দেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর। বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষায়, পুঁজিবাজার কোনো জাদুর কাঠি নয়, কিন্তু সঠিকভাবে চালাতে পারলে এটি অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে। তবে এ জন্য সব নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পেশাদার ব্যক্তিদের দিয়ে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে হবে।
গতকাল বনানীতে ঢাকা শেরাটন হোটেলে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ আয়োজিত ‘নির্বাচন পরবর্তী ২০২৬ সাল: অর্থনীতি, রাজনীতি এবং পুঁজিবাজার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, শুধু সরকার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করলেই পুঁজিবাজার শক্তিশালী হবে– এ ধারণা ভুল। মূল চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা।
তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার কোন পথে এগোবে– এ প্রশ্নে বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নয়, আস্থাই মূল বিষয়
সেমিনারে উপস্থাপক ব্র্যাক ইপিএলের পরিচালক সাইফুল ইসলাম সরকারের ১০০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে তিন থেকে পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার অঙ্গীকার চেয়ে প্রশ্ন তুললে আমীর খসরু স্পষ্ট করেন, সরকার কত শতাংশ শেয়ার ধরে রাখবে, তা মুখ্য নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকার একটি প্রতিষ্ঠানে কতটা স্বার্থসংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে এবং বাজারে প্রভাব কীভাবে পড়ছে।
তিনি বলেন, কোনো কোম্পানিকে বাজারে আনতে হলে আগে দেখতে হবে সেটি সঠিকভাবে মূল্যায়িত এবং শেয়ারের দর কারসাজির শিকার হবে কিনা। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চিত ও অজানা পরিবেশে যেতে চান না। তাঁর মতে, ভালো মানের বেসরকারি কোম্পানি বাজারে না এলে পুঁজিবাজার কখনোই গভীর ও কার্যকর হবে না। তবে সেটি সম্ভব নয়, যদি না নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকাররা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে।
ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের আহ্বান
আমীর খসরু বলেন, গত এক দশকে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিটিআরসি– এগুলো সাধারণ সরকারি দপ্তরের মতো চালানো যাবে না। এগুলোকে স্বাধীনভাবে এবং পেশাদার ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালনা করতে হবে এবং তাদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামোও থাকতে হবে। যোগ্য লোক আনতে হলে যোগ্য মূল্য দিতে হবে।
আমীর খসরু প্রশ্ন তোলেন, কার্যকর পুঁজিবাজার ছাড়াই বাংলাদেশ এতদূর কীভাবে এলো– এটাই বিস্ময়ের। যুক্তরাষ্ট্রে বাজার মূলধন জিডিপির দ্বিগুণ, ভারতে প্রায় ৬০ শতাংশ, পাকিস্তানেও উল্লেখযোগ্য অংশ; অথচ বাংলাদেশে তা মাত্র এক অঙ্কের ঘরে।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজার অকার্যকর থাকায় সব চাপ পড়েছে ব্যাংকিং খাতের ওপর। স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া হয়েছে, যার ফল আজকের ব্যাংকিং খাতের সংকট। যদি পুঁজিবাজার ঠিকভাবে কাজ করত, তাহলে সরকারকে বারবার আইএমএফের কাছে চার বিলিয়ন ডলারের জন্য কঠিন শর্ত মানতে হতো না।
ব্যাংকিং খাত সংস্কারে আশাবাদ
সেমিনারে অংশ নিয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ব্যাংকিং খাতে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার শুরু হয়েছে। ব্যাংকিং কোম্পানি আইন সংশোধন, শেয়ারহোল্ডিং সীমা নির্ধারণ, পরিচালকদের ভূমিকা স্পষ্ট করা– এসবই সুশাসনের পথে অগ্রগতি। উচ্চ মন্দ ঋণ বিষয়ে বলেন, কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি হলেও ভালো ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা ৪ শতাংশেরও কম।
বাজার সংস্কার নিয়ে কাজ করছে নিয়ন্ত্রক
বিএসইসির কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন বলেন, চলমান সংস্কার উদ্যোগ মূলত দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যার সমাধানকে লক্ষ্য করেই নেওয়া হয়েছে। তথ্য ঘাটতি, শিল্প খাতের অর্থায়ন ও ব্যাংক– পুঁজিবাজারের ভারসাম্য ফেরানোই এসব সংস্কারের উদ্দেশ্য। এরই মধ্যে আইপিও আইন করা হয়েছে, যা উদ্যোক্তাদের ভালো মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আবার অনিয়ম বন্ধে প্রকাশিত তথ্যে যে কোনো ভুল তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়ী করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত ১৭ বছরে ব্যাংক খাত থেকে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতকে অর্থায়ন করায় কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজার হয়নি। এ সংস্কৃতির অবসান হলে পুঁজিবাজারের উন্নতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বক্তব্য
অনলাইনে যুক্ত হয়ে টুন্দ্রা ফন্ডারের সিআইও ম্যাথিয়াস মার্টিনসন বলেন, মূল্যায়নের দিক থেকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখন ১০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংকট-পরবর্তী প্রথম ধাপে ব্যাংকিং ও ওষুধ খাতই সাধারণত ঘুরে দাঁড়ায়। তিনি বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স সরলীকরণ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক বার্ষিক অ্যানালিস্ট ব্রিফিংয়ের প্রস্তাব দেন।
অন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, কর-সুবিধা ও অ্যামনেস্টি দেওয়া হলে বাজার দ্রুত প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
সেমিনারে আড়াই শতাধিত বিদেশি বিনিয়োগকারী সরাসরি ও অনলাইনে যুক্ত হন। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাক ইপিএলের সিইও আহসানুর রহমান, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আতীকুর রহমান। সমাপনী বক্তব্য দেন ব্র্যাক ইপিএলের চেয়ারম্যান ফাহিমা চৌধুরী।
পড়ুন: ৫৭ হাজার টন গম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে মার্কিন জাহাজ
দেখুন: সৌদি থেকে রেমিট্যান্স কমার কারণ কী? |
ইম/


