পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম কখনোই বন্ধ হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনই মন্তব্য করেন জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির-সাঈদ ইরাভানি। তিনি জানান, শান্তিপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যে এই কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে বৈধ এবং এটি ইরানের অধিকার।
ইরাভানি বলেন, “সমৃদ্ধকরণ আমাদের অধিকার, এটি একটি অখণ্ড অধিকার এবং আমরা এই অধিকার বাস্তবায়ন করতে চাই।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরমাণু অস্ত্র নয় বরং জ্বালানির চাহিদা পূরণের জন্যই ইরান এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী এর বৈধতা রয়েছে।
আলোচনার বিষয়েও ইরান তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ইরাভানি জানান, “তেহরান আলোচনার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আলোচনার নাম নয়। এটি আমাদের প্রতি একটি নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।” তার দাবি, আন্তর্জাতিক মহল যে আচরণ করছে তা কোনো কূটনৈতিক কাঠামোর আওতায় পড়ে না এবং এতে বাস্তবসম্মত আলোচনার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক হামলা ও উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান এখন কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আগ্রহী নয় এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার জন্য কোনো অনুরোধও নেই। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি “আলোচনার অনুপযুক্ত” বলে মন্তব্য করেন।
আইএইএ বা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও ইরানের অবস্থান জটিল হয়ে উঠেছে। ইরাভানি দাবি করেন, সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বা পরিদর্শকদের প্রতি ইরান সরকারের কোনো ধরনের হুমকি নেই। বরং ইরান বরাবরই সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চেয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে আইএইএ’র পরিদর্শকরা ইরানে অবস্থান করলেও তারা দেশটির পরমাণু স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন না। কিছু ইরানি কর্মকর্তা অভিযোগ করছেন, এই পরিদর্শকেরা ইসরায়েলের হামলাকে সাফাই দেয়ার পক্ষেই বেশি কাজ করে যাচ্ছেন, যা তাদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়।
সম্প্রতি ইসরায়েল একাধিকবার ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান তার পরমাণু কর্মসূচি আরও বেগবান করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা। তারা মনে করছেন, পারমাণবিক সক্ষমতার দিক দিয়ে ইরান অল্প সময়েই উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে।
পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করছে এবং নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। তবে তেহরানের যুক্তি, শক্তির নিরাপত্তা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাদের এই অধিকার অস্বীকার করা যায় না।
গত ১৩ জুন শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রও জড়িয়ে পড়ে। ওই সময়ে মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের অন্তত তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
যদিও এই হামলার কার্যকারিতা নিয়ে রয়েছে নানা মতভেদ। ১২ দিন চলা এই সংঘাতে ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে ‘রাগ, ঘৃণা ও ক্ষোভ’ আসায়, সব আলোচনা বন্ধ করে দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ অন্য সব কাজ বন্ধ করে দিই।” ট্রাম্প এখন আবার ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে তেহরান জানিয়েছে, তাদের কোনো আলোচনার পরিকল্পনা নেই।
এই অবস্থায় পারমাণবিক কূটনীতি কোন পথে যাবে তা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান ও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশলের ওপর। আপাতত ইরান যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি থামাবে না, সেটাই সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা।
এনএ/


