ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মসনদে বসার পর থেকে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক কোন দিকে গড়াবে এ নিয়ে চলছে বেশ গুঞ্জন। তবে দায়িত্ব গ্রহনের সপ্তাহ যেতে না যেতেই তার নির্বাহী আদেশ জড় তুলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সব ধরনের বৈদেশিক সহয়তা বন্ধ ঘোষণা দেন রিপাবলিকান এই নেতা। যা বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে একরাশ হতাশা। বিপদে অন্তবর্তী সরকার।
এশিয়ার সব থেকে মার্কিন সহয়তা গ্রহনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে চলমান শতাধিক প্রকল্পে এর প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত মাথা ব্যাথার কারন হতে পারে বাংলাদেশের জন্য। এর ফলে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, শিক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন খাত যেমন ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে, বিপদে পড়তে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোতে কর্মরত কর্মীরা। তবে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও পুষ্টি কার্যক্রমের অর্থায়ন বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশ পৌঁছায় ইউনাইটেড স্টেটস্ এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট বা ইউএসএইড-এর মাধ্যমে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ২.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া গত ৫০ বছরে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ ২০২১ সালে বাংলাদেশকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে ৪৭০ মিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে ৪৯০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪ সালে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে দেশটি। এখন ট্রাম্পের এই নির্বাহী আদেশের ফলে শুধু ইউএসএইড সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোই নয়, প্রভাব পড়বে ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউএনডিপিসহ আইসিডিডিআর, ও বির মতো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সাহায্য দাতা দেশটি ২০২৩ সালে ৬৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশি সহায়তা খাতে ব্যয় করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এমন সিদ্ধান্ত উন্নয়ন সহয়তা থেকে শুরু করে সামরিক সহয়তা পর্যন্ত সবকিছুকে প্রভাবিত করে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে।বিবিসি বলছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সব বিদেশি সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে এবং নতুন করে সাহায্য স্থগিত করেছে। বিদেশী মার্কিন দূতাবাস গুলোতে পাঠানো নথিতে এমন তথ্য দেখা গেছে।
ক্ষমতা গ্রহণের সময় বৈদেশিক সহায়তা উপর কঠোর বিধি নিষেধ সংক্রান্ত আমেরিকা ফাস্ট নীতির আশ্বাস দেন ট্রাম্প। ফাঁস হওয়া ওই নীতিতে বলা হয়েছে প্রতিটি নতুন এবং বিদ্যমান বৈদেশিক সহায়তা সম্প্রসারণের প্রস্তাব পরিপূর্ণভাবে পর্যালোচনা ও অনুমোদনের আগ পর্যন্ত এগুলোর অধীনে বাধ্যতামূলকভাবে অর্থ বরাদ্দ দেয়া যাবে না।
শুধু অর্থায়ন বন্ধ হওয়ার খবরে আইসিডিডিআরবি পরিচালিত বিনামূল্যে জিন এক্সপার্ট কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এ প্রজেক্টের এক হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুতির চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মৈত্রী প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে।কেয়ার বাংলাদেশের ইতোমধ্যে ১০০ মিলিয়ন লস হয়েছে।
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত মোটা দাগে প্রভাব পড়বে টিকা-স্যানেটারি পণ্যে, গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট, ওষুধ শিল্প সহ ‘বেকারত্ব-বৈদেশিক মুদ্রায়। এমনকি এই ধরনের সিদ্ধান্ত দেশে অপুষ্টির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং লাখ লাখ দুর্বল ব্যক্তিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে বলেও মনে করেন অনেকে।
স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৩ বছরে আমেরিকা বাংলাদেশকে এই সহযোগিতাগুলো করে আসছে। সেগুলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ পলিসি মেকিংয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে চাইল্ড হেলথের ক্ষেত্রে। এখন যদি এই সহযোগিতায় স্থায়ীভাবে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়, তাহলে দ্রুতই অলটারনেটিভ পার্টনারশিপ খুঁজতে হবে। আর যদি বন্ধ না করে, তাহলে সেটাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে।বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টরা আরো বলেন, আমরা আশা করব তিন মাসের মধ্যে আবারও কাজ শুরু করতে পারব। কিন্তু যদি স্থায়ীভাবে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায় তাহলে শুধু আমরাই নয়, পুরো বাংলাদেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি কেবল চ্যালেঞ্জ নয়, একটি বার্তা। এই সহায়তা স্থগিতের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশকে নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিতে হবে।
এনএ/


