বাংলাদেশের লোকসংগীত ও বাউলচর্চার ভুবনে নীরবে এক সাধকের বিদায় ঘটেছে। সুনীল কর্মকার আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ, সুর ও জীবনদর্শন মানুষের হৃদয়ে আজও অনুরণিত। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন শিল্পীর প্রস্থান নয়; এটি গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং মানবিক চেতনার এক অপূরণীয় ক্ষতি। যিনি আলোচনার চেয়ে সাধনায় বিশ্বাস করতেন, যাঁর সুর ছিল উচ্চকণ্ঠ নয় বরং গভীর—সেই নীরব সুরের সাধকের শূন্যতা আজ সাংস্কৃতিক পরিসরে স্পষ্ট।
১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানার বান্দনাল গ্রামে জন্ম নেওয়া সুনীল কর্মকার ছিলেন মাটির কাছাকাছি থাকা এক শিল্পী। গ্রামের আকাশ, নদী, মাঠ ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম তাঁর শিল্পীসত্তাকে গড়ে তোলে। মাত্র সাত বছর বয়সেই গানের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক শুরু হয়। এই সম্পর্ক কোনো পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয়নি; বরং ছিল অন্তরের এক স্বতঃস্ফূর্ত টান। গ্রামের মেলা, আখড়া ও পারিবারিক আসরে তাঁর কণ্ঠ ধীরে ধীরে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়—একটি কণ্ঠ, যা শোনা নয়, অনুভব করার ছিল।
সুনীল কর্মকার কেবল একজন গায়ক নন; তিনি ছিলেন একজন লোকসাধক। বেহালা, দোতারা, একতারা, তবলা ও হারমোনিয়াম—প্রায় সব লোকবাদ্যেই ছিল তাঁর দক্ষতা। কিন্তু তাঁর শিল্পের প্রকৃত শক্তি ছিল বাদ্যযন্ত্রে নয়, বরং সেগুলোর মাধ্যমে সৃষ্টি করা অনুভবের ভেতর। তাঁর পরিবেশনায় গান কখনো একক সুর ছিল না; সুর, কথা ও নীরবতা মিলিয়ে তা হয়ে উঠত এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, যা শ্রোতাকে নিজের ভেতরের মানুষটির মুখোমুখি দাঁড় করাত।
তাঁর সাধনাপথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিশারী ছিলেন প্রখ্যাত সাধক জালাল উদ্দিন খাঁ। এই সাধকের গান ও দর্শনের মধ্য দিয়েই সুনীল কর্মকার নিজের মানবিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থান খুঁজে পান। জালাল খাঁর বহু গানে তিনি সুরারোপ ও কণ্ঠদান করেন। এসব গানে আত্মঅনুসন্ধান, মানবপ্রেম ও জীবনের গভীর অর্থের কথা ধ্বনিত হয়। “মানুষ ধরো, মানুষ ভোজ”—এই দর্শন তাঁর সংগীতচিন্তার মূল কেন্দ্রে অবস্থান করে এবং তাঁর ব্যক্তিজীবন ও শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
নিজস্ব রচনাতেও সুনীল কর্মকার ছিলেন গভীর ও সংবেদনশীল। প্রায় দুই শতাধিক গান তিনি রচনা করেছেন। এসব গানে গ্রামবাংলার প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ, সামাজিক বাস্তবতা এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান একসূত্রে মিশে আছে। ভাষা ছিল সহজ ও মাটির ঘ্রাণমাখা, কিন্তু ভাব ছিল গভীর ও বহুমাত্রিক। তাঁর গান প্রমাণ করে যে লোকসংগীত কোনো অতীতচারী ধারা নয়; মানুষের প্রশ্ন ও আত্মসংকট যতদিন থাকবে, এই সংগীত ততদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে।
সুনীল কর্মকারের সংগীত সাধনা সমাজে নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। তাঁর গান মানুষের মনকে শান্ত করেছে, দৃষ্টিভঙ্গিকে সংযত করেছে এবং আচরণে মানবিকতা এনেছে। জীবনের নানা সংকটে জর্জরিত সাধারণ মানুষ তাঁর গানের ভেতর খুঁজে পেত প্রশান্তির আশ্রয়। হিংসা, লোভ ও বিভেদের বিপরীতে তাঁর গান মানুষকে শোনাত সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও আত্মমর্যাদার কথা। অনেকেই তাঁর গান শুনে নিজের জীবন ও সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে শিখেছে।
আখড়া ও লোকগানের আসরগুলোতে তাঁর উপস্থিতি গড়ে তুলত সামাজিক সংহতির এক শান্ত পরিসর। ধর্ম, শ্রেণি কিংবা বয়সের ভেদাভেদ ভুলে মানুষ একত্র হতো তাঁর গানের টানে। এই মিলন গ্রামবাংলার সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে। তাঁর সংগীত মানুষকে কম কথা বলতে, বেশি অনুভব করতে শিখিয়েছে—আর সেই অনুভব থেকেই জন্ম নিয়েছে সহাবস্থান ও শান্তির চর্চা।
সুনীল কর্মকার বিশ্বাস করতেন, গান মানে শুধু সুর নয়; গান মানে মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়া। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি শিল্পকে ব্যবহার করেছেন মানুষের ভেতরের অশান্তি দূর করার জন্য। তাঁর সংগীত মানুষকে দেখিয়েছে—শান্তির পথ কোনো দূরের সাধনা নয়; বরং তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই নিহিত। নিজের ভেতরের মানুষটিকে চিনতে পারলেই মানুষ মুক্তির পথে এগোতে পারে—এই উপলব্ধিই ছিল তাঁর মানবিক দর্শনের মূল সুর।
ঝলমলে মঞ্চ বা আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে না গিয়ে সুনীল কর্মকার প্রমাণ করেছিলেন, সংগীতের প্রকৃত শক্তি তার অন্তরের গভীরতায়। একতারা ও দোতারার সুরে তাঁর কণ্ঠ মানুষের চোখ ভিজিয়েছে, মন নরম করেছে, ভাবনার জগৎ খুলে দিয়েছে। আজ যখন লোকসংগীত ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছে, তখন তাঁর মতো লোকসাধক আমাদের শিকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তাঁর বিদায় আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্নও রেখে যায়—আমরা কি যথেষ্ট সম্মান ও যত্ন দিই এমন সাধক শিল্পীদের, যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে সমাজ ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেন? সুনীল কর্মকার ছিলেন বিনয়ী, নীরব এবং গভীরভাবে নিজের সাধনায় অবিচল একজন মানুষ। তাঁর প্রস্থান আমাদের শোকাহত করেছে, একই সঙ্গে আমাদের দায়িত্বও স্মরণ করিয়েছে—এই লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়ার।
মৃত্যু কখনো একজন শিল্পীকে শেষ করে দিতে পারে না। সুনীল কর্মকার বেঁচে থাকবেন তাঁর গানে, সুরে ও দর্শনে। আখড়া, মেলা কিংবা নিভৃত কোনো আসরে যখন তাঁর গান ধ্বনিত হবে, তখন তিনি ফিরে আসবেন মানুষের ভেতরে। নীরব সুরের যে সাধনা তিনি আজীবন করে গেছেন, তা বাংলার সাংস্কৃতিক ও মানবিক স্মৃতিতে চিরকাল আলোকিত হয়ে থাকবে।
গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আমরা স্মরণ করি সুনীল কর্মকারকে—নীরব সুরের সেই সাধককে, যাঁর গান মানুষকে মানুষ হওয়ার পথ দেখিয়েছে, যাঁর মানবিক দর্শন সমাজে শান্তি ও সহাবস্থানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। সেই আলো নিভবার নয়; মানুষে মানুষে, সুরে সুরে তা চিরকাল বহমান থাকবে।
লেখক : ড. মো. রওশন আলম, সহকারী অধ্যাপক, সংগীত বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
rowson.prince@gmail.com
পড়ুন : সিলভার ইকোনমি: বার্ধক্য কি বোঝা নাকি বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা


