১৪/০১/২০২৬, ২৩:৩৯ অপরাহ্ণ
20 C
Dhaka
১৪/০১/২০২৬, ২৩:৩৯ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

নিউজ করায় সাংবাদিকদের হুমকি দিচ্ছেন শোকজকৃত শিক্ষক নাফসি তালুকদার

দেরিতে ক্লাসে যাচ্ছেন বলায় ৩৩ জন শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগে শোকজ হওয়া কালাই ময়েন উদ্দিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) এম এ জি নাফসি তালুকদার এবার সাংবাদিকদের হুমকি দিতে শুরু করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে সাংবাদিকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ৩৩ জন শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করার ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশকারী কয়েকজন সাংবাদিককে ফোন করে এবং লোক পাঠিয়ে হুমকি দেন।

এনিয়ে দৈনিক বাংলা পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি রাব্বিউল হাসান তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন,
খোলা চিঠি -নিউজ করায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করায় আমাকে কিছুক্ষণ আগে মেরে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন কালাই ময়েন উদ্দিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও সাবেক পৌর যুবদলের সভাপতি নাফসি তালুকদার। আমার জীবনে কোন ক্ষতি ও পরিবারের কোন ক্ষতি হলে তার দায়ভার নাফসি তালুকদারকে নিতে হবে। গতকাল যারা তার ব্যবহার নিয়ে মুখে ফেনা তুলছেন, আজ তারা কি বলবেন?

হুমকি পাওয়া নাগরিক টেলিভিশন ও দৈনিক শিক্ষাডটকম এর জেলা প্রতিনিধি মাহফুজার রহমান বলেন, সংবাদ প্রকাশের পর অভিযুক্ত শিক্ষক নাফসি তালুকদার আমাকে ফোন দিয়ে হুমকি দিয়েছে। সত্য সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে এ ধরনের হুমকি মুক্ত সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

হুমকির বিষয়ে আরও কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং প্রশাসনের বক্তব্যের ভিত্তিতেই সংবাদ প্রকাশ করেছি। অথচ নাফসি তালুকদার এখন আমাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। এতে আমরা পেশাগতভাবে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

দৈনিক কালের কণ্ঠের কালাই প্রতিনিধি সাউদ আব্দুল্লাহ ফেসবুকে দুঃখ প্রকাশ করে লেখেন, সাংবাদিকতায় সত্য বলার দায়, এখন ভয়!
সমাজের আয়নায় এক ভয়ানক প্রতিচ্ছবি!!

একসময় সাংবাদিকতা ছিল সবচেয়ে সম্মানজনক পেশাগুলোর একটি। এই পেশার মূল দায়িত্ব ছিল সত্য প্রকাশ, জনমানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই দায়িত্ব এখন রূপ নিয়েছে এক ভয়ঙ্কর ঝুঁকিতে। সত্য বলার দায় আজ শুধুই নৈতিক দায় নয় বরং জীবন-মরণের প্রশ্নে এসে ঠেকেছে। আজকের বাস্তবতায় একজন সাংবাদিক যখন কোনো সত্য ঘটনা তুলে ধরেন তখন তা শুধু তথ্য প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তার জীবনের নিরাপত্তা চরমভাবে হুমকির মুখে পড়ে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই চিত্রটিকে আরও পরিষ্কার করে দিয়েছে। সাংবাদিকরা একটি ঘটে যাওয়া প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যেখানে অন্যায় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশিত হয়। ফলে সেসব সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হয়, পরিবার নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয় এমনকি তাকে ‘দৃষ্টান্ত’ বানানোর হুমকিও দেওয়া হয়। এ যেন এক ভয়াবহ বাস্তবতা, যেখানে সত্য বলা হয়ে উঠেছে অপরাধ আর মিথ্যা ও প্রোপাগান্ডা হয়েছে নতুন স্বাভাবিকতা।

সাংবাদিকরা এখন সমাজের আয়নায় এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি দেখায়, যা অনেকেরই পছন্দ হয় না। কারণ তারা সেই সত্যগুলো তুলে ধরে, যা বহুদিন ধরে চেপে রাখা হয়েছিল বা সচেতনভাবে আড়াল করা হয়েছিল। তারা যখন দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন, তখন দুর্নীতিবাজরা ক্ষিপ্ত হয়। তারা যখন কোনো প্রভাবশালীর অপরাধ প্রকাশ করেন, তখন সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের রক্ষা করতে গিয়ে হিংস্র হয়ে ওঠে। এমনকি স্থানীয় ক্ষমতার আড়ালেও কখনো কখনো সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলে। অথচ সাংবাদিকরা রাষ্ট্রবিরোধী নয় বরং রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন; তারা সমাজের অন্ধকার গলিপথে আলো জ্বালাতে বদ্ধপরিকর।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাংবাদিকদের উপর হওয়া হামলা কিংবা হুমকির বিরুদ্ধে সঠিক বিচার প্রক্রিয়া প্রায় অনুপস্থিত। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সাংবাদিককে উল্টো মামলায় জড়ানো হয়, তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়। এতে একদিকে যেমন সত্য বলার সাহস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে, অন্যদিকে সমাজে একটি ভীতিকর নীরবতা সৃষ্টি হয়—যা গণতন্ত্রের জন্য চরম হুমকি।

সাংবাদিকতায় এখন আর শুধু কলমই অস্ত্র নয় বরং প্রতিটি শব্দ যেন হয়ে উঠেছে এক রণক্ষেত্রের গোলাবারুদ। সেই শব্দের দায়িত্ব নিতে গিয়ে কেউ হয়তো সমাজের মুখ উজ্জ্বল করে, আবার কেউ নিজের জীবনটাই হারিয়ে ফেলে। তবুও সত্য থেমে থাকে না। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, সত্যকে দমিয়ে রাখা যায়, কিন্তু চিরতরে থামিয়ে দেওয়া যায় না।

আজ যখন একজন সাংবাদিক রিপোর্ট লেখেন, তখন তিনি শুধু তথ্য বিশ্লেষণ করেন না, বরং মনে মনে নিজের পরিবারের কথা ভাবেন, নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেন। এমন বাস্তবতা কোনো সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না। যেখানে সত্য বলার জন্য হুমকি খেতে হয় বা জীবন দিতে হয়, সেখানে মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র, সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

সত্য কখনোই সুবিধাজনক হয় না, সত্য চিরকালই কিছু না কিছু ঝুঁকি নিয়ে আসে। কিন্তু যদি সাংবাদিকরা সেই সত্য বলার দায় থেকে পিছিয়ে আসেন, তাহলে সমাজ এক ভয়ঙ্কর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। মানুষ তথ্য পাবে না, কণ্ঠস্বর পাবে না, প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি হারাবে।

এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। পরিবর্তন দরকার সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে, যেখানে সাংবাদিককে শত্রু নয়, সমাজ সংস্কারক হিসেবে দেখা হবে। রাষ্ট্রকে নিতে হবে দায়িত্ব, জনগণকে দাঁড়াতে হবে পাশে। কারণ সাংবাদিক একা নয়—সে সমাজের, সে রাষ্ট্রের, সে মানুষের পক্ষের একজন যোদ্ধা।

এটাই সময়, ভয় নয়, সত্যকে সামনে এনে সাংবাদিকতার মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষা করার। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আয়নায় আমরা শুধু ভয়ের প্রতিচ্ছবিই দেখতে পাব,যেখানে সত্য চাপা পড়ে থাকবে শাসনের নিচে আর সমাজ হারাবে তার নৈতিক ভিত্তি।

জয়পুরহাট প্রেসক্লাবের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্য জানান, শিক্ষক নাফসি তালুকদারের হুমকি দেওয়ার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সাথে দেখছেন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীমা আক্তার জাহান বলেন, আমি ফেসবুকে এ নিয়ে এক সাংবাদিকের পোস্ট দেখেছি। তবে এখন পর্যন্ত কেউ এনিয়ে আমাকে ফোন করে বা রিটেন অভিযোগ দেয়নি। আমরা তার আগের অভিযোগগুলোর সাথে এটিও আমলে নিবো।

পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুল ওহাব বলেন, সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো থানায় জিডি বা কোনো অভিযোগ হয়নি। তবে একজন সাংবাদিক ফোন করে বিষয়টি বলেছে। আমি তাকে থানায় জিডি করতে বলেছি।

এর আগে গত মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপর বেত্রাঘাত করার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষককে শোকজ করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে সরকারি জায়গা দখল করে দলীয় অফিস খোলা, সহকর্মী শিক্ষক ও ডাক্তার-নার্সদের সাথে খারাপ ব্যবহারসহ একাধিক অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

সাংবাদিক মহল বলছে, শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও অন্যায় কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দিতে গিয়ে এখন সংবাদকর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত। তারা অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

পড়ুন: বন্দরে আবাসিক এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন, ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা

দেখুন: ইরাকে কেন মার্কিন সে/না থাকতে পারবে না?

ইম/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন