বিজ্ঞাপন

নিকুঞ্জ ও টানপাড়ায় কুকুরের রাজত্ব: মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে

রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন নিকুঞ্জ ও টানপাড়া এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের অস্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি বর্তমানে এক চরম জনদুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। দিন দিন এই সমস্যা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাফেরা এখন রীতিমতো মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দলবদ্ধ কুকুরের অবাধ বিচরণ পুরো এলাকায় এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করছে, যা আধুনিক নগর জীবনের নিরাপত্তার ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​নিকুঞ্জের প্রধান সড়কগুলো থেকে শুরু করে টানপাড়ার জামতলা জাহিদ ইকবাল চত্বর, বালুর মাঠ আইজ্জার বস্তি, পশ্চিমপাড়া, সরকার বাড়ি এবং পুরাতন বাজার এলাকা এখন কার্যত বেওয়ারিশ কুকুরের দখলে চলে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ অনুযায়ী, দিনের বেলায় পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় থাকলেও সূর্য ডুবলেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। প্রতিটি মোড়ে ১০ থেকে ১৫টি কুকুরের শক্তিশালী একেকটি দল অবস্থান নেয়। অনেক সময় একা পথচারী বা সাইকেল-মোটরসাইকেল আরোহীদের ঘিরে ধরে কিংবা হিংস্রভাবে তেড়ে আসে এই অবুঝ প্রাণীর দল।

​এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে কোমলমতি শিশু, স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও প্রবীণরা। অনেক অভিভাবক সন্তানদের একা বাইরে পাঠাতে চরম আতঙ্ক বোধ করছেন, যা শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ও সামাজিক চলাফেরাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। জরুরি প্রয়োজনে বের হলেও হাতে লাঠি বা কোনো আত্মরক্ষামূলক সরঞ্জাম রাখা এখন খিলক্ষেতবাসীর জন্য অলিখিত এক বাধ্যতামূলক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিকদের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত একটি শহরে এমন ‘অসহায়’ জীবনযাপন কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

​স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যাটি কেবল চলাচলের অসুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে ভয়াবহ এক স্বাস্থ্যঝুঁকি। বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক বা রেবিস হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে শতভাগ প্রাণঘাতী হতে পারে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) টিকাদান কর্মসূচি মাঝে মাঝে পরিচালিত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য এবং অনিয়মিত। কুকুরের কামড়ের পাশাপাশি এদের মল-মূত্র থেকে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়া ও ত্বকের বিভিন্ন সংক্রমণসহ নানা রোগব্যাধি।

​খিলক্ষেত টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির পক্ষ থেকে এই সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলা হয়েছে যে, একটি সভ্য ও আধুনিক নগরীতে নাগরিকরা কুকুরের ভয়ে তটস্থ থাকবে—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন না করেই একটি বিজ্ঞানসম্মত ও মানবিক সমাধান বের করা সময়ের দাবি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেগুলোকে লোকালয় থেকে নিরাপদ দূরত্বের কোনো অভয়ারণ্যে বা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে স্থানান্তর করা এখন এলাকাবাসীর প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

​নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো এলাকার অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। যত্রতত্র ফেলে রাখা উচ্ছিষ্ট খাবার কুকুরের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র ভ্যাকসিন প্রদান বা বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়নে রয়েছে চরম ধীরগতি। ফলে কুকুরের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে এবং প্রতিটি অলিগলি এক একটি ‘ডেঞ্জার জোন’-এ পরিণত হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, শুধুমাত্র লোকদেখানো প্রচারণা নয়, বরং দ্রুত মাঠপর্যায়ে কুকুর অপসারণ কার্যক্রম শুরু হোক।

​নিকুঞ্জ ও টানপাড়ার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে। কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি ঘটার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।

আধুনিক বিশ্ব যেভাবে প্রাণিকল্যাণ আইন মেনে জনপদকে নিরাপদ রাখে, সেই মডেলে এখানেও দ্রুত কাজ শুরু করা উচিত।
অন্যথায়, সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেমন বাড়বে, তেমনি এই এলাকার জনজীবন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ১১ জেলায় নতুন ডিসি

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন