চটকদার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মাধ্যমে ঢাকার ধামরাইয়ে পরিচালিত হচ্ছে পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতাল। নামের মিলের কারণে অনেকেই এটিকে দেশের স্বনামধন্য পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেডের শাখা ভেবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়াও সিজারিয়ান ও অন্যান্য অস্ত্রোপচারের পর ক্ষতস্থানে পচন, মারাত্মক ইনফেকশন এবং পরে যক্ষার মতো জটিল সংক্রমণ দেখা দিয়েছে প্রায় অর্ধশতাধীক রোগীর মাঝে। এসব ভুক্তভোগীদের দাবি, হাসপাতালটির ওটি-তে পর্যাপ্ত স্টেরিলাইজেশনের অভাব, দায়িত্বহীন সার্জিক্যাল টিম ও প্রশাসনিক গাফিলতির কারণেই এসব ঘটনা ঘটেছে। এতে ভুক্তভোগী নারীদের ছয় মাসে শরীরের একই স্থানে দুই থেকে তিনবার অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। ফলে নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বেড়েছে তেমনি চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ। অনেকেই সব হাড়িয়ে নিজের শেষ সম্বল গরু, জমি বিক্রি করে যোগিয়েছেন চিকিৎসার ব্যয়।
বিষয়টি নজরে এলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিঠি দেন ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলোজি ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চে (আইইডিসিআর)। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন স্টাফ ও আইইডিসিআর
আসা কয়েকজন মিলে তদন্ত শুরু করেন। তদন্তে এর সত্যতা মিললেও এমন ভয়ংকর চিকিৎসা বিভীষিকার ঘটনায় হাসপাতালটির বিরুদ্ধে এখনো কোন আইনি পদক্ষেপ বা ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। নাগরিক টেলিভিশনের প্রায় এক মাসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ঢাকার ধামরাইয়ের কালামপুর এলাকার পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালের এমন ভয়াবহ চিকিৎসা ব্যবস্থা।
নাগরিক টেলিভিশন-এর এই প্রতিনিধির কাছে একাধিক সূত্রে তথ্য আসে যে, ধামরাইয়ের কালামপুরে অবস্থিত পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে সিজারিয়ান ও অন্যান্য অস্ত্রোপচারের পর কয়েকজন রোগী যক্ষায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এই তথ্যের সূত্র ধরে গত ১৮ নভেম্বর ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করা হলে কর্তৃপক্ষ জানায়, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে পারবেন মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. আকিব হোসেন। পরে ডা. আকিব হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটিতে আছেন জানিয়ে এক দিন পর ফোন করতে বলেন।
এর একদিন পর ২০ নভেম্বর পুনরায় ফোন করা হলে তিনি বিভিন্ন ব্যস্ততার কথা বলে আরও এক দিন পর যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে আরো এক দিন পর, শনিবার (২২ নভেম্বর) তাকে আবার ফোন করে জানানো হয় যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপস্থিত আছি। তখন তিনি আর কোনো অজুহাত না দিয়ে বলেন, “আপনি স্যারের রুমে যান, আমি আসছি।
পরবর্তীতে এবিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মঞ্জুর আল মোর্শেদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সিজারিয়ান ও অন্যান্য অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণে আক্রান্ত একাধিক রোগী তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসে। এসব রোগীর সবাই ধামরাইয়ের পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন।
তিনি আরও জানান, এই হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হয়েছে এমন ৪০১ জন রোগীর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টাফ ও আইইডিসিআর এর কর্মকর্তারা মিলে তদন্ত করলে আট জনের শরীরে যক্ষার সংক্রমণ পাওয়া যায়। এসব ভুক্তভোগী রোগীদের নাম-পরিচয় জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, রোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের তদন্তে আটজন ভুক্তভোগী রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অন্যদিকে হাসপাতালটির পরিচালক রাশেদুল ইসলাম রফিকের দাবি, এ ধরনের আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বিশ জন বা তারও বেশি হতে পারে।
দুজনের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে সঠিক তদন্ত আদৌ হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার পরও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগী রোগীদের তথ্য পেতে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১১০ নম্বর কক্ষের যক্ষা ও কুষ্ঠ ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি এক সপ্তাহ ঘোরানোর পর রোগীদের কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, তথ্য দিতে স্যারের নিষেধ আছে। ব্র্যাকের যক্ষা সেন্টার থেকে রোগীদের নিয়মিত যক্ষার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে এবং সেখানে গেলে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। পরবর্তীতে ব্র্যাকের যক্ষা সেন্টারে কয়েক দিন যোগাযোগ করা হলেও কোনো রোগীর নাম বা পরিচয় পাওয়া যায়নি।
এরপর দীর্ঘ অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ‘ঈশিতা’ নামে এক রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি ধামরাই উপজেলার সানোড়া ইউনিয়নের বাইচাল এলাকায় তার বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন।
পরে সেখানে গিয়ে ঈশিতা ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৮ মে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ১৮ বছর বয়সী ঈশিতা আক্তার কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। অস্ত্রোপচারের ১০ থেকে ১৫ দিন পর ঈশিতার সেলাইয়ের ক্ষতস্থানে ফোলা, তীব্র ব্যথা ও পচনসহ অস্বাভাবিক জটিলতা দেখা দেয়। পুনরায় ওই হাসপাতালে গেলে ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করা হয় এবং আবারো অস্ত্রোপচার করা হয় । তবে এরপরও তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তিনি ধামরাই ও সাভারের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও ক্ষতস্থানের কোনো উন্নতি হয়নি। পরবর্তীতে প্রায় তিন মাস পর, গত ২৩ আগস্ট ঈশিতার যক্ষার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা ও একাধিকবার অস্ত্রোপচারের কারণে তার চিকিৎসা ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা।
ঈশিতা আক্তারের চাচা আব্দুর সাত্তার নাগরিক টেলিভিশন কে বলেন, “ওই হাসপাতালে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়া এক নারীর যক্ষা ছিল। এরপর দুই-তিন মাসের মধ্যে সেখানে যাদের সিজারিয়ান করা হয়েছে, তাদের সবার মধ্যেই একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমার ভাতিজী ঈশিতার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে, তবুও সে এখনো সুস্থ হয়নি। দুই দিন পরপর ড্রেসিং করতে হয় এবং নিয়মিত যক্ষার ওষুধ খেতে হচ্ছে। ড্রেসিংয়ের যন্ত্রণা যে কতটা কষ্টের, তা ভুক্তভোগীরাই ভালো বুঝে।
আব্দুর সাত্তার আরো বলেন যে, তাদের বাড়ির পাশেই তার ভাতিজীর মতো সুমি নামে আরেকজন এমন ভুক্তভোগী আছে, তার অবস্থা আরো আশঙ্কাজনক। আব্দুস সাত্তারের তথ্য মতে একই এলাকায় সুমির বাবার বাড়িতে গিয়ে জানা যায় যে, সুমির অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপালে ভর্তি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ওই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন আছে সুমি।
পরদিন মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সুমি আক্তার হাসপাতালের একটি বেডে শুয়ে আছেন। পাশে তার নবজাতক কন্যাকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন সুমির ভাবি।
সুমির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১৩ এপ্রিল ধামরাইয়ের কালামপুরের পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। তবে অস্ত্রোপচারের ৩২ দিন পর তার অপারেশনের সেলাইয়ের স্থানে ফোলা, তীব্র ব্যথা ও পচনসহ অস্বাভাবিক জটিলতা দেখা দেয়। পুনরায় ওই হাসপাতালে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে দ্বিতীয় দফায় ক্ষতস্থানে অস্ত্রোপচার করেন এবং এ বাবদ সুমির স্বজনদের ৫০ হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেন। পরে বিলের পরিমাণ কিছুটা কম নেওয়া হলেও সুমির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
পরবর্তীতে সাভার ও ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন সুমি। প্রায় দুই মাস পর যক্ষার পরীক্ষা করা হলে গত ১৯ জুন তার যক্ষার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তার যক্ষার কার্ড করা হয় এবং বর্তমানে তিনি ব্র্যাক থেকে সরবরাহ করা যক্ষার ওষুধ গ্রহণ করছেন। তবে এর মধ্যেই তার ক্ষতস্থানে পুনরায় পচন ধরে গর্ত হয়ে যাওয়ায় মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকরা সেখানে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। পরে দীর্ঘদিন ভর্তি থেকে তাকে তৃতীয় দফা অস্ত্রোপচার করাতে হয়।
নাগরিক টেলিভিশন কে সুমি আক্তার বলেন, “ছয়-সাত মাসের মধ্যে একই স্থানে আমার তিনবার অপারেশন করা হয়েছে। একজন মানুষের যদি ছয় মাসে তিনবার সিজারিয়ান করা হয় তাও একই স্থানে তাহলে তার শরীরে আর কতটুকু কি থাকে? আমি কীভাবে বাঁচব? এই অবস্থায় আমি কার্যত পঙ্গু হয়ে গেছি। এ শরীর নিয়ে কোনো কাজকর্ম করে সংসার চালানো সম্ভব নয়। আমার স্বামীর যা সঞ্চয় ছিল, সবই আমার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে গেছে। দুই সন্তান নিয়ে এখন সংসার চালানো তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে আমি এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমাদের এখন আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। ভুল যদি হয়ে থাকে, তা ওই পপুলার হাসপাতালের। তাদেরই আমাদের সব চিকিৎসা ব্যয় বহন করা উচিত। অন্যথায় সুষ্ঠু তদন্ত করে হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতাল মামাতো ভাই আব্বাসের শেয়ারধারী হওয়ায় তারই আশ্বাসে গত ১৫ জুন ধামরাই উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের গাওয়াইল এলাকার মো. কোরবান আলীর স্ত্রী রহিমা বেগম ওই হাসপাতালে জরায়ুর অস্ত্রোপচার করান। তবে অস্ত্রোপচারের কয়েক দিন পর তার শরীরেও একই ধরনের যক্ষার সংক্রমণ দেখা দেয়।
পুনরায় ভুক্তভোগী রহিমা তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে গেলে রহিমার মামাতো ভাই ও হাসপাতালের শেয়ারধারী আব্বাস দায়িত্বশীল আচরণ না করে বোন কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এ সময় তিনি রহিমা বেগমকে উদ্দেশ করে বলেন, তোমার তো মরার ভিসা এসে গেছে, তাই এমন হয়েছে। তখন রহিমার মেয়ে তাকে নিয়ে চলে আসেন। এরপর সাভার ও ঢাকায় একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও রহিমা এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। তার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে স্বামী কোরবান আলী তার শেষ সম্বল হিসেবে নিজের গরু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
ভুক্তভোগী রহিমার বাড়িতে গিয়ে তার মেয়ের সঙ্গে কথা হয়। মেয়ে জানান তার মা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি নাগরিক টেলিভিশন কে বলেন, ওই হাসপাতালে আমার মায়ের মামাতো ভাই আব্বাস শেয়ারধারী। তার আশ্বাসেই সেখানে মায়ের অপারেশন করাই। কিন্তু অপারেশনের পর সমস্যা দেখা দিলে আবার তার কাছে গেলে তিনি আমার মাকে বলেন, ‘তোমার তো মরার ভিসা এসে গেছে, তাই এমন অবস্থা।’ এ কথা শুনে আমার মা ভেঙে পড়েন এবং কান্না করতে থাকেন। পরে সেখান থেকে ফিরে এসে আমরা মাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর ঢাকায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।সেখানে মায়ের দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী রহিমার মেয়ে আরো বলেন, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে আমার বাবাকে গরু বিক্রি করতে হয়েছে। ওই হাসপাতাল আমার ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করে। আমি ছেলে হলে হাসপাতালের বিরুদ্ধে মামলা করতাম।
ধামরাই উপজেলার সোমভাগ ইউনিয়নের দেপাশাই কোড়ালভাঙা এলাকার মো. আনোয়ারের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের খোঁজ পেয়ে তার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার সাথে। জানা যায়, গত ২৮ মে রাত আটটার দিকে একই হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যা সন্তান হয় তার। তবে সন্তান জন্মের প্রায় আট মাস পার হয়ে গেলেও তার সিজারিয়ানের ক্ষতস্থান এখনো ভালো হয়নি। একই স্থানে একাধিকবার অস্ত্রোপচার হওয়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম করতে পারছেন না। ফলে সংসারের কাজে সহযোগিতা করতে মাঝেমধ্যে তার মাকে আসতে হচ্ছে তার শ্বশুর বাড়ি।
স্বপ্না আক্তারের মা অভিযোগ করে বলেন, “পপুলার হাসপাতালে সিজারিয়ান হওয়ার পর থেকেই আমার মেয়ের জীবনটাই যেন শেষ হয়ে গেছে। এ সমস্যার কারণে সে এখনো সুস্থ হয়নি। তাকে দুইবার অপারেশন করাতে হয়েছে। এমন অবস্থাও হয়েছিল যে, সেলাইয়ের ক্ষতস্থানে এক পাশ দিয়ে সেভলন দিলে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যেত। সন্তান জন্মের ছয়-সাত মাস পার হলেও এখনো সুস্থ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। কয়েক দিন পরপর ড্রেসিং করতে হয় এবং প্রতিদিন যক্ষার ওষুধ খেতে হচ্ছে। এসব ওষুধ খেলে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ওষুধের সঙ্গে দুধ, কলাসহ পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো না হলে সে বিছানা থেকেও উঠতে পারে না। একাধিকবার অস্ত্রোপচারের কারণে আমার মেয়ে এখন কোনো কাজ করতে পারে না। তাই নিজের সংসারের কাজ ফেলে এসে মেয়ের দেখাশোনা করতে হচ্ছে। এখন আমাদের আর কোনো উপায় নেই।
এছাড়াও সূত্র জানায় এই ভয়ংকর চিকিৎসা বিভীষিকর শিকার হয়েছেন, মিম আক্তার (১৬), শাহানাজ (২৫), সানজিদা (২২), আকলিমা (১৮), কুলছুম (১৯), লিজা আক্তার (২১), রাশেদাসহ (২৫) আরো প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী।
যক্ষা বা টিবি সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে— পালমোনারি টিবি (Positive TB ও Negative TB) এবং এক্সট্রা-পালমোনারি টিবি (EP TB)। ফুসফুসের বাইরে শরীরের অন্যান্য অংশে যে যক্ষা সংক্রমণ ঘটে, তাকে এক্সট্রা-পালমোনারি টিবি বলা হয়। পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে সিজারিয়ান ও অন্যান্য অস্ত্রোপচারের পর যেসব রোগী যক্ষায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই এক্সট্রা-পালমোনারি টিবির (EP TB) রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন।
এ বিষয়ে ব্র্যাকের ধামরাই শাখার যক্ষা সেন্টারের প্রোগ্রাম অফিসার তানিয়া সুলতানা জানান, সম্প্রতি কালামপুর এলাকার পপুলার ডিজিটাল হাসপাতাল থেকে আসা একাধিক রোগী তাঁদের কেন্দ্রে নিয়মিত যক্ষার চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং তাঁরা সবাই এক্সট্রা-পালমোনারি টিবি (EP TB) রোগী।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের সময় বা পরে অপারেশনের কাটা বা ক্ষতস্থানের মাধ্যমে যক্ষার জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অপারেশনের পর যদি ক্ষতস্থান দীর্ঘদিন শুকাতে না চায় এবং সেখানে স্যাঁতসেঁতে থাকে তাহলে সেই পরিবেশে টিবির জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ক্ষতস্থান আরও খারাপ হতে থাকে।
পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই ঘটনার আগে হাসপাতালে প্রতি মাসে সিজারিয়ানসহ অন্যান্য অস্ত্রোপচার মিলিয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি অপারেশন করা হতো। এক পর্যায়ে যক্ষায় আক্রান্ত এক রোগীর সিজারিয়ান এই হাসপাতালেই করা হয়। এরপর থেকেই যেসব রোগীর এখানে অপারেশন হয়েছে, তাঁদের অনেকেই পরবর্তীতে যক্ষায় আক্রান্ত হন।
তিনি আরও বলেন, শুরুতে কোনো চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝতে পারেননি। রোগীরা জটিলতা নিয়ে ফিরে এলে তাঁদের আবার অপারেশন করা হতো অথবা অন্য হাসপাতালে রেফার্ড করা হতো। আবার অনেক রোগী দ্বিতীয়বার আর এই হাসপাতালে আসেননি, তবে নতুন সকল অপারেশন কার্যক্রম তখনও চলমান ছিল। এভাবেই প্রায় তিন থেকে চার মাস সময় পার হয়ে যায়।
এই হিসাবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শতাধিক বা তারও বেশি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে তাঁর জানা মতে, অন্তত ৪৫ জন রোগী এমন ছিলেন, যারা সমস্যার কারণে দ্বিতীয়বার হাসপাতালে এসেছিলেন। পরে তিন থেকে চার মাস পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ঢাকা থেকে একটি টিম এসে তদন্ত শুরু করে। সে সময় কয়েক দিনের জন্য অপারেশন থিয়েটার (ওটি) বন্ধ রাখা হয়। এরপর আবার নতুন করে অপারেশন কার্যক্রম শুরু করা হয়।
পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক রাশেদুল ইসলাম রফিক নাগরিক টেলিভিশনের –কে বলেন, যে ঘটনাটি ঘটেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন নয়। তাঁর মতে, হাসপাতালে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা ২০ জন বা তার বেশিও হতে পারে। ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে তিনি জানান, যক্ষা রোগে আক্রান্ত এক নারী এই হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশন হয়। এরপর থেকেই যক্ষার সংক্রমণটি ছড়িয়ে পড়ে বলে তিনি ধারণা করছেন। আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা হাসপাতাল থেকে দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে অনুসন্ধানে এমন কোনো ভুক্তভোগীর সন্ধান পাওয়া যায়নি, যিনি হাসপাতাল থেকে বাস্তবিক অর্থে বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। বরং অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের কাছ থেকে পরবর্তীতে আরও বেশি বিল আদায় এবং রোগীদের সঙ্গে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের অভিযোগ উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে রাশেদুল ইসলাম রফিক আরও বলেন, চিকিৎসা নিতে এসে যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের দায়ভার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই নেবে। “এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পপুলার হাসপাতাল এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেবে।” পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো ঘটনা আর ঘটবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মঞ্জুর আল মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, আমাদের সরকারি হাসপাতালে যখন একই রোগে আক্রান্ত একাধিক রোগী আসতে থাকে তখন আমরা বিষয়টি চিঠির মাধ্যমে ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (আইইডিসিআর)-কে জানাই। পরে আমাদের স্টাফদের একটি টিম ও আইডিসিয়াররের লোকজন মিলে পপুলার হাসপাতালের ওটি থেকে স্যাম্পল নিয়ে পরিক্ষা করেন। রোগ ধরা পড়ে আমরা রোগীদের চিকিৎসা দিতে থাকি এবং পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হাসপাতালকে কিছু পরামর্শ দেই। তারা পরামর্শ মতো কাজ করতে থাকে। পরামর্শমত কাজ করাতে আমরা হাসপাতালটি বন্ধ করে দেই নাই। তা নাহলে বন্ধ করে দিতাম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসঙ্গে এত রোগীর একই ধরনের মারাত্মক সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়া মেডিকেল নেগলিজেন্স, পাবলিক হেলথ রিস্ক, এমনকি দণ্ডবিধি ও ভোক্তা অধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি ভয়াবহ চিকিৎসা বিপর্যয়। দ্রুত হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল, দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে।
একসঙ্গে এত রোগীর একই ধরনের সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়া কোনোভাবেই সাধারণ চিকিৎসাগত ভুল হতে পারে না। এটি ধামরাইয়ের পপুলার ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালের চরম দায়িত্বহীনতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার ভয়াবহ নগ্ন উদাহরণ।
পড়ুন- আপসহীন নেত্রীর মৃত্যুতে স্তব্ধ কুমিল্লা
দেখুন- বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুতে দিনাজপুরে দলীয় অফিসে চলছে কুরআন খতম


