২৭/০২/২০২৬, ২২:৩৫ অপরাহ্ণ
22.9 C
Dhaka
২৭/০২/২০২৬, ২২:৩৫ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

পাকিস্তান-আফগানিস্তানের বন্ধুত্ব যেভাবে যুদ্ধে রূপ নিল

পাক-আফগান সীমান্তের ডুরান্ড লাইনে পাকিস্তানের সেনাচৌকিতে হামলার পর আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ইসলামাবাদ। এরই ধারাবাহিকতায় ‘অপারেশন গজব-লিল হক’ নামে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত থেকে শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের তিন অঞ্চলে চালানো হয় ভয়াবহ বিমান হামলা।

পাকিস্তানের গণমাধ্যম বলছে, রাজধানী কাবুলসহ পাকতিকা ও কান্দাহারে চালানো হয়েছে এসব হামলা। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হামলায় ২৭০ আফগান তালেবান সদস্য নিহত হয়েছে বলে দাবি করে ইসলামাবাদ। পাশাপাশি বহু আফগান সেনা চৌকি দখলের তথ্যও জানায়। অপরদিকে আকাশপথে সক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় সীমান্তে সরাসরি পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে অন্তত ৫৫ পাক সেনাকে হত্যার দাবি করেছে কাবুল। তবে, উভয় দেশই নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

বিজ্ঞাপন


মূলত খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) এবং এ অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়ায় এবং পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে টার্গেট করে হামলা অব্যাহত থাকায় প্রতিশোধ হিসেবে এই অপারেশন চালাল পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি কড়া বার্তার মাধ্যমে আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ‘সরাসরি যুদ্ধের’ ঘোষণা দিয়েছেন। আফগান বাহিনীর হামলায় পাকিস্তানি সেনা হতাহত হওয়ার পর আফগানিস্তানের প্রধান শহরগুলোতে পাকিস্তানের সিরিজ বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে ঘোষণাটি দেন তিনি।

মূলত খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) এবং এ অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্ত্রাসী হামলা বাড়ার পাশাপাশি পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে টার্গেট করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান ও সমমনা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা অব্যাহত রয়েছে। এসব হামলায় আফগান তালেবান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে এমন অভিযোগ তুলে কাবুলকে বারবার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাগিদ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি, বরং পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা বেড়েছে।

গেল শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) খাইবার পাখতুনখোয়ার বান্নু জেলায় টিটিপি ও সমমনা গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান চালায় পাক নিরাপত্তা বাহিনী। ওই অভিযানের সময় ব্যাপক সংঘর্ষে লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহজাদা গুল ফারাজ (৪৩) ও সিপাহি কারামত শাহ (২৮) প্রাণ হারান।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাজাউর জেলায় এক হামলায় ১১ সেনা সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিযানটি চালানো হয়েছিল। ইসলামাবাদের অভিযোগ, গোষ্ঠীগুলোকে নিজ ভূখণ্ড ব্যবহারসহ নানাভাবে আফগানিস্তান সহায়তা করে থাকে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের, অভিযোগ রয়েছে ভারতও তাদের সহায়তা ও সমর্থন দিয়ে থাকে।

বড় সংখ্যায় সেনা নিহতের জেরে রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আফগানিস্তান সীমান্ত বরাবর বিমান হামলা চালায়। সে সময় পাকিস্তান দাবি করে, তাদের হামলায় অন্তত ৭০ জন তালেবান সদস্য নিহত হয়েছে। পরে এর জবাবে সীমান্ত এলাকায় পাল্টা হামলা চালায় আফগানিস্তান। কাবুলের দাবি, তাদের হামলায় নিহত হয় অন্তত ১৮ জন।


সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তান সীমান্তে দেশটির সামরিক বাহিনীর অবস্থানে আফগানিস্তান হামলা চালায়। এতে দুই পাক সেনা নিহত হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ হিসেবে সর্বশেষ বড় ধরনের এই অপারেশন শুরু করে পাকিস্তান। খাজা আসিফ বলেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন তোমাদের ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলো।’


গেল বছরও টিটিপির হামলায় বহু সেনা হারানোর জেরে সীমান্ত এলাকায় গোলা নিক্ষেপ এবং কাবুলে বিমান হামলা চালিয়েছিল ইসলামাবাদ। ১১ অক্টোবর চালানো হামলায় ২০০ আফগান তালেবান নিহতের দাবি করেছিল পাকিস্তান এবং পাল্টা হামলায় ৫৮ পাক সেনা নিহতের দাবি জানিয়েছিল তালেবান সরকার।

বরাবরই খাইবার পাখতুনখোয়ায় সবচেয়ে একটিভ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি নামের সশস্ত্র গোষ্ঠীটি পাকিস্তানের সেনাদের টার্গেট করে থাকে। অনেক সময় সশস্ত্র গেরিলা অভিযান ছাড়াও আত্মঘাতী হামলাও চালায় তারা।

ডনের খবরে বলা হয়, গেল বছরের শুরু থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট টিটিপি এবং তাদের সমমনা গোষ্ঠীগুলোর হামলায় ৩১১ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৭২ জন। সে বছর নিহত হয় ১৪০ জন পুলিশও।

পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (পিআইসিএসএস) জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে বিশেষ করে কেপি ও বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আর এর কেন্দ্রে রয়েছে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)।


সংস্থাটির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, টিটিপি ২০২২ সালের নভেম্বরে পাক সরকারের সঙ্গে করা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল করার পর থেকেই হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি পায় এবং আক্রমণ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয় গোষ্ঠীটি। শুধু গেল বছর আগস্টেই পাকিস্তানে ১৪৩টি সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে দেশটিতে, যা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী মাস। এর মধ্যে কেপিতেই হয়েছে ১০৬টি হামলা। এসব হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল পাক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।

পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সম্পর্ক এক সময় মধুর থাকলেও সেই সম্পর্ক এখন চরম বৈরিতাপূর্ণ। সীমান্তে দু’পক্ষের সাম্প্রতিক হামলা এবং ভারতকে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ বলে কাবুলের ঘোষণা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করেছে।


৭০-৮০-এর দশকে তালেবান তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেসময় তীব্র যুদ্ধে লিপ্ত ছিল রাশিয়া ও আফগানরা। বলা হয়ে থাকে সেসময় আফগানদের অস্ত্র, অর্থ, আশ্রয়সহ বিভিন্নভাবে সহায়তায় পাশে থেকেছিল পাকিস্তান। কিন্তু তালেবান প্রতিষ্ঠা এবং গোষ্ঠীটির আফগানিস্তান শাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ৯/১১-কে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয় কাবুল ও ওয়াশিংটনের মধ্যে। এই পরিস্থিতির কেন্দ্রে ছিল আল কায়েদা।


আল কায়েদা এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে মূলত ৯০-এর দশকে। রুশ হামলা প্রতিহত, আফগানিস্তানে তালেবান গঠন এবং সরকার পরিচালনায় বড় ভূমিকা রেখেছিল আল-কায়েদা এবং গোষ্ঠীটির নেতা ওসামা বিন লাদেন। কিন্তু ৯/১১-এ হামলায় সম্পৃক্তার অভিযোগ এন আফগানিস্তান ও লাদেনকে সরাসরি দায়ী করে দেশটিতে অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। মূলত তালেবান ও পাকিস্তানের সম্পর্কে তখনই ফাটল ধরা শুরু হয়। কারণ, আফগানিস্তানে অভিযান পরিচালনাসহ বিভিন্ন কাজে পাকিস্তান থেকে সহযোগিতা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এর জের ধরে ২০০৭ সালে তালেবানের পাকিস্তান শাখা টিটিপি গঠন করা হয়।

যদিও লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল পাকিস্তান। তারপরও এ সম্পর্ক আর উন্নতির দিকে যায়নি। বিশেষ করে ২০১১ সালে পাকিস্তান ভূখণ্ডে লুকিয়ে থাকা ওসামা বিন লাদেন পাক সরকারের সহায়তায় মার্কিন অভিযানে নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অনেকটা যুদ্ধ ঘোষণা করে আল কায়েদা এবং তার মিত্র টিটিপিসহ অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো। ওসামা বিন লাদেনের সংগঠন আল কায়েদার বক্তব্য এবং টিটিপির পাকিস্তানে অভিযানের মূল চেতনাকে লক্ষ্য করলে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া যায়।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আল কায়েদার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একটি বিদেশি ও কাফের শক্তি, কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোকে সহযোগিতা করে। আর এ কারণে ‘প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ’ হিসেবে তাদের প্রতিরোধ করা সমস্ত মুসলমানের জন্য প্রয়োজনীয়।’ এমন ফতোয়াকে বাস্তবে রূপ দিতেই টিটিপির জন্ম।

রয়টার্স বলছে, ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট হিসেবে টিটিপি গঠিত হয় পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ করার জন্য। তাদের বিশ্বাস, ‘পাকিস্তান সরকার অবৈধ, কারণ দেশটি আফগানিস্তানে ন্যাটো এবং আমেরিকানদের সাহায্য করেছে ও করছে।’ এমনকি পাকিস্তানের সংসদ এবং সংবিধান অনৈসলামিক এবং একটি ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের এই ভিত্তি প্রত্যাখ্যান করেন তারা।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তান দুইটি আলাদা দেশ হলেও খাইবার পাখতুনখোয়ার পস্তুন জাতিগোষ্ঠী তালেবানের মতাদর্শে প্রবল আকৃষ্ট। এর কারণ, আফগান তালেবানদের অনেকেই একই জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া এই এলাকাকে তারা আলাদা দেশ হিসেবেও কল্পনা করেন না। ফলে একদিকে পাক সেনাদের প্রতি প্রতিশোধ অন্যদিকে নিজেদের জাতিগত ও ধর্মীয় অস্তিত্ব রক্ষায় টিটিপি, তালেবান কিংবা আল কায়দা সংঘবদ্ধ হয়ে এ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

টিটিপির সঙ্গে তালেবানের সখ্যতা ছাড়াও ভারতের সঙ্গে নতুন করে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠাও কাবুল-ইসলামাবাদের মধ্যকার সম্পর্কে আরও ফাটল ধরিয়েছে। পাক-আফগান সীমান্তে গেল বছর অক্টোবরে সংঘাতের সময় ভারতে প্রথমবারের মতো সফরে ছিলেন তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। সেখান থেকে তিনি একাধারে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অন্যদিকে ভারতকে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার সফর এবং সেই বক্তব্য দুইদেশের মধ্যকার উত্তেজনার পারদকে আরও বাড়িয়েছে।

তবে ভারত ও তালেবানের সম্পর্ক বন্ধুত্ব নয়, বরং কৌশলগত যোগাযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এটি আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও শরণার্থী কেন্দ্রিক যোগাযোগ। এক সময় রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দশকের যুদ্ধে সেই রাশিয়াকেই পাশে পেয়েছিল তালেবান। আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত ও তালেবানের ভারতের সঙ্গে আঁতাত এখন পাকিস্তানকে উভয় সংকটে ফেলেছে। এর ফলে হয়তো তালেবান যেভাবে রাশিয়ার সহযোগিতায় আফগানিস্তানে তাদের লক্ষ্য পূরণ করেছে, তেমনিভাবে ভারতের সমর্থনে পাকিস্তানেও লক্ষ্য পূরণের চেষ্টায় রয়েছে বলে ধারণা অনেকের।

পড়ুন : পাকিস্তান-আফগানিস্তান: সামরিক শক্তিতে কে এগিয়ে?

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন