পরিবারকে সাবলম্বি করতে, অভাব মুছনে স্বপ্নের দেশ ইউরোপের পর্তুগালে আসা বাংলাদেশিদের চোখে ভেসে উঠে নিজের পরিবার। পরিবারের কথা, আর্থিক ঋণ পরিশোধের চিন্তা নিয়েই দিনকে রাত, রাতকে দিন করে পরিশ্রম করেই যান একজন প্রবাসী বাংলাদেশি।কিন্তু ছিনতাই, দুর্বৃত্তায়ন, হৃদরোগসহ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হয়ে লাশ হন, এরপর কফিনবন্দী হয়ে পড়েন একজন প্রবাসী।
সম্প্রতিকালে এরকম ঘটনায় পর্তুগালে বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশি কমিউনিটির মাঝে মৃত্যুভয় কাজ করছে।
গত ছয় মাসে (০৯ মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত) ৫জন প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ, গত সোমবার স্থানীয় সময় আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে লিসবনের বাঙালি অধ্যুষিত মাতৃ মনিজ এলাকার সেন্ট্রো কমার্সিয়াল মুরারিয়া মার্কেটের সামনে স্ট্রোক করে মারা যান মো. রফিকুল ইসলাম।তিনি ঢাকার জুরাইন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পর্তুগাল প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এর আগে রোববার (০৮ মার্চ) রাতে পর্তুগালে সড়ক দুর্ঘটনায় কানু রায় (৩২) নামের যুবক নিহত হয়েছেন। তিনি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার পীর কাশিমপুর গ্রামের বাসিন্দা। নিহত ইতালির ভিলা নোভা দে মিলফন্তেস এলাকায় বসবাস করতেন এবং স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন।একদিনের ব্যবধানে দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় পর্তুগালজুড়ে থাকা বাংলাদেশিদের মাঝে শোকের আবহ বিরাজ করছে।
জানা যায়, যারা প্রবাসের মাটিতে নিজে খেয়ে না খেয়ে, দেশের রেমিট্যান্সকে এগিয়ে নিতে জীবনযুদ্ধ করেন, সেই প্রবাসীরা মারা যাওয়ার পরও বাংলাদেশ দূতাবাস তথা রাষ্ট্রের যেনো মাথাব্যথা নেই।
দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনরা লাশের অপেক্ষা করেন। কিন্তু পর্তুগাল থেকে বাংলাদেশে লাশ পাঠাতে কমপক্ষে ১৫/২০ দিন কখনো মাসও পেরিয়ে যায়।
এদিকে গত ৩ ফেব্রুয়ারি মাথার ওপর সিমেন্টের বস্তা পড়ে কামরুল ইসলাম নামের যুবক নিহত হন। তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার হরিয়রপুর গ্রামের আব্দুল মালিকের ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে একটি সিমেন্টের বস্তা হঠাৎ চিটকে পড়ে তার মাথায় আঘাত হানে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এর আগে বিদায়ী বছর ২০২৫ সালের ১৩ জুন পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের পার্শ্ববর্তী শহর আলমাদাতে মাহবুব আলম নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশি দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন। স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৩ জুন) মধ্যরাতে এ ঘটনাটি ঘটে।
নিহত মাহবুব আলমের বাড়ি সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মানিককোনা ইউনিয়নে। তিনি পর্তুগালে আলমাদা শহরে একটি মুদি দোকানের ব্যবসা করতেন। তিনি দুই সন্তান এবং স্ত্রী নিয়ে পর্তুগালে বসবাস করতেন।
একই বছরের ১৮ অক্টোবর লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের বাসিন্দা প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম শফিক (৩৮) লিভারজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পর্তুগালের রাজধানী লিসবুনের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় প্রবাসে পাড়ি জমিয়ে সেখানেই নিভে গেল তার জীবনপ্রদীপ।
অপরদিকে ২৮ অক্টোবর পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের উপকণ্ঠে অবস্থিত কোস্টা দা কাপারিকায় শামীম হোসেন (৩৫) নামে এক বাংলাদেশিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। নিহত শামীমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
ঘটনাটি স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শামীম হোসেন একটি ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় কর্মরত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো তিনি সেদিনও নিজের সাইকেল নিয়ে কাজে যান। দোকানের সামনেই সাইকেলটি পার্কিং করে রাখার কিছুক্ষণ পর এক আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ব্যক্তি সাইকেলটি চুরি করে পালানোর চেষ্টা করেন।
পর্তুগালে বাংলাদেশি প্রবাসীর লাশ স্বল্প সময়ে দেশে পাঠানো এবং ব্যয়ভার বাংলাদেশ দূতাবাসকে বহন করার জোর দাবী জানান বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ‘বাইতুল মুকাররম মসজিদ’ লিসবনের প্রেসিডেন্ট রানা তসলিম উদ্দিন বলেন, প্রবাসীর লাশ যখন আমরা দেশে পাঠাই, তখন দেশের মানুষ মনে করে থাকেন যে, ওইখানে আমরা সরকার থেকে টাকা পেয়েছি। এছাড়া দেশের মানুষ মনে করেন যে, পর্তুগাল সরকার সব প্রসেস করেছে। কমিউনিটি যে কষ্ট করে পাঠাইছে এটা কেউ ভাবেন না। আমরা বার্ষিক একটি চাঁদা তোলার ব্যবস্থা করেছিলাম। যাতে কেউ মারা গেলে এই আদায়কৃত টাকা থেকে লাশ দেশে পাঠানোর খরচ বহন করতে পারি। কিছু লোক তখন বাঁধা দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছে কোনো দাবী আছে কিনা জানতে চাইলে রানা তসলিম উদ্দিন বলেন, আমরা নতুন, পুরাতন সব সরকারের কাছে সব সময় দাবী জানিয়ে আসছি এখানে (পর্তুগালে) কোনো প্রবাসী মারা গেলে সরকার যেনো পূর্ণ সহযোগিতা করে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ৪১ হাজার ৮৭৫ প্রবাসীর লাশ দেশে ফিরেছে। এরমধ্যে ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩, ২০২৩ সালে ৪ হাজার ৫৫২ জন, ২০২২ সালে ৩ হাজার ৯০৪ জন, ২০২১ সালে ৩ হাজার ৮১৮ জন, ২০২০ সালে ৩ হাজার ১৯ জন ও ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৩৪ জন, ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৫৭ জন, ২০১৭ সালে ২ হাজার ৯১৯ জন, ২০১৬ সালে ২ হাজার ৯৮৫ জন, ২০১৫ সালে ২ হাজার ৮৩১, ২০১৪ সালে ২ হাজার ৮৭২ এবং ২০১৩ সালে ৩ হাজার ৭৬ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে। মৃতদের সঙ্গে আসা নথিপত্র অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রবাসী মারা যান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত (ব্রেইন স্ট্রোক) কারণে। এদের একটা বড় অংশই মধ্যবসয়ী কিংবা তরুণ।
এছাড়াও হৃদরোগসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা কিংবা প্রতিপক্ষের হাতেও খুন হন বাংলাদেশিরা। তবে তরুণ কিংবা মধ্যবয়সে কেন এত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন সে বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো অনুসন্ধান হয়নি। একদিকে প্রতিকূল পরিবেশ, অন্যদিকে অমানুষিক পরিশ্রম, ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সব মিলিয়ে মানসিক চাপের কারণেই সাধারণত স্ট্রোক বা হৃদরাগের মতো ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১২ বছরে প্রবাসে ৪০ হাজার ৭১৩ কর্মীর মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৮১৩ কর্মীর মরদেহ। তাদের মধ্যে ৩১ শতাংশের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ১৬ শতাংশের মৃত্যু হয় দুর্ঘটনায়। আর ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করেন। ২৮ শতাংশের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। বাকিরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।মানুষ হিসেবে যাচ্ছেন একজন কর্মী, মারা গেলে ফিরে আসছেন কার্গো হয়ে। বিশ্বের সব দেশেই মৃতদেহকে কফিন হিসেবে কার্গোর মতো করে পরিবহন করা হয়।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। যাদের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রয়েছে তাদের সামান্য সুযোগ সুবিধা ও ন্যূনতম অধিকার আদায় করা হলে রেমিট্যান্সের গতি আরও বাড়বে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
পড়ুন- স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি: সালাহউদ্দিন আহমদ
দেখুন- ঈদে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধ করার নির্দেশ এমপি রনির


