বাংলাদেশ হকির বর্তমান সময়টা যেন একসঙ্গে দুই ধরনের গল্প বহন করছে—একদিকে দল গঠনের নতুন হিসাব, অন্যদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একজন খেলোয়াড়ের স্বপ্নপূরণ। সেই দুই গল্পের মাঝখানে উঠে এসেছে খালেদ মাহমুদ রাকিনের নাম; যিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের দরজায় কড়া নেড়েও বারবার ফিরে গেছেন, অবশেষে জায়গা করে নিয়েছেন এশিয়ান গেমস বাছাইয়ের ১৮ সদস্যের চূড়ান্ত দলে।
বাংলাদেশের হকিতে পরিবারগত উত্তরাধিকার খুব বেশি দেখা যায় না, কিন্তু রাকিনের গল্পটি আলাদা। তার বড় ভাই রাসেল মাহমুদ জিমি দেশের হকির অন্যতম সফল নাম। দুই দশক জাতীয় দলে খেলেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, অসংখ্য আন্তর্জাতিক ম্যাচে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সেই পরিবারের ছোট ছেলে রাকিনের পথটা অবশ্য ছিল অনেক বেশি কঠিন।
২০১৫ সালে বিকেএসপিতে পড়ার সময় প্রথম জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পান রাকিন। তখন দলে ছিলেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডাররা; জায়গা পাওয়া ছিল কঠিন। এরপর বছরের পর বছর ক্যাম্পে থেকেও চূড়ান্ত স্কোয়াডে নাম ওঠেনি। কখনো সিনিয়রদের উপস্থিতি, কখনো নিজের পারফরম্যান্স—প্রতিবারই শেষ ধাপে এসে থেমে গেছে স্বপ্ন।
এই দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে এবার নাম এসেছে ১৮ জনের তালিকায়। তালিকা প্রকাশের পর রাকিনের প্রথম অনুভূতিতে ফিরে এসেছে পরিবার, বিশেষ করে প্রয়াত বাবা আব্দুর রাজ্জাক সোনা মিয়ার স্মৃতি। সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে তিনিই দুই ছেলেকে হকির পথে এনেছিলেন। এখন জাতীয় দলের জার্সিতে দুই ভাইয়ের নাম—যদিও একই সময়ে মাঠে নামার সুযোগ এখনও অধরা।
রাকিনের ক্যারিয়ার শুধু অপেক্ষার নয়, ধারাবাহিক পরিশ্রমেরও। বয়সভিত্তিক দলে নিয়মিত ছিলেন, ২০১৪ সালে ইয়ুথ অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের হয়ে ফাইভ-এ-সাইড হকি খেলেছেন। পরে অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-২১ দলে জায়গা ধরে রাখেন। ক্লাব পর্যায়ে মোহামেডানের হয়ে সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে ধারাবাহিক খেলেছেন।
তার জাতীয় দলে ফেরা এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের হকি দলও নতুন ভারসাম্য খুঁজছে। অভিজ্ঞতা ও তরুণ শক্তির মিশেলে দল সাজানো হয়েছে। প্রধান কোচ আশিকুজ্জামান এবার কয়েকজন নতুন মুখকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অনূর্ধ্ব-২১ দলের অধিনায়ক সামিন, গোলরক্ষক সাদ—তাদের সঙ্গে রাকিনও পেয়েছেন মূল স্কোয়াডে জায়গা।
দলের নেতৃত্বে এবার আছেন ফজলে হোসনে রাব্বি, সহ-অধিনায়ক গোলরক্ষক বিপ্লব কুজুর। অভিজ্ঞ পুষ্কর ক্ষিসা মিমোকেও ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে আলোচনায় রয়েছেন জিমিও। এখনও ফিটনেস ও ফর্ম ধরে রাখলেও জাতীয় দলের বাইরে আছেন তিনি। অনেকের মতে, বাংলাদেশের হকির পরিবর্তনশীল সময়ে এটি এক ধরনের প্রজন্মান্তরের সংকেত।
এশিয়ান গেমস বাছাইয়ের টুর্নামেন্ট হওয়ার কথা ছিল Oman-এ, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় ভেন্যু সরিয়ে নেওয়া হয়েছে Thailand-এ। ৩১ মার্চ দলের রওনা হওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এখনও ভিসা প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
বাংলাদেশ হকির জন্য এই টুর্নামেন্ট শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়—এটি পুনর্গঠনের পরীক্ষা। আর রাকিনের জন্য, এটি প্রমাণের মঞ্চ—দীর্ঘদিনের বাদ পড়ার বৃত্ত ভেঙে তিনি এখন সত্যিই জাতীয় দলের অংশ।
একসময় বড় ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ার স্বপ্ন ছিল। এবার অন্তত সেই স্বপ্নের অর্ধেক পূরণ হচ্ছে। বাকিটা হয়তো এখনও সময়ের কাছে জমা আছে।
পড়ুন : ভিয়েতনামের কাছে ৩ গোলে হার, দ্বিতীয়ার্ধে রক্ষণে কিছুটা স্বস্তি বাংলাদেশের


