বাংলার নদীসমূহ শুধু পানি বহন করে না; তারা ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনচক্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এমনই একটি নদী হলো তিতাস। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হওয়া তিতাস নদী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৮ কিলোমিটার। একসময় নদীটি কৃষি, জীবনযাত্রা, পরিবেশ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু আজ অবৈধ দখল, দূষণ এবং প্রশাসনিক অবহেলার কারণে নদীটি বিলীন হওয়ার পথে।
উৎপত্তি ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি
তিতাস নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপত্তি লাভ করে। পাহাড় থেকে স্রোত নিয়ে নদীটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া সীমান্তে প্রবেশ করে। নদীর প্রস্থ একসময় এক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যা বর্ষা মৌসুমে আরও প্রশস্ত হতো। গভীরতা এবং প্রবাহের তীব্রতা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখত।
বর্তমানে নদীর প্রস্থ অনেকাংশে কমে কয়েকশ মিটারে নেমে এসেছে। শুকনো মৌসুমে নদীর অনেক অংশে পানি থাকে না, বর্ষা মৌসুমেও আগের মতো স্রোতধারা চোখে পড়ে না। নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতবাড়ি, দোকানপাট, ইটভাটা ও ছোট শিল্পকারখানা। এসব দখলের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং নদী হারানোর আশঙ্কা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
তিতাস নদী শুধু জলবাহিত জীবন নয়, এটি সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামীণ কৃষকরা নদীর পানি ব্যবহার করে সেচ দিয়েছে। নদীর তীরে জেলে সম্প্রদায় তাদের জীবিকা নির্বাহ করত। নদী ওষুধি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তিতাস নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিখ্যাত লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ তার উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম-এ নদীকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জীবনের হৃদয়স্পর্শী চিত্র অঙ্কন করেছেন। নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ, মাছ ধরার জীবন এবং স্থানীয় মানুষের আবেগচিন্তা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। নদীকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোও বাংলা সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে সমাদৃত।
দখল ও দূষণ
বর্তমানে তিতাস নদী দখল ও দূষণের শিকার। নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। নদীর বুক ভরাট করে বাড়ি, দোকানপাট, ইটভাটা ও ছোট শিল্পকারখানা নির্মাণ করা হচ্ছে। নদীর খাল-খন্দকও ভরাট হওয়ায় বর্ষায় পানি সঠিকভাবে নামছে না, জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
দখলের পাশাপাশি দূষণও বড় সমস্যা। নদীতে ধ্বংসাত্মকভাবে প্রবাহিত হচ্ছে শিল্পকর্ম ও আবর্জনা, প্লাস্টিক এবং পয়ঃনিষ্কাশন। ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা শহর থেকেও কালন্দী খালের মাধ্যমে বর্জ্য নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে পানি দূষিত হচ্ছে, গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এবং নদীর প্রাকৃতিক জীবন বিপন্ন হচ্ছে। একসময় ভরা মাছের ভান্ডার নদী আজ প্রজাতি সংকটে।
পরিবেশগত প্রভাব
তিতাস নদী পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর তীরের সবুজ গাছপালা, পাখি ও জলজ প্রাণী নদীর সঙ্গে মিলিতভাবে বসবাস করত। নদী দূষিত ও দখলের কারণে এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর পানি দূষিত হওয়ায় স্থানীয় জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হচ্ছে। মাছের প্রজাতি কমছে, নদীর তীরের গাছপালা মারা যাচ্ছে, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর বাসস্থান হ্রাস পাচ্ছে। কৃষিজ উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জেলে ও কৃষকরা নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না, ফলে তাদের জীবনযাত্রা প্রভাবিত হচ্ছে।
স্থানীয় জনগণ ও বিশেষজ্ঞ মতামত
স্থানীয়রা জানান, তিতাসকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রশাসন কিছু অভিযান চালালেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে টেকসই ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত নদী রক্ষা সম্ভব নয়।
পরিবেশবিদরা বলেন, তিতাস নদী বাঁচাতে হলে প্রথমে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। নদীর খনন ও নাব্যতা পুনঃস্থাপন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
করণীয় পদক্ষেপ
অবিলম্বে অবৈধ দখল উচ্ছেদ: নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণ: নদীতে কোনো প্রকার দূষণ প্রবাহিত না হতে প্রতিনিয়ত নজরদারি।
নদীর খনন ও নাব্যতা পুনঃস্থাপন: নদীর গভীরতা ও প্রাকৃতিক স্রোত পুনরায় নিশ্চিত করা।
নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ ও সবুজ বেষ্টনী নির্মাণ: প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা: নদী রক্ষা আন্দোলনে জনগণকে প্রেরণা ও ভূমিকা দেওয়া।
সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইন প্রয়োগ: নদী সংরক্ষণে প্রশাসন ও আইনকানুন কার্যকরভাবে প্রয়োগ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি এখনই পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল বইয়ের পাতাতেই তিতাস নদীকে খুঁজে পাবে।
প্রশাসনিক অবস্থা ও উদ্যোগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিটি উপজেলার উপর তিতাস নদী প্রভাব ফেলেছে। তরী বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নদী ও নদীর শাখা-প্রশাখা খাল সমূহের অবৈধ দখলকারীদের তালিকা তৈরি করেছে। কিন্তু দখলদাররা প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত হওয়ায় এখন পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়নি। অপরদিকে শহরের সকল ময়লা-আবর্জনা সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে দূষণ বাড়ছে।
তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলাকে স্পর্শ করেছে তিতাস নদী এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রধান নদী। তরী বাংলাদেশ এর আন্দোলনের ফলে নদী ও নদীর শাখা-প্রশাখা খাল সমূহের অবৈধ দখলদারদের তালিকা হলেও দখলদারেরা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ও প্রভাবশালী হওয়ায় উচ্ছেদে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অপরদিকে শহরের সকল ময়লা-আবর্জনা সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে নদী দূষণ হচ্ছে অন্যদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার সকল বর্জ্য কালন্দী খালের মাধ্যমে তিতাস নদীকে দূষিত করছে। এর ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য আজ অস্তিত্ব সংকটে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও আশানুরূপ ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
তরী বাংলাদেশ আশা করে সরকার প্রতি জেলায় একটি করে নদী দখল-দূষণ মুক্ত করার যে ঘোষণা দিয়েছে তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জেলার প্রধান নদী হিসাবে তিতাস নদীকে দখল-দূষণ মুক্ত করে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন।
উপসংহার
তিতাস নদী কেবল পানি বহন করে না; এটি বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দখল ও দূষণের কারণে নদী বিলীন হওয়ার পথে। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া নদী হারালে পরিবেশ, জীবন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিতাস বাঁচলে বাঁচবে পরিবেশ, জীবন ও সংস্কৃতি। এখনই সময়—স্থানীয় জনগণ, সরকার ও পরিবেশবাদীদের সম্মিলিত উদ্যোগে তিতাস নদীকে রক্ষা করতে। নদী বাঁচলেই বাংলার ইতিহাসের অমরতা, সাহিত্য ও জীবনচক্রও বাঁচবে।
দেখুন: পঞ্চগড়ে যৌথ রিট্রিট প্যারেড করেছে বিজিবি-বিএসএফ
ইম/


