১১/০২/২০২৬, ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ
18 C
Dhaka
১১/০২/২০২৬, ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

থিয়েটার কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি : জেরিন কাশফি রুমা

মঞ্চ এবং টেলিভিশনের নিয়মিত অভিনেত্রী এবং নৃত্যশিল্পী জেরিন কাশফি রুমা। যিনি মঞ্চের বেগম সাহেবা তথা মহাতারেমা খ্যাত অভিনেত্রী। নিজ দলের অভিনয়, আমন্ত্রিত মঞ্চাভিনয়, নৃত্যের প্রস্তুতি, একক অভিনয়ের রিহার্সেল প্রভৃতি বিষয় নিয়ে নাগরিক টিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

প্রশ্ন : গেল ঈদে আপনার বেশ কয়েকটা নাটক প্রচারিত হয়েছে, কেমন সাড়া পেয়েছেন?

উত্তর : ঈদে আমার কয়েকটি নাটক প্রচারিত হয়েছে যেমন-সাত পর্বের ধারাবাহিক নাটক স্মার্ট বউ, ওই সুন্দরে আনন্দপুরে, সূর্যগ্রহণ। বেশ ভালো সাড়া পেয়েছি। এছাড়া লোভে পাপ পাপে প্যারা এবং ঘোমটা নাটকের শুটিং শেষ করেছি। খুব শীঘ্রই প্রচার হবে একটি প্রাইভেট চ্যানেলে।

প্রশ্ন : আপনার সাংস্কৃতিক জগতে আসার পেছনের কারণ কী?

উত্তর : খুব ছোটবেলা থেকেই আমি নৃত্যে তালিম নিয়েছি। নৃত্যের মাধ্যমেই আমার সাংস্কৃতিক জগতে আসা। শিশু একাডেমীতে আমি প্রথম গীতি নৃত্যনাট্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি, এরপর বিটিভির কিশোলয় অনুষ্ঠান, নিবেদন অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করি। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমি, মহিলা সমিতি, গার্লস গাইড হাউজ এই সকল মঞ্চে তো সবসময়ই নৃত্য পরিবেশন করতাম। এরপর যখন আনন্দ কালচারাল টিমে যোগদান করলাম তখন ঢাকায়, ঢাকার বাইরে, দেশের বাইরে নৃত্য পরিবেশন করেছি। এরপর শিবলী ভাই এবং নিপা আপার সাথে বেশ অনেকটা সময় শিল্পকলা একাডেমীর যে প্রোগ্রামগুলো হতো সেখানেও অংশগ্রহণ করেছি। তার মধ্যে নকশী কাঁথার মাঠ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া কথক নৃত্য সম্প্রদায় একাডেমির আমি একজন নিয়মিত এবং সিনিয়র নৃত্যশিল্পী। এই একাডেমী থেকেও আমি জাপানে ওয়ার্ল্ড মিউজিক এন্ড ডান্স ফেস্টিভ্যালে কথক নৃত্যে অংশগ্রহণ করেছিলাম। থাইল্যান্ডেও গিয়েছিলাম কথক নৃত্য নিয়ে। নৃত্যের মাঝামাঝি সময়ে আমি মঞ্চনাটকে যোগ দেই এবং সেখানেও সফলতা অর্জন করি। আমি বেশ অনেকগুলো পথনাটক এবং মঞ্চনাটক করেছি এবং এখনো মঞ্চনাটক করছি।

প্রশ্ন : আপনি তো মূলত একজন মঞ্চ অভিনেত্রী এবং অনেক পথনাটকও করেছেন। এ নিয়ে বলুন?

উত্তর : পথনাটক দিয়ে আমার নাটকের পথচলা শুরু। পথনাটক এবং মঞ্চনাটক মিলে ২০টির মতো হবে। মঞ্চ নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আসমান তারা শাড়ি, বাবা তারতুফ, বাজিমাত, একাত্তরের ক্ষুদিরাম, শেষ সংলাপ, যযাতি ইত্যাদি।

প্রশ্ন : মঞ্চনাটক নিয়ে আপনার ভালো কোন স্মৃতি বা সুখকর কোন স্মৃতি যদি একটু বলেন!

উত্তর : মঞ্চনাটক নিয়ে আমার প্রত্যেকটা স্মৃতি খুবই মধুর, সুখকর এবং আনন্দের। মঞ্চে নাটক শুরুর আগে এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময়টা আমার শ্রেষ্ঠ সময়। যেদিন আমার মঞ্চে অভিনয় থাকে সেই দিনটা আমার কাছে অনেক বড় একটা উৎসব মনে হয় এবং এই উৎসবটা খুব সুন্দর এবং সফলভাবে সমাপ্ত করতে হবে এটা নিয়েই আমি সকাল থেকে নাটক শেষ হওয়া পর্যন্ত বিভোর থাকি। আর এ জন্যই এ যাবৎকাল আমি যত মঞ্চনাটক করেছি আমার কারণে একটি নাটকেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েনি বরং সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

প্রশ্ন : আপনাকে মঞ্চের বেগম সাহেবা বা মহাতারেমা বলা হয় কেন?

উত্তর : মিশরীয় নাট্যকার তোফিক আল হাকিমের সুলতানুজ জান্নাম নাটক অবলম্বনে শেষ সংলাপ নাটকটি অনুবাদ করেছেন শ্রদ্ধেয় সৈয়দ জামিল আহমেদ এবং ম সাইফুল আলম এবং নির্দেশনা দিয়েছেন আকতারুজ্জামান। এই নাটকটিতে যে চরিত্রটি আমি অভিনয় করি সেখানে আমাকে সুলতান মহাতারেমা বলে সম্বোধন করেন এবং অন্যান্য ক্যারেক্টার আমাকে বেগম সাহেবা বলে সম্বোধন করেন। এই শেষ সংলাপ নাটকের কারণেই আমি মাহাতারেমা খ্যাত বা বেগম সাহেবা হয়ে গিয়েছি। এই নাটকে একটিমাত্র নারী চরিত্র !! এই চরিত্রটি একটি মহীয়সী নারী চরিত্র যিনি লাভক্ষতি বোঝেন, তর্ক যুক্তি দিয়ে খন্ডন করতে পারেন, আইন বোঝেন, পাশাপাশি তিনি শিল্পানুরাগী, ত্যাগী-পরোপকারী, নিঃস্বার্থপর এবং দেশপ্রেমী। এই চরিত্রটির সাথে আমি এমনভাবে নিজেকে মিশিয়ে একাকার হয়েছি যে মঞ্চে এই নাটকটি আমাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। আমি এই নাটকের নির্দেশক এবং আমার দলের সকল সহকর্মী, সদস্যদের কাছে কৃতজ্ঞ।

প্রশ্ন : নৃত্য পরিবেশন করার জন্য আপনি বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন, তো সেখানকার কোন স্মৃতি যেটা সবসময় আপনার ভালো লাগে বা এখনো মনে পড়ে একটু বলেন।

উত্তর : নৃত্য করার জন্য আমি বিভিন্ন দেশে গিয়েছি যেমন- জার্মানি, জাপান, থাইল্যান্ড, ইন্ডিয়া। খুবই সুন্দর, মধুর এবং মজার স্মৃতি আছে। একটা মজার স্মৃতি বলি, জার্মানিতে আমরা নাচের প্রোগ্রাম করার জন্য নাচের পুরো কস্টিউম, মেকআপ, প্রফস মোটকথা পরিপূর্ণ সাজে যেখানে আমাদের প্রোগ্রাম সেখানকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম। পথের মাঝে আমাদের আনন্দ কালচারাল টিমের অর্গানাইজার ফাদার ক্লাউস বললেন, তোমরা এখানে দাঁড়াও আমি কিছু খাবার নিয়ে আসি, কারণ আমরা খুব সকালে বের হয়েছিলাম। যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে একটা ফোয়ারা ছিল সেখানে আমরা সবাই বসেছিলাম। দুই এক মিনিটের মধ্যেই দেখলাম ধীরে ধীরে ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০ বা তারও বেশি লোক জড়ো হয়ে গিয়েছে। আমাদের সামনে বেশ অনেকটা জায়গা ছেড়ে তারা নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি, ফাদার ক্লাউজ আসলেন খাবার হাতে। যা বোঝার উনি বুঝে ফেললেন এবং বললেন এদেরকে নিরাশ করা ঠিক হবে না একটা নাচ পরিবেশন করে দাও। গানের টিম গান গাইলেন সাথে মিউজিশিয়ান তো ছিলই এবং আমরা নাচলাম। আমাদের পরিবেশনা দেখে সবাই খুব মুগ্ধ! তালি তো থামছেই না! তালি না থামার কারণ আরেকটা নাচ দেখানো কিন্তু ফাদার ক্লাউস অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন আমাদের আরেকটা প্রোগ্রাম আছে সেখানে যেতে হবে। দেরি হলে আমরা ট্রেন (পাতাল রেল) মিস করবো! তারপর যারা দর্শক ছিলেন তারা সবাই আমাদের এক সিনিয়র ভাইয়ার হাতে কয়েন দিতে থাকলো, উনার দু হাত ভরে কয়েন নিচে পড়ে যাচ্ছিল। উনি মজা করে বলছিলেন ওরে আমরা তো আজকে মালামাল হয়ে গেলাম! কি দরকার স্টেজ প্রোগ্রাম করা! রাস্তায় রাস্তায় নাচলেই তো মালামাল! এরপর এই ঘটনা নিয়ে আমরা যে কত হাসলাম। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি !

বিজ্ঞাপন


প্রশ্ন : মঞ্চনাটকে আসার ব্যাপারে মূল অনুপ্রেরণা কে ?

উত্তর : মঞ্চ নাটকের ব্যাপারে আমাকে কেউ কখনো অনুপ্রেরণা দেয়নি বা আমারও কখনো ইচ্ছে ছিল না মঞ্চনাটক করব। কাকতালীয়ভাবেই ৪০ দিনের একটা ওয়ার্কশপের মাধ্যমে “সময় সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীতে” যোগদান করা এরপর আর থেমে থাকিনি। তবে হ্যাঁ মঞ্চে নাটক শুরু করার পরে সবাই আমাকে সাপোর্ট করেছে উৎসাহ দিয়েছে বিশেষ করে আমার পরিবারের সবাই এবং সকল আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, দলের সহকর্মী এবং বড় ভাইয়ারা। সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ !

প্রশ্ন : আপনিতো বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন অভিনয়ের জন্য…

উত্তর : এই বছরের প্রথম দিকে আমি যে অ্যাওয়ার্ডটা পেয়েছিলাম সেটা ছিল নিউইয়র্ক ঢালিউড ফিল্ম এন্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড! সেই সময় আমার ছেলে আমার সাথে ছিল! নাচ, গান, অভিনয় ছাড়াও আরো অন্যান্য ক্যাটাগরিতে পুরস্কার ছিল। পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন নায়ক অপূর্ব, অমিত হাসান, নায়িকা দিঘী, ইমন আরো অনেকে। নায়ক অপূর্ব বেস্ট এক্টর অ্যাওয়ার্ড নেওয়ার সময় আমার ছেলে আমাকে ফিসফিস করে বলছিল অপূর্ব যদি তোমাকে অ্যাওয়ার্ড দিত তাহলে আমি খুব খুশি হতাম! কারণ অভিনেতা অপূর্ব তার খুব পছন্দের। এটা সম্ভব যদি আগে থেকে বলা থাকে। কিন্তু ওই মুহূর্তে আমার বলা সম্ভব ছিল না। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, অভিনেতা অপূর্বর হাত দিয়েই আমাকে এওয়ার্ড দেওয়া হয়েছিল! এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছিল আমার জানা নেই, তবে আমার মনে হয় আমার ছেলের মনের আশাটা ভাইব্রেশনের মাধ্যমে অর্গানাইজারদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আমার ছেলে খুব খুশি হয়েছিল কিন্তু আমি খুব অবাক হয়েছি সেই সাথে আমার ছেলের আনন্দ দেখে অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার চেয়েও বেশি আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন।

প্রশ্ন : মঞ্চনাটক, পথনাটক, টিভিনাটক তো অনেক হলো, আপনার কি চলচ্চিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছা আছে?

উত্তর : যেহেতু আমি অভিনয় খুব ভালোবাসি সেটা মঞ্চেই হোক ছোট পর্দায় হোক বা বড় পর্দায়, আমি সব মাধ্যমেই কাজ করতে ইচ্ছুক। আমি চলচ্চিত্র এখনো অভিনয় করিনি! চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সুযোগ আমার আছে তবে সময়, পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এবং গল্প পছন্দ হলে অবশ্যই চলচ্চিত্রে অভিনয় করবো।

প্রশ্ন : আপনি তো খুব শীঘ্রই মঞ্চে একক অভিনয় করতে যাচ্ছেন যার নাম মাই নেম ইজ গহর জান ( My name is Gohor Jan)? নাটকটি আমরা কবে নাগাদ মঞ্চে দেখতে পারব?

উত্তর : আমার তো ইচ্ছা আজকেই করে ফেলি কিন্তু কিছু প্রস্তুতি আছে তাই একটু সময় লাগছে। সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আশা করছি আগামী বছরের প্রথম দিকে মঞ্চস্থ করতে পারবো।

প্রশ্ন : আপনি তো টেলিভিশনে এখন নিয়মিত নাটক করে যাচ্ছেন এবং সামনে আপনার অনেক কাজ আছে তাই না? মঞ্চ ছেড়ে টিভি মিডিয়াতে কি নিয়মিত হওয়ার ইচ্ছা আছে?

উত্তর : মঞ্চ আমি ছাড়েনি, কখনো ছাড়বোও না। মঞ্চে আমার কাজ চলমান, সেটা হোক মঞ্চনাটক বা নৃত্য পরিবেশনা। সম্প্রতি আমি শৌখিন থিয়েটারের আমন্ত্রণে “অন্তরালের আয়না” নাটকে অভিনয় করেছি এবং প্রশংসাও পেয়েছি। ডিসেম্বরের ২৩, ২৪, ২৫ তারিখ “কথক নৃত্য সম্প্রদায়” এর তিন দিনব্যাপী নৃত্য উৎসব উদযাপিত হবে সেখানেও আমি নৃত্য পরিবেশন করব। তবে হ্যাঁ মঞ্চের পাশাপাশি আমি এখন টিভি মিডিয়াতে কাজ করছি। মিডিয়াতে আমি আগেও অনেক কাজ করেছি। বর্তমানে মিডিয়াতে কাজ করার ব্যাপারে আমার ছেলে আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে এবং করছে। আমার ছেলের দৃষ্টিতে আমি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী! তবে আমি আমার নিজেকে থিয়েটার কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

পড়ুন : চরিত্রটি আমার কাছে নিছক অভিনয় নয়, এক ধরণের আত্মদর্শন : এরশাদ হাসান

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন