ছেলেকে না পেয়ে ২৬ ঘণ্টা থানায় আটকে রাখা সেই বৃদ্ধ ভ্যানচালক বাবা ছাড়া পেলেও ভয়ে তিনি পাটের মাঠে পালিয়ে আছেন। ফিরছেন না বাড়ি। কথা বলছেন না পরিবারের কারো সাথে। কোন শর্তেই বা তার মুক্তি মিলল তাও জানেনা পরিবার।
এর আগে রোববার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শোমসপুর ইউনিয়নের ধুসুন্ড গ্রামের বাজার থেকে ছেলের বিরুদ্ধে প্রবাসীর টাকা আত্মসাতের অভিযোগ থাকায় ফজলু প্রামাণিক (৫৬) নামের ওই বৃদ্ধ ভ্যানচালককে থানায় নিয়ে আসেন উপপরিদর্শক (এসআই) তুষার।
অনেক দেন দরবারের পর সোমবার রাত সাড়ে ৯টায় থানার গারোদখানা থেকে বৃদ্ধ ভ্যানচালককে বাইরে আনা হয়। রাত ১১টার পর বৃদ্ধ নিজের বাড়ি ফেরেন। এরপর গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ঘরেই ছিলেন তিনি। আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা বাড়িতে ভিড় করতে থাকায় পাট ক্ষেতে কাজ করার অজুহাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান ফজলু। সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। অপর দিকে মালিকের হুন্ডির টাকা তছরুপের দায়ে অভিযুক্ত ছেলে সজল একমাস ধরে নিরুদ্দেশ রয়েছেন।
গতকাল দুপুরে ধুসুন্ড গ্রামে গিয়ে দেখা যায়,গ্রামের সবাই জানেন প্রবাসী আব্দুল গাফ্ফার টোকনের হুন্ডি ব্যবসার কথা।
কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, ভ্যান চালক ফজলু প্রামাণিকের ছেলে সজল ছিলো প্রবাসী ব্যবসায়ীর কয়েকজন ম্যানেজারের মধ্যে একজন। তার হাতে সবসময় তিন-চারটি মুঠোফোন থাকতো। চলা ফেরা ছিল ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর মতো। হঠাৎ কি ঘটলো সজলের বাড়িতে পুলিশ আসতে শুরু করলো। গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেলো সজল। এসব ঘটনা নিয়ে নানামুখি প্রশ্ন গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে।
ফজলু প্রামানিকের বাড়িতে গিয়ে তাকে না পেয়ে কথা হয় স্ত্রী তাসলিমা খাতুনের সাথে। তিনি জানান,থানা থেকে মুক্তি পেয়ে রাত ১১টার দিকে তার স্বামী বাড়ি ফিরেছেন। সারারাত এপাশ-ওপাশ করে কাটিয়েছেন। সকালে ঘর থেকে বাইরে বের হয়নি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে নিজ সমাজের লোকজন ও প্রতিবেশীরা বাড়িতে ভীড় করতে থাকায় কাঁচি-ঝুড়ি নিয়ে পাটের মাঠে বেড়িয়ে গেছেন। আর বাড়ি ফেরেনি।
কি শর্তে যে থানা পুলিশ তাকে ছেড়েছেন তাও জানতে পারিনি। তাছলিমা খাতুন তার নিরুদ্দেশ হওয়া একমাত্র সন্তানকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। এছাড়া স্বামীকে কোন অপরাধ ছাড়াই দীর্ঘ সময় থানায় আটকে রাখার বিচার চান তিনি। এ সময় ভাই রফিক ও ভাইয়ের স্ত্রী সুফিয়াসহ প্রতিবেশীরা কয়েক মাস ধরে তাদের পরিবারের উপর প্রবাসী আব্দুল গাফফার ও পুলিশের হুমকি-ধামকির বর্ণনা তুলে ধরেন।
ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, তার ভাতিজা (সজল) প্রায় ছয় বছর আগে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। এরজন্য বেতনের টাকা দেয়নি মালিক। বকেয়া বেতন চাওয়ায় এখন পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তারা এই পুলিশী নির্যাতনের বিচার চায়। এ বিষয়ে মালয়েশিয়া প্রবাসী আব্দুল গাফ্ফার টোকনের বাড়িতে গেলে তার মা শাহিদা বেগম মুঠোফোনে কথা বলিয়ে দেন।
ওই প্রবাসী জানান, তার ব্যবসার ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা সব সময় ম্যানেজার সজলের ফোনে ও ব্যাংক হিসাবে থাকতো। এ সবই তাদেররেমিট্যান্সের টাকা। এখানে হুন্ডির টাকা নেই। মালয়েশিয়ায় তাদের একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দুই দেশেই তাদের মুঠোফোনের ব্যবসা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, ম্যানেজার সজল তার প্রায় ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। তাই বাবা ইসলাম সরদারের মাধ্যমে থানায় অভিযোগ করেছেন।
খোকসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি)শেখ মঈনুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন,ছেলের টাকা আত্মসাতের সাথে বাবার কোন সম্পৃক্ততা আছে কিনা তা তদন্ত করার জন্য ফজলুকে থানায় আনা হয়েছিল। আমি সকালের দিকে থানার কাজে বাইরে থাকায় বিষয়টি নিয়ে বসতে পারিনি। স্থানীয় শরীফ নামে এক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় সোমবার রাতেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। এরপরেও ফজলুর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের সম্পৃক্ততা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পড়ুন: কুষ্টিয়ায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সাপের কামড়ে নারীসহ তিনজনের মৃত্যু
এস


