পরাজিত হয়েছেন নির্বাচনে। তবে ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা। পদ ছাড়ার পরিবর্তে বরং তার আগ্রহ বাণিজ্য আলোচনায়।
সদ্যসমাপ্ত উচ্চকক্ষের নির্বাচনে জাপানের ক্ষমতাসীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। কিন্তু এই কঠিন পরাজয়ের মধ্যেও পদত্যাগে রাজি নন প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা। রোববার ভোটগ্রহণ শেষে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “এই কঠিন ফলাফল আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করছি, তবে এখন আমার মূল মনোযোগ বাণিজ্য আলোচনা।”
ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, ২৪৮ আসনের উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সরকার জোটের প্রয়োজন ছিল অন্তত ৫০টি আসন। অথচ তারা পেয়েছে মাত্র ৪৭টি। প্রধান বিরোধীদল কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি পেয়েছে ২২টি আসন।
এই ফলাফল এমন এক সময় এলো, যখন মূল্যস্ফীতি, চালের দাম বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক কেলেঙ্কারিতে জনগণের ক্ষোভ ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন ও সম্ভাব্য নতুন শুল্কর হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই পরিস্থিতিতে কয়েকদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার মতো জাপানকেও কড়া বার্তা দেন। তিনি ইশবাকে ৫০ দিনের সময়সীমা দিয়ে হুঁশিয়ারি দেন, যদি এই সময়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হয়, তবে কঠোর বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করা হবে।
কিন্তু ভোটের ফলাফলেই দেখা গেল, জনগণ এমন চাপ বা বার্তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ভেতরের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী ইশিবা জনসম্পৃক্ততা এবং উদ্দীপনা তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছেন। দেশের ভেতরে তার প্রতি আস্থা কমেছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের তুলনায়। কারণ অনেক রক্ষণশীল সমর্থক মনে করেন, ইশিবা যথেষ্ট জাতীয়তাবাদী নন, তার চীনা বিরোধী অবস্থানও আবের মতো দৃঢ় নয়।
এই অবস্থায় রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা করে নিয়েছে একটি ছোট, কিন্তু অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠ দল সানসেইতো। দলটির নেতৃত্বে আছেন সোহেই কামিয়া, যাকে অনেকেই জাপানের ‘ট্রাম্প’ বলে আখ্যা দেন। ‘জাপান ফার্স্ট’ নীতির ঝান্ডাবাহী এই দলটি এবারের নির্বাচনে ১৪টি আসন পেয়েছে, যেখানে আগের নির্বাচনে তাদের ছিল মাত্র একটি আসন।
সানসেইতো দলের উত্থান এসেছে মূলত ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ার তত্ত্বভিত্তিক প্রচার থেকে। মহামারিকালে তারা মুখে মাস্ক না পরার আহ্বান জানায়, ভ্যাকসিন বিরোধিতা করে, এমনকি ‘ডিপ স্টেট’ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দিয়ে বিতর্ক তৈরি করে।
জাপান ঐতিহ্যগতভাবে অভিবাসনবিরোধী ও সংস্কার-প্রতিরোধী সমাজ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি পর্যটক ও অভিবাসীর ঢল সেখানে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক স্থানীয় নাগরিকের অভিযোগ, বিদেশিরা জাপানের সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করছে।
এই ভেতরে থাকা ক্ষোভই ব্যবহার করেছে সানসেইতো। দলটি নির্বাচনী প্রচারে সরাসরি বলেছে,“বিদেশিদের কারণে জাপান তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে।” এই ইস্যুকে সামনে রেখেই তারা জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছে মূলধারার অনেক ভোটারদের কাছ থেকে।
এই প্রেক্ষাপটে ইশিবা ঘোষণা দিয়েছেন একটি টাস্কফোর্স গঠনের, যারা বিদেশিদের অপরাধ বা ‘বিরূপ আচরণ’ খতিয়ে দেখবে। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ ভূমি ক্রয়, অভিবাসন সংক্রান্ত অনিয়ম এবং সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা বকেয়া রাখা।
জাপানের রাজনীতিতে একটি অস্থির সময়ের সূচনা হলো এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে। গত তিনজন এলডিপি প্রধানমন্ত্রী, যারা উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছিলেন, তারা পদত্যাগ করেছিলেন দুই মাসের মধ্যেই।
এখনো দলীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের বিষয়ে কিছু বলেননি ইশিবা। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে, তাতে নতুন নেতৃত্বের জন্য পথ উন্মুক্ত হতে পারে। আলোচনায় আছেন সানা এ তাকাইচি, যিনি গতবার ইশবার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন; সাবেক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রী তাকায়ুকি কোবায়াশি; এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমির ছেলে শিনজিরো কোইজুমি।
তবে নেতৃত্ব বদল ঘটলে শুধু রাজনৈতিক নাটক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনাতেও প্রভাব পড়বে। আর এই মুহূর্তে জাপানের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা এই দুটোই সবচেয়ে জরুরি।
অন্যদিকে, সোমবার টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জ ছিল বন্ধ, তবে বৈশ্বিক বাজারে ইয়েনের মান বেড়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এই ফলাফলের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তবে রাজনৈতিক ঝড়ের শুরুটা এখানেই। তবে শেষ কোথায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
পড়ুন: কুড়িগ্রামে জেলা শ্রমিক দলের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত
দেখুন: কুমিল্লায় শনিবার বিএনপির সমাবেশ, পরিবহন ধর্মঘট নেই |
ইম/


