লালমোহন উপজেলার দক্ষিণ প্রান্ত এবং চরফ্যাশন উপজেলার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত চরউমেদ ইউনিয়ন। লালমোহন উপজেলার বৃহত্তম কয়েকটি বাজারের একটি গজারিয়া।আর এই গজারিয়া বাজারটি পুরো ভোলা জেলাসহ পাশ্ববর্তী জেলাগুলোতে প্রসিদ্ধ নৌকা তৈরির কারখানার জন্য। যারা নৌকা তৈরির করে জেলেদের কাছে বিক্রি করেন, তাদেরকে ব্যাপারী বলা হয়। আর প্রসিদ্ধ নৌকা তৈরি বাজার গজারিয়ায় রয়েছে এরকম ১৫জন ব্যাপারী।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, মামুন হোসেন, মো.নাগর, মো. কালাম,আলমগীর হোসেন, বেল্লাল হোসেন, মো.হাসান, মিলন, আল-আমীন, শানু, ইকবাল হোসেন, জুয়েল, শেখ ফরিদ, আমির হোসেন তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যাপারী। সবাই স্বাবলম্বী নৌকা তৈরি ও বিক্রি করে। নিজের সন্তান, পরিবার ও পরিজন নিয়ে ভালোই কাটছে তাদের দিনকাল নাগরিক টিভিকে এমনটাই জানালেন কয়েকজন ব্যাপারী।
মো: মামুন ব্যাপারী নাগরিক টিভিকে বলেন, তিনি নৌকা তৈরির ব্যবসার সাথে জড়িত। তার কারখানায় ৪জন মিস্তরি কাজ করে। ভোলা জেলার চরফ্যাশন, দক্ষিণ আইচা, শশীভূষন, দুলারহাট থানা, মনপুরা উপজেলাসহ জেলার পাশ্ববর্তী জেলা ও উপজেলা থেকে জেলেরা এখানে নৌকা কিনতে আসো।তাদের চাহিদা মত নৌকা আমরা তৈরি করে দেই। তৈরি করা নৌকা বিক্রি করে আলহামদুলিল্লাহ ভালো লাভ হচ্ছ।
আলমগীর ব্যাপারী জানান, নৌকা তৈরি কারখনায় সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করে শ্রমিকরা। তৈরি করা নৌকা জেলেরা নিয়ে যান কিনে। তিনি আরও বলেন, আমাদের সরকারিভাবে কেনো আর্থিক সহায়তা করা হয়নি। সরকারি ভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে পেশাটি আরও উন্নতি করতে সচেষ্ট হবেন তারা।
নৌকা তৈরির কারিগরদের ঠক ঠক শব্দের কর্মযজ্ঞ চলছে। বাপ-দাদা হতে প্রাপ্ত এই শিল্পকে আঁকড়ে ধরে হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় শৈল্পিক সৌন্দর্যে তৈরি হয় এসব নৌকা। তালায় তৈরি হওয়া এসব নৌকার কদর রয়েছে ভোলা জেলাসহ পাশ্ববর্তী জেলাগুলোতে। নদীমাতৃক এই দেশে এক সময় যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হতো নৌকা। তবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পকে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে শতাধিক লোকের।
চরফ্যাশন – ভোলা মহাসড়কের কোল ঘেঁষে লালমোহন উপজেলার গজারিয়া বাজার এলাকার গড়ে উঠেছে নৌকা গড়ার কারখানা। প্রতি বছর মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার অন্যতম উপকরণ নৌকা থাকার কারণে সারা বছর নৌকা তৈরির কাজ করতে হয় কারিগরদের।নৌকার তৈরির কারিগররা সাধারণত ডিঙ্গি ও কোষা ২ ধরনের নৌকা তৈরি করে থাকেন। কোষা ৯-১০ফুট আর ডিঙি নৌকা ১৫-১৬ ফুট দৈর্ঘ্য হয়ে থাকে। কাঠসহ প্রয়োজনীয় মালামাল প্রস্তুত থাকলে দৈনিক ২টি থেকে ৩ টি নৌকা তৈরি করা সম্ভব হয়। তবে এখানে সবচাইতে কোষা নৌকার কদর বেশি রয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা।
সাধারণত নৌকা তৈরিতে খৈ, কড়ই ও চম্বল, সুন্দরী গাছের কাঠ, ধাতু দ্রব্য পেরেক, তারকাটা, জলুয়া ব্যাবহার হয়ে থাকে। তাছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেহগনি গাছের কাঠ ব্যাবহার করে থাকেন কারিগররা। একটি ১২ হাত লম্বা একটি নৌকা তৈরি করতে তিন জন শ্রমিক এর মজুরী প্রায় ৩/৪ হাজার টাকা। এবং কাঠ বাবদ খরচ হয় চার হাজার টাকা,নানা বিধি আনুষঙ্গিক উপকরণ বাদে খরচ হয় তিন হাজার টাকা। নয় থেকে দশ হাজার টাকা খরচ করে একটা নৌকা বিক্রি হয় ১৪/১৫হাজার টাকা।
নৌকা ব্যাপারীরা জানান, প্রতিদিন সকল খরচ মিটিয়ে সামান্য কিছু টাকা লাভ হয় আমাদের। তারপরেও ৩০/ ৪০ বছর ধরে চলে আসা এই শিল্পকে আমরা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।
গজারিয়া মহিলা মাদ্রাসার বিএসসি শিক্ষক মোশাররফ হোসেন নাগরিক টিভিকে বলেন,আমার বাসা নৌকা তৈরি কারখানার পাশে।প্রায় ৪০ বছর ধরে নৌকা তৈরি শিল্পটি চলে আসছে। এই পেশার সাথে শতাধিক লোক জড়িত। তারা এই কর্ম করে নিজেরা ভালো ভাবে পরিবার ও পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন,পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। যদি সরকারি ভাবে নৌকা তৈরি কারখানায় কর্মরতদের আর্থিক সহায়তা করা হয়,তাহলে দেশের অর্থনীতিতে তারা আরও বেশি অবদান রাখতে পারবে।
লালমোহন প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য সাংবাদিক আজিম উদ্দিন খাঁন বলেন, আমরা ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি, গজারিয়া বাজার সংলগ্নে নৌকা তৈরির কারখানা গড়ে উঠছে। পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত এই কারখানাটি তিনি ধরে রেখেছেন। বারো মাস নৌকা তৈরি করা হয়। তার কারখানায় প্রায় শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন। তবে নৌকা তৈরির সরঞ্জামের দাম ঊর্ধ্বগতির ক তিনি এক যুগের বেশি সময় ধরে এই নৌ-শিল্প ধরে রেখেছেন। এখন এই নৌ-শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।
পড়ুন: চরফ্যাশনে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা, প্রত্যাহারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন
এস/


