আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এই চুক্তি অনুষ্ঠান হবে। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্কহার নিয়ে এর আগে গত আগস্ট মাসে সমঝোতা হয় দুই দেশের; তবে চুক্তি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এখন সেই চুক্তি সই হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রথমে ৩৭ শতাংশ এবং পরে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করলেও আলোচনার সুযোগ রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফার আলোচনা শেষে গত ৩১ জুলাই সেই শুল্কহার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তবে এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতিসহ বাংলাদেশকে বেশ কিছু ছাড় দিতে হয়েছে।
শুল্কহার কত শতাংশ হতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের রেসিপ্রোকাল শুল্কহার ২০ শতাংশ রয়েছে। অন্যান্য দেশেও প্রায় একই বা কোথাও আরও বেশি শুল্কহার রয়েছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শুল্কের চূড়ান্ত হার নির্ধারণে ৯ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত সময় নেওয়া হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শুল্ক সুবিধা পেতে বাংলাদেশকেও যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হচ্ছে। গত আগস্টে শুল্কহার ২০ শতাংশে নামানো হলেও তখন কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। পরে শুল্ক আরও কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে উৎপাদিত পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকে, যা এবার চুক্তিতে রূপ নিতে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ভারতের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ চুক্তি স্বাক্ষর প্রসঙ্গে সরকার উদ্বিগ্ন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, এতে উদ্বেগের কিছু নেই। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ গত ৪৫ বছরে সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। এই সক্ষমতা রাতারাতি অন্য কোনো দেশ অর্জন করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, ভারত বেসিক টেক্সটাইলে শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তাদের অবস্থান ভালো। বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকেই অনেক ক্ষেত্রে কাঁচামাল সংগ্রহ করে। ফলে দুই দেশ প্রতিযোগী নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক।
এলডিসি উত্তরণের পর সুযোগ-সুবিধা হারানোর প্রেক্ষাপটে নতুন এফটিএ পরিকল্পনা আছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, সরকার একাধিক দেশের সঙ্গে এফটিএ করছে। জাপানের সঙ্গে এফটিএর সব আলোচনা শেষ হয়েছে এবং আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষর হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং চলতি বছরের মধ্যেই চুক্তি স্বাক্ষরের আশা করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও এফটিএর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং অন্যান্য শুল্কমুক্ত বাজারের সঙ্গেও আলোচনা শিগগিরই শুরু হবে।
রমজানের বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, নিত্য-পণ্যের সরবরাহ ও দাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এ বছর পরিস্থিতি ভালো থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে তিনি জানান, বিমানের সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আগেও আলোচনা চলছিল। বোয়িংয়ের সঙ্গে আলোচনা এখন একটি কাঠামোগত পর্যায়ে এসেছে। কতটি উড়োজাহাজ, কোন বছরে সরবরাহ, দাম এবং ভেতরের কনফিগারেশন—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
যুদ্ধবিমান এই চুক্তির অংশ কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুদ্ধবিমান কখনোই বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আসে না; এটি সামরিক বিষয়।
গত ছয় মাসে রপ্তানি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ নেতিবাচক হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্ববাণিজ্যেই এই ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ভালো।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে উৎপাদিত পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে সাধারণত কিউমুলেশন বেনিফিট পাওয়া যায় এবং বাংলাদেশ সেটাই প্রত্যাশা করছে। এটি চুক্তিতে সরাসরি না থাকলেও প্রগ্রেসিভভাবে অর্জিত হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের তুলা দিয়ে উৎপাদিত পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা চেয়ে আসছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি হয়েছে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আগামী এক থেকে দেড় বছরে দেড় বিলিয়ন ডলার আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ।
এই লক্ষ্যে আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদে প্রতিবছর সাত লাখ টন করে গম আমদানি, জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, তুলা, সামরিক ও বেসামরিক উড়োজাহাজ যন্ত্রাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

