হাজারো আফগান নাগরিককে গোপনে যুক্তরাজ্যে সরিয়ে নেওয়ার যে পরিকল্পনা এতদিন চাপা ছিল, তা প্রকাশ্যে এসেছে আলজাজিরার প্রতিবেদনে।
২০২২ সালের শুরুতে, যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ভুলবশত ফাঁস হয়ে যায় প্রায় ৩৩ হাজার আফগান নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য। এদের অনেকেই আগে ব্রিটিশ সেনাদের হয়ে দোভাষী, চালক বা সহযোগী হিসেবে আফগানিস্তানে কাজ করেছিলেন।
তালেবানের কাছে সেই তথ্য পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কায় তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ডেটার অংশ চোখে পড়ে অনেকের। তখনই বিষয়টি আঁচ করতে পারে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
জরুরি ভিত্তিতে ২০২৩ সালে আদালতের কাছ থেকে নেওয়া হয় এক ‘সুপারইনজাংশন’ আদেশে তথ্য ফাঁস হওয়ার বিষয়টি প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে আদালত সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। আর এরপরই সামনে আসে যুক্তরাজ্যের ‘আফগান রেসপন্স রুট’ নামের এক গোপন পরিকল্পনা।
নথি বলছে, এই কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার আফগানকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। আরও অন্তত ২০ হাজার মানুষকে পুনর্বাসন দিতে হতে পারে। এরই মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার আফগান ব্রিটেনে আশ্রয় পেয়েছেন বা এই প্রক্রিয়ায় আছেন।
এই এক কর্মসূচিতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এ ঘটনা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন অনেক ভুক্তভোগী আফগান। কারণ, নাম-ঠিকানা ফাঁস হয়ে যাওয়া এই আফগানরা তালেবানের প্রতিশেধের আশঙ্কায় আছেন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি পার্লামেন্টে বলেন, “এই তথ্য কখনোই ফাঁস হওয়ার কথা ছিলোনা।” তিনি জানান, আফগান রেসপন্স রুট এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যের অন্যান্য আশ্রয় কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যেই ৩৬ হাজারের বেশি আফগানকে দেশটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এত গোপনীয়তা কেন? এর কারণ হলো তথ্য ফাঁসের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের ভুল সবার সানে এসে পড়ে, যার মাশুল হিসেবে হাজার হাজার মানুষকে জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়েছে।
এত বড় কেলেঙ্কারির পর সরকারের চেষ্টা ছিল, সেসব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গোটা বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই সামনে এসেছে।
এই ফাঁস হওয়া তালিকায় ছিল নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, আত্মীয়স্বজনের স্পর্শকাতর তথ্যসহ নানা তথ্য। এখন তালেবান জানে, কারা ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ তুলে প্রকাশ্যে বা গোপনে তাদের শাস্তি দেওয়া হতে পারে।
যদিও ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, তালেবানের তরফ থেকে এখনো কোনো সংগঠিত প্রতিশোধের প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু ঝুঁকি রয়েই গেছে। বিশেষ করে যাদের নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি বা যাদের আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন, তাদের জন্য এই তথ্য ফাঁস হয়ে উঠেছে জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়।
এই ঘটনার শুরু হয় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তখন আফগানিস্তানে শুরু হয় তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ আর আফগান ভূমিতে ব্রিটিশ সেনা মোতায়েন করা হয়।
দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধ শেষে ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাজ্যের সেনা প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু ব্রিটেনের হয়ে কাজ করা হাজার হাজার আফগান সেই যুদ্ধের রেশ টেনে নিয়ে যান নিজেদের ঘাড়ে।
পড়ুন: প্রথম দেশ হিসেবে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিলো রাশিয়া
এস/


