মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ঠাকুরগাঁওয়ে শতগুণ বেড়েছে কালো সোনা খ্যাত পেঁয়াজ বীজের উৎপাদন। মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাসেই অধিক লাভের সম্ভাবনা থাকায় দিন দিন এই চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। পর্যাপ্ত মৌমাছি না থাকায় বীজ উৎপাদনে মানুষের হাতেই করা হচ্ছে পরাগায়ন। এতে স্থানীয়দের তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান, বিশেষ করে নারীদের। পাশাপাশি এই বীজ দেশের পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়াতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
ঠাকুরগাঁও জেলার প্রায় পাঁচটি উপজেলায় পেঁয়াজ বীজের চাষ হলেও সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায়। বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠজুড়ে চোখে পড়ে পেঁয়াজ গাছের সবুজ ডাঁটা আর কদম ফুলের মতো সাদা শুভ্র ফুলের সমারোহ। সবুজ মাঠ আর সাদা ফুলের এই দৃশ্য যেন প্রকৃতির এক মনোমুগ্ধকর চিত্র। মাঝে মাঝে দু-একটি মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করছে। তবে পর্যাপ্ত মৌমাছি না থাকায় কৃষকেরা নিজেরাই হাতে হাতে পরাগায়ন করছেন। এই কাজে যুক্ত হয়েছেন এলাকার শত শত নারী-পুরুষ শ্রমিক।ফলে গ্রামীণ নারীদের জন্যও তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ।
স্থানীয় শ্রমিকরা বলছেন, বছরের অনেক সময় এলাকায় কাজের সুযোগ থাকে না। কিন্তু পেঁয়াজ বীজের আবাদ শুরু হওয়ায় এখন তারা নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন। বিশেষ করে নারীরা ক্ষেতে কাজ করে যে আয় করছেন, তা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার খরচও মেটাতে পারছেন। তাদের আশা, আগামীতে পেঁয়াজ বীজের আবাদ আরও বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
পেঁয়াজ চাষি ও উদ্যোক্তারা বলছেন, এবার আবাদ ভালো হয়েছে। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে ভালো লাভের আশা করছেন তারা। বর্তমানে ৩৩ শতকের এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা। আর এক বিঘা জমিতে উৎপাদন হয় প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০ কেজি পেঁয়াজ বীজ। বাজারে প্রতি কেজি বীজের দাম যদি ২ হাজার টাকা হয়, তাহলে বিক্রি হয় প্রায় ৩ লাখ টাকার মতো। এতে লাভ থাকে প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে বীজ বিক্রির সুযোগ না থাকায় তারা অনেক সময় ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
কৃষকদের দাবি, পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন দিন দিন বাড়লেও সরকারি অনুদান বা কৃষি ঋণের সুবিধা তারা পাচ্ছেন না। যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে আরও নতুন উদ্যোক্তা এই খাতে যুক্ত হবেন বলে মনে করেন তারা।
তবে কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণের ব্যবস্থা এবং বিএডিসির মাধ্যমে উৎপাদিত বীজ ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পেঁয়াজ চাষিদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলের মাটি পেঁয়াজ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় আগামীতে জেলায় পেঁয়াজ বীজের উৎপাদন আরও বাড়বে বলেও আশা করছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে জেলায় মাত্র ৪০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজের আবাদ শুরু হয়। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই আবাদ শতগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২৫ হেক্টরে। যেখানে গত মৌসুমেই আবাদ হয়েছিল প্রায় ৫৪৭ হেক্টর জমিতে।
মাত্র পাঁচ বছরে শতগুণ উৎপাদন—ঠাকুরগাঁওয়ে পেঁয়াজ বীজ এখন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। কৃষকদের প্রত্যাশা, সরকারি সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হলে এই “কালো সোনা”ই হয়ে উঠবে জেলার অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি।
পড়ুন:বয়স্ক ভাতা নিয়ে প্রহসন: জালিয়াতিতে জ্যান্ত মানুষ ‘মৃত’
দেখুন:একবারও আইভীর নাম মুখে নিলেন না শামীম ওসমান
ইমি/


