বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তার চুড়ান্তে থেকে মৃত্যুবরণ করার সৌভাগ্য যার , যিনি সৈনিক থেকে রাজনীতিক, কমল থেকে বীরউত্তম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আজ তার ৯০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতার নাম মনসুর রহমান এবং মাতার নাম জাহানারা খাতুন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জিয়াউর রহমান দ্বিতীয়। তাঁর শৈশবের কিছুকাল বগুড়ার গ্রামে ও কিছুকাল কলকাতা শহরে অতিবাহিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের পর তাঁর জন্মস্থান পূর্ব পাকিস্তানের অংশে চলে আসে, করাচীতে এক মাসের মতো ভাড়া বাসায় থাকার পর জেকব লাইনে তারা বসবাস শুরু করেন। ১৯৪৮ সালের ১ জুলাই কমল ‘করাচী একাডেমী স্কুলে’ সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে এই স্কুল থেকেই ২য় বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন ডি.জে কলেজে। একই বছর তিনি মিলিটারি একাডেমীতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন।
১৯৫৩ সালে কাকুল পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করে ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন প্রাপ্ত হন। দুই বছর সেখানে চাকুরি করার পর ১৯৫৭ সালে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন।
১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুর শহরের বালিকা, খালেদা খানমের (বেগম খালেদা জিয়া) সঙ্গে জিয়াউর রহমান বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে ‘হিলাল-ই-জুরাত’ খেতাবে ভূষিত করে।
১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে পেশাদার ইনস্ট্রাক্টর পদে নিয়োগ লাভ করেন। সে বছরই পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটার স্টাফ কলেজে কমান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে মেজর পদে উন্নীত হয়ে জয়দেবপুরে সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদে পোস্টিং পান। এরপর উচ্চ প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানিতে যান।
১৯৭০ সালে একজন মেজর হিসেবে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন, মেজর জিয়া এবং তাঁর বাহিনী সামনের সারি থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং বেশ কয়েকদিন তাঁরা চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখতে সক্ষম হন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে প্রথমে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন এবং চট্রগ্রাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম, নোয়াখালী,রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেণী প্রভৃতি স্থানে নেতৃত্ব দেন। তিনি সেনা-ছাত্র-যুব সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তীতে ১ম,৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এই তিনটি ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রথম নিয়মিত সশস্ত্র ব্রিগেড জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান, যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল হতে জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং তারপর জুন হতে অক্টোবর পর্যন্ত যুগপৎ ১১ নম্বর সেক্টরের ও জেড-ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানকে কুমিল্লায় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমান্ডার নিয়োগ করা হয় এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ-অফ-স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি তিনি ব্রিগেডিয়ার পদে এবং বছরের শেষের দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবর রহমানের নিহত হওয়ার পর, খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঐ বছরের ২৫ আগষ্ট জিয়াউর রহমান চীফ অব আর্মি স্টাফ নিযুক্ত হন।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বাধীন ঢাকা ব্রিগেডের সহায়তায় মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ এক ব্যার্থ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। এর ফলে ৬ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং আবু সাদাত সায়েম বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হন। এর পর জিয়াউর রহমানকে চীফ-অফ-আর্মি স্টাফ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে একই দিনে সেনা সদর দফতরে এক বৈঠকে বিচারপতি এএসএম সায়েমকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং তিন বাহিনীর প্রধান করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার জন্য একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো সাজানো হয়। জিয়াউর রহমান ১৯ নভেম্বর ১৯৭৬-এ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন যখন বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করেন এবং শেষ পর্যন্ত ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি সায়েম পদত্যাগ করলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তার জৈষ্ঠ্য পুত্র জনাব তারেক রহমান দলের চেয়ারম্যান।
১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়া শহীদ হন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে (জিয়া উদ্যান) দাফন করা হয়। জিয়ার জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম ঘটে যেখানে প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উল্লেখযোগ্য কাজ:
- সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান।
- জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি।
- বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া।
- সংবিধানে ”বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম ”সন্নিবেশ এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস নীতি যোগ করেন।
- দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব।
- সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনর্খনন।
- গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লক্ষ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান।
- গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা প্রদান ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) গঠন।
- গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ করা।
- হাজার হাজার মাইল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ।
- ২৭৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ করে গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধিকরণ।
- নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের ভেতর দিয়ে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ।
- কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি।
- কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশকে খাদ্য রপ্তানীর পর্যায়ে উন্নীতকরণ।
- যুব উন্নয়ন মন্ত্রাণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ।
- ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিকরণ।
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন।
- তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের জনগণকে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করণ এবং সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন।
- জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসনলাভ।
- তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি।
- দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ।
- বেসরকারিখাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ।
- জনশক্তি রপ্তানি, তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যোর রপ্তানীর দ্বার উন্মোচন।
- শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ।
- বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমার ভেতর বসবাসকারী ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম জাতি গোষ্ঠী বর্ণ সাংস্কৃতির জনগণকে ঐক্যর প্রতীক ও মহান পথ ”বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” এর পতাকাতলে নিয়ে আসেন।
- প্রেসিডেন্ট জিয়ার পররাষ্ট্র নীতির সাফল্যে বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালে শক্তিশালী জাপানকে হারিয়ে প্রথমবারের মত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত।
- দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহায়তা সংস্থা (সার্ক) গঠিত হয় তাঁর উদ্যোগে।
পড়ুন: নির্বাচনে এনসিপি অংশ নেবে কি না পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে : আসিফ মাহমুদ
আর/


