীর বিরুদ্ধে সহযোগিতা চায় তা প্রশাসন করবে।”
পড়ুন: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাকা থেকে বিশেষ বাস সার্ভিস শুরু
এস/


