“এই দেশে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু বলে কাউকে আমরা আখ্যায়িত করতে চাই না। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই সমান অধিকার ভোগ করব। এক মানবের যেমন দুই হাত, তেমনি আমাদের এক হাত হিন্দু, আরেক হাত মুসলমান”- ‘বারইপাড়া সার্বজনীন পঞ্চাঙ্গ মন্দির’ উদ্বোধনকালে ঠিক এভাবেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও সম্প্রীতির বার্তা দিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
শনিবার (৪ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নে নবনির্মিত ওই মন্দিরের শুভ উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় তিনি দুর্গাপুরবাসীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘোচাতে চারটি নতুন সেতু নির্মাণ এবং এলাকাটিকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার বড় ঘোষণাও দেন।
মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশের সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “প্রতিটি ধর্ম মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। আমি সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আশ্বস্ত করতে চাই- আপনারা নিঃসঙ্কোচে, নির্ভয়ে পূর্ণ স্বাধীনতার সাথে আপনাদের ধর্মকর্ম পালন করবেন। একইভাবে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরাও স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করবেন।”
তিনি আরও বলেন, “মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে মুসলমানদের শুধু নিজেদের ধর্ম পালন করলেই হবে না, অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও সব ধরনের সহযোগিতা করতে হবে। ইসলাম ধর্মেও সেটাই বলা আছে।”
মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধ করেছি বা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করেছি, তখন কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে খ্রিস্টান- তা বিবেচনা করে অংশগ্রহণ করিনি। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি। দুর্গাপুর এলাকার হিন্দু, মুসলিম, গারো, হাজং খ্রিষ্টান- সবাই মিলেমিশে এক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করে, যা আমাদের বড় অর্জন।”
বিগত ১৫-২০ বছর ধরে দুর্গাপুর এলাকার মানুষ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ছিল উল্লেখ করে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি জানান, আগামী ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের একনেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ওই বৈঠকে দুর্গাপুরের উন্নয়নের জন্য বড় প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, “আপনারা আশীর্বাদ করবেন আমাদের প্রজেক্টটি পাস হয়। প্রজেক্টটি পাস হলে সোমেশ্বরী নদীর ওপর দুইটি, লেংগুরা নদীর ওপর একটি এবং মহাদেব নদীর (রনখাঁটি) ওপর একটি- এই চারটি ব্রিজ নির্মিত হবে। এই ব্রিজগুলো দৃশ্যমান হলে এলাকার ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমজীবী মানুষ খুব সহজেই যাতায়াত করতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্গাপুর এলাকাটিকে একটি ‘পর্যটন নগরী’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।”
ডেপুটি স্পিকার তার বক্তব্যে সামাজিক অবক্ষয় রোধে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বেশি সেখানে পুরোহিতভিত্তিক, যেখানে মুসলমান বেশি সেখানে মসজিদভিত্তিক এবং যেখানে খ্রিস্টান বেশি সেখানে গির্জাভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা হবে। প্রতিটি ধর্মের যে নিজস্ব মূল্যবোধ আছে, সেই মূল্যবোধের আলোকেই সমাজ পরিচালিত হতে হবে।”
অনুষ্ঠানের শুরুতে নামফলক উন্মোচন করে মন্দিরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। বারইপাড়া সার্বজনীন পঞ্চাঙ্গ মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা শ্রী সন্তোষ দেবনাথ। এছাড়া জমি ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন লাকি দেবনাথ এবং ভূমিদাতা বাসন্তী সরকার, সুজন সরকার ও সঞ্জয় সরকার।
অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পিকার মন্দিরটির উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতাদের সামনে ডেকে এনে তাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের ইউএনও আফসানা আফরোজ, থানার ওসি কামরুল হাসান, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুধীজন এবং বিপুল সংখ্যক সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ ও শিশু উপস্থিত ছিলেন।
পড়ুন : কলমাকান্দায় ডেপুটি স্পিকারের বাবা কামাল মনসুরের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত


