32.2 C
Dhaka
০৫/০৩/২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

ডুমুরিয়ায় জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত জনজীবন

আকাশে কালো মেঘ জমলেই আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন খুলনার ডুমুরিয়াবাসী। তাদের জীবনে বর্ষা যেন আশীর্বাদ নয়, এক অভিশাপ। বৃষ্টি নামলেই থেমে যায় কাজকর্ম, বন্ধ হয়ে যায় জীবিকার পথ। চারদিকে পানি জমে লাখো মানুষ হয়ে পড়েন পানিবন্দি। জলাবদ্ধতা এখানে আর শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, এখন তা এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
ভাদ্রমাসের ক্যালেন্ডার চললেও বাস্তবে ডুমুরিয়া এলাকায় এখনো থৈ থৈ পানি। মাঠের পর মাঠ ডুবে আছে বৃষ্টির পানিতে, তলিয়ে গেছে ফসলী জমি। শত শত হেক্টর ধানক্ষেত আর হাজার হাজার চিংড়িঘের পানির নিচে ডুবে নষ্ট হচ্ছে। অথচ, এই জমে থাকা পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। প্রতিদিন বেড়ে চলেছে মানুষের দুর্ভোগ, আর কৃষকের বুকফাটা হাহাকার।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিল ডাকাতিয়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল। একসময় এই বিল কৃষি ও মৎস্যজীবী মানুষের জন্য আশীর্বাদ ছিল। আজ সেই বিল খুলনা ও যশোর এলাকার মানুষের কাছে অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এ অঞ্চলের একমাত্র শোলমারী নদী ছাড়া বাকি সব কটিই সম্পূর্ণ রূপে ভরাট হয়ে গেছে। বিল ডাকাতিয়ার পানি বের হওয়ার একমাত্র চ্যানেল শোলমারী নদীটি পলি পড়ে আংশিক ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এসব অঞ্চলে। ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের ডোমরার বিল, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখন পানির নিচে। পানির কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোতেও থাকতে পারছে না মানুষ। অনেক এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ক্লাস নিতে পারছেন না শিক্ষকরা।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, খুলনার ৯টি উপজেলার মধ্যে আয়তনে (৪৫৫ বর্গকিলোমিটার) সবচেয়ে বড় ডুমুরিয়া। এর ১৪টি ইউনিয়ন হলো ধামালিয়া, রঘুনাথপুর, রুদাঘরা, খর্ণিয়া, আটলিয়া, মাগুরাঘোনা, শোভনা, শরাফপুর, সাহস, ভান্ডারপাড়া, ডুমুরিয়া, রংপুর, গুটুদিয়া ও মাগুরখালী। এর মধ্যে ডুমুরিয়া, খর্ণিয়া, আটলিয়া, রংপুর, গুটুদিয়া, রঘুনাথপুর, ধামালিয়া ও মাগুরাঘোনা ইউনিয়নে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এসব ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ এখন পানিবন্দি।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বিএডসির খননকৃত খালগুলো দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও অপরিচর্য থাকায় খাদগুলোর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ওই এলাকার অন্তত ত্রিশটি গ্রামের ফসলি মাঠে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা।
রংপুর ইউনিয়নের মাধবকাটি গ্রামের বাসিন্দা প্রভাস মন্ডল জানান, ঘরের মধ্যে হাঁটুপানি। ঘরে উঁচু বাঁশের মাচা তৈরি করে ঘুমাতে হচ্ছে। বাথরুমে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। কেরোসিন জ্বালিয়ে অথবা সাধ্য থাকলে গ্যাসের চুলায় সামান্য রান্না করে দিন পার করতে হচ্ছে।
বিলপাটিয়ালা গ্রামের বাসিন্দা দীপঙ্কর মন্ডল বলেন, চারিদিকে প্রচুর পানি। ঘর থেকে নামলেই পানি। আষাঢ় মাস থেকে আমরা পানি বন্দী। গতবার যে গতিতে পানি নেমেছে সেই গতিতে নামলেও আরও ২ মাস সময় লাগবে। খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।
ডুমুরিয়া প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান জানান, দীর্ঘ জলাবদ্ধতার কারণে ৫ থেকে ৬টি বিদ্যালয়ের আশপাশ ও সড়ক পানিতে ডুবে আছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইনসাদ ইবনে আমিন বলেন, দুই দফায় অতিবর্ষণে ডুমুরিয়ার ১০০ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে থাকায় কাঁচা ফসল মরিচ, আদা, হলুদ, পেঁপে, শিম, তরমুজ, লাউ, টমেটো, উচ্ছে, ঝিঙে প্রভৃতির গাছ মরে যাচ্ছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, ভারী বর্ষায় ৪ হাজার মৎস্য ঘের ডুবে গেছে। এছাড়া স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে সাড়ে ৩ হাজার মৎস্য চাষির প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-আমিন জানান, ৯টি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রামে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মুজারঘুটা, সাড়াভিটা, কৃষ্ণনগর, বিলপাটিয়ালা, মাধবকাটি, মান্দ্রা, ময়নাপুর, বিলসিংগা, কোমলপুর, গুটুদিয়া, মির্জাপুর, হাজিডাঙ্গা, গোলনা, খলসী, সাজিয়াড়া ও আরাজি ডুমুরিয়া গ্রাম। তবে ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ক্ষতি নিরূপণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন বলেন, বিলডাকাতিয়া, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার পানি শোলমারী ও হামকুড়া নদী দিয়ে নিষ্কাশিত হতো। কিন্তু হামকুড়া নদী পুরোপুরি ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ শোলমারী নদী। তবে গত তিন বছর ধরে শোলমারী নদী ও স্লুইসগেটের মুখ পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। ভরাট হয়ে গেছে শোলমারী নদীর পানি যাওয়ার একমাত্র পথ আপার সালতা নদীও। মূলত এ কারণেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

সমাধানের উপায় হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, জরুরি ভিত্তিতে শোলমারী নদীর পলি অপসারণে আগে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকার কাজ হয়েছে। এছাড়া ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকার কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি ২ কোটি ৬০ লাখ টাকার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। তবে স্থায়ী সমাধানে প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে শোলমারী নদীর সাড়ে ১৫ কিলোমিটার ও ৯টি খাল খনন করা হবে। এছাড়া উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আরও ৫টি পাম্প স্থাপন করা হবে। আশা করা যায়, তখন জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে।

পড়ুন: কুড়িগ্রাম সাধারণ পাঠাগারের দখলদারিত্ব বন্ধে জেলা প্রশাসককে ১৯ সংগঠনের স্মারকলিপি

দেখুন: হোলি আর্টিজানে হামলা মামলা: ৭ জঙ্গির সাজা কমলো

ইম/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন