বিজ্ঞাপন

জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিস্থিতি মার্চে সামাল দেওয়া গেলেও কঠিন হবে এপ্রিল

জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বিপুল ঘাটতি নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন মাস। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাব মার্চের পুরোটা সময় থাকলেও এলএনজির চারটি জাহাজ আগেই অতিক্রম করতে পেরেছিল হরমুজ প্রণালি। এর সঙ্গে আগের মজুত যুক্ত করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে সরকার। আগামীতেও জ্বালানি সংকট তীব্র হবে না বলে আশ্বস্ত করছে মন্ত্রণালয়। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। 
যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি পার হয়ে একটি জাহাজও আসেনি দেশে। এলএনজি, এলপিজি, গ্যাস অয়েল, বেস অয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানি নিয়ে বিকল্প দেশ থেকে মার্চের ৩১ দিনে ৩৮টি  জাহাজ এসেছে। তবে বুকিং থাকার পরও মার্চে এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে ২৬ জাহাজের মধ্যে এসেছে মাত্র ১৫টি। এপ্রিলে যে বুকিং আছে, সেটিরও দুই-তৃতীয়াংশ নিশ্চিত হয়নি এখনও।  

বিজ্ঞাপন

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, অগ্রাধিকার ঠিক করে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। শৃঙ্খলা ফেরানো দরকার বিতরণ ব্যবস্থায়ও। দেশ থেকে তেল পাচার হয়ে যাওয়া, অবৈধভাবে মজুত করা, আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা, প্রশাসনের তদারকির দুর্বলতা ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে না পারায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে গত মঙ্গলবার স্পট ও জিটুজি পদ্ধতিতে দুই লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি কেনার অনুমতি দিয়েছে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

মার্চে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে ১৭টি জাহাজ আসার কথা ছিল বিপিসির। তবে পুরো মাসে এসেছে ১০টি জাহাজ; যেগুলোতে তেল ছিল মাত্র আড়াই লাখ টন। বুকিং থাকলেও আসেনি দেড় লাখ টন জ্বালানি তেলের বাকি ছয়টি জাহাজ। অভিন্ন চিত্র আছে এলএনজি নিয়েও। মার্চে ৯টি এলপিজি বোঝাই জাহাজ আসার কথা থাকলেও এসেছে পাঁচটি। বুকিং থাকলেও আসেনি প্রায় তিন লাখ টনের চারটি এলপিজির জাহাজ। একইভাবে সূচি নির্ধারিত থাকার পরও ক্রুড অয়েলের দুটি জাহাজের একটিও আসেনি। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের এই সংকট দূর করতে বিকল্প দেশের দ্বারস্থ হয়েছে সরকার। ১২ দেশ থেকে সর্বশেষ মাসে দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাস এনেছে ৩৮টি জাহাজ। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প দেশেরও দরজা আস্তে আস্তে বন্ধ হবে। তখন বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকেও জ্বালানি কেনা কঠিন হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব জ্বালানি তেল ও গ্যাসে পড়লেও বিকল্প ভাবনা আছে আমাদের। আশা করছি, এপ্রিল, মে মাসেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারব আমরা। তবে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা, অবৈধ মজুতের প্রবণতা ও সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে তেল পাচারের চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। এ জন্য সামনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

চট্টগ্রাম বন্দরের ‘ভেসেল অ্যারাইভাল লগ’ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসের ৩১ দিনে ৩৮টি জাহাজের পণ্য খালাস করেছে তারা। এর মধ্যে এলএনজির আটটি, এলপিজি বোঝাই ৯টি, গ্যাস অয়েলের আটটি, এইচএসএফও বোঝাই চারটি, বেস অয়েলের দুটি, এমইজি বোঝাই একটি, ইথিলিনের একটি ও কনডেনসেটের জাহাজ ছিল একটি। এর মধ্যে কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাহাজ ছিল ৯টি। মার্চে বেশির ভাগ জাহাজ এসেছে বিকল্প দেশ থেকে। সিঙ্গাপুর থেকে ৯টি, মালয়েশিয়া থেকে আটটি ও ভারত থেকে এসেছে পাঁচটি জাহাজ। এখন অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে জ্বালানি আনছে কিছু জাহাজ। চলতি এপ্রিল মাসে এখন পর্যন্ত এসেছে তিনটি জাহাজ। গতকাল শুক্রবার ২৭ হাজার টন গ‍্যাস অয়েল নিয়ে একটি জাহাজ নোঙর করেছে বন্দরে। চলতি মাসে এলএনজি ও ইথিনিল নিয়ে এসেছে আরও দুটি জাহাজ।

এলএনজি আমদানির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের সিনিয়র ডিজিএম মো. নুরুল আলম বলেন, প্রতি মাসে গড়ে ৯ থেকে ১০টি জাহাজ এলএনজি আমদানি করা হয় আমাদের মাধ্যমে। মার্চে এসেছে মাত্র পাঁচটি। আর এপ্রিলে জন্য এখন পর্যন্ত একটি এলএনজির জাহাজ এসেছে। এই জাহাজটির পণ্যও কেনা হয়েছে স্পট মার্কেট থেকে।’

বুকিং থাকার পরও আসেনি জাহাজ
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন (বাণিজ্য ও অপারেশন) বলেন, চীনের ইউনিপেক ও মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং বিপিসির বড় দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হলেও যুদ্ধের কারণে তাদের থেকে তেল যথাসময়ে পাইনি আমরা। গত ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার কথা থাকলেও জাহাজটি আটকে আছে হরমুজ প্রণালিতে। আবার আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে তেল আনার জন্য ভাড়া করা ‘এমটি ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামে জাহাজটির চুক্তিও বাতিল হয়েছে। এ জন্য মার্চে অপরিশোধিত তেলের নতুন কোনো চালান দেশে আসেনি। হরমুজ প্রণালিতে বাধা পাওয়ায় বুকিং থাকার পরও মধ্যপ্রাচ্য থেকে গত মাসে আসেনি চার জাহাজ এলএনজি। ‘লিব্রেথা’ নামে একটি জাহাজ এলএনজি লোড করার পরও আসতে পারছে না চট্টগ্রামে। ‘ওয়াদি আল সেইল’ নামে আরেকটি জাহাজ এলএনজি লোড করার জন্য  হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে যেতে পারছে না টার্মিনালে।

জ্বালানি তেলের চাহিদা কত
বিপিসির হিসাবে, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। মোট চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত আকারে এনে দেশে পরিশোধন করা হয়, বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়। আর প্রতি মাসে দেশে এলপিজি আনা হয় ছয় লাখ টনের বেশি। মার্চে এসেছে তিন লাখ টনের কম। যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে গেছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, যুদ্ধের কারণে চাহিদামতো জ্বালানি আসছে না। যেটা আসছে, সেটাও ঠিকভাবে পাচ্ছেন না গ্রাহক। শৃঙ্খলা ফেরাতে এখন মাঠে নেমেছে বিজিবিও। কৃত্রিম সংকট ও পাচার রোধে ৯টি জেলার ১৯টি ডিপোতে অস্থায়ী বেস ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

পড়ুন:টুর্নামেন্টসেরা বাংলাদেশের গোলরক্ষক, দেশবাসীকে শিরোপা উৎসর্গ

দেখুন:যুক্তরাষ্ট্রের ফিফথ ফ্লিটে ইরানের হা\ম\লা |

ইমি/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন