বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে দেশে দারিদ্র্যে ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার বেড়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ২৪ মার্চ, সোমবার, বিআইডিএসের নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। জরিপে দেখা গেছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তুলনায় ২০২৪ সালে দারিদ্র্য এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিআইডিএসের গবেষণায় দারিদ্র্য হার ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৩ দশমিক ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও বিআইডিএস বলছে, তাদের জরিপটি জাতীয় পর্যায়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণের জন্য নয়, তবে এতে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। জরিপটি ঢাকা, বান্দরবান, খুলনা, রংপুর ও সিলেট জেলার ৩ হাজার ১৫০টি পরিবারের ওপর পরিচালিত হয় এবং এই তথ্য বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এর সহায়তায় সংগৃহীত।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, শহর ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। ঢাকা, খুলনা, সিলেট, রংপুর এবং বান্দরবানে দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ১০ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং বান্দরবানে ২৫ শতাংশ থেকে ২৪ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে।
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২২ সালে যেখানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল ৩৮ দশমিক ০৮ শতাংশ মানুষ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক সেমিনারে বলেন, “এই জরিপটি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।” জরিপের প্রধান গবেষক এবং বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, “রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং মূল্যস্ফীতি দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “জরিপে উঠে এসেছে যে, দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি এখন আগের চেয়ে খারাপ।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য টেকসই নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। তাঁরা আরও বলেছেন, “সরকারের উচিত প্রাথমিকভাবে দারিদ্র্য কমানোর জন্য একটি যুগোপযোগী এবং সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ করা, যা দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থা উন্নত করবে।”

এছাড়া, বাংলাদেশের দারিদ্র্যে হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিক সংকট যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব
এবং আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং স্থানীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি বেশ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে এই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে, বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনূস জানান, “এটি আমাদের দেশের বাস্তব চিত্র এবং ভবিষ্যতে নীতিগত পরিবর্তন বা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এই জরিপের তথ্য সহায়ক হতে পারে।” তিনি আরও জানান, ২০২২ ও ২০২৪ সালের তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের দারিদ্র্য এবং বৈষম্য পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে ঢাকায় দারিদ্র্য হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডব্লিউএফপির অফিসার ইনচার্জ সিসেমানি পারসেসমেন্ট সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, “এই জরিপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সরকারের নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে। এটি বিবিএসের জরিপের সঙ্গে তুলনা করা না হলেও, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে সহায়ক।”
এ জরিপের মাধ্যমে সরকারের সামনে নতুন একটি দারিদ্র্যে বাস্তবতা এসেছে, যা থেকে তারা দারিদ্র্যে কমানোর জন্য অধিক কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী যে, এ ধরনের জরিপের ফলাফলে সরকারের নীতিনির্ধারণে আরও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে দেশের দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা হ্রাসে সহায়ক হবে।
পড়ুন: লিবিয়ায় ২৯ অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার
দেখুন:প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঘর চাইল নিস্পাপ শিশু ও তার পরিবার
ইম/


