ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহে জামায়াত ইসলামীর কাছে ভরাডুবি হয়েছে বিএনপি’র। জেলার ৪টি আসনের মধ্যে ঝিনাইদহ-১ ছাড়া বাকি তিন আসনেই জামায়াতের কাছে হেরেছে বিএনপি। ফলে দীর্ঘদিনের ঘাঁটি হারিয়ে দলটি এখন নতুন করে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে। তবে দলটির এমন ভরাডুবির পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সালিশ ও মামলা বাণিজ্যের মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ড। এ ছাড়া গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে সাংগঠনিক কাজ পরিচালনা করা ও নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ থেকে আসা বিতর্কিত ও অত্যাচারী নেতাদের বিএনপিতে স্থান দেয়াসহ ত্যাগী ও নির্যাতিত বিএনপি কর্মীদের অবমূল্যায়নও এমন ফলাফলের কারণ হতে পারে। তবে, ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজের কাউকে মূল্যায়নই জেলার ভঙ্গুর এই রাজনীতিকে উত্তরণ ঘটাতে পারে বলে মনে করেন তৃণমূল বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা।
জানা যায়, ঝিনাইদহ-২ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে পরপর চারবার আধুনিক ঝিনাইদহের রূপকার হিসেবে পরিচিত মরহুম মসিউর রহমান ধানের শীষ নিয়ে বিজয় লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি ছিলেন সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন প্রবীণ ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য নেতা। তৃণমূল থেকে ওঠে আসা এই রাজনীতিবিদের সঙ্গে ছিল জনগণের নিবিড় সম্পর্ক। তার সততা, জাতীয়তাবাদী আদর্শ আধুনিক শহর ও জেলাতে বিএনপিকে শক্ত অবস্থানে রেখেছিল। ফলে তার মৃত্যু শুধু একটি আসন নয়, পুরো জেলার বিএনপি’র জন্য শূন্যতা তৈরি করেছে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, দলের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নেতৃত্বের লড়াইয়ে সাধারণ কর্মীরা বিভ্রান্ত হয়েছেন। চাঁদাবাজি ও দখলবাজিতে জনগণের ক্ষোভ বেড়েছে। সালিশ ও মামলা বাণিজ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ থেকে আসা নেতাদের স্থান দেয়ায় নির্বাচনের পূর্বে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এতে ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের কর্মীরা অবমূল্যায়িত হয়েছেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করেছেন, তাদের গুরুত্ব না দিয়ে নতুন আগন্তুকদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ফলে তৃণমূলের ক্ষোভ বেড়েছে। এই সব কারণে বিএনপি জনগণের আস্থা হারিয়েছে। যার সুযোগ নিয়েছে জামায়াত। এদিকে নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থিতা বাছাইয়ে একাধিক সিদ্ধান্তও পরাজয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ ভোটাররা বিএনপি প্রার্থী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
জানা যায়, প্রয়াত মসিউর রহমানের সহধর্মিণী মাহাবুবা রহমান শিখা এখন সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি পদপ্রার্থী। তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করেন, তার প্রার্থিতা স্থানীয় বিএনপি’র জন্য নতুন আশার আলো জাগিয়েছে। পেশায় আয়কর আইনজীবী মাহাবুবা জেলা বিএনপি’র সাবেক সদস্য ও জেলা মহিলা দলের উপদেষ্টা। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজ মনে করেন, মসিউর রহমানের অবদান ও তার সহধর্মিণীর প্রার্থিতা জনগণের আস্থা ও বিএনপি’র ঘাঁটি ঝিনাইদহ-২ (সদর) আসন পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। জনগণের প্রত্যাশা ও ঝিনাইদহের মানুষ চায় বিএনপি আবারো সঠিক পথে ফিরুক। নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বন্ধ হোক। জনগণের সমস্যার সমাধানে দল কার্যকর ভূমিকা রাখুক। ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হোক। মাহাবুবার প্রার্থিতা জনগণের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। দলের একাধিক দায়িত্বশীল বলেন, ঝিনাইদহে বিএনপি’র আসন হারানো নিঃসন্দেহে বড় ব্যর্থতা। পাশাপাশি এটা বিএনপি’র জন্য শিক্ষা। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া আস্থা ফিরবে না। তবে মসিউর রহমানের অবদান এবং তার সহধর্মিণীর প্রার্থিতা দলটির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। জনগণের আস্থা ও দলীয় শক্তিকে পুনরুদ্ধারে এটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
পড়ুন : ঝিনাইদহের শৈলকুপায় পারিবারিক বিরোধে মারপিটে একজনের মৃত্যু


