ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোটকে সামনে রেখে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছে। খুলনা মহানগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বিভাজক ও ইউনিপোলে ফেস্টুন টাঙানো, মাইকিং, লিফলেট বিতরণসহ বহুমাত্রিক প্রচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কেসিসি সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত ৫০ হাজার লিফলেট ছাপানো হয়েছে। সামনে আরও এক হাজার ৮০০টি শার্ট তৈরি, সাইকেল র্যালি, বিলবোর্ড ও ইউনিপোল স্থাপন, ৩১টি ওয়ার্ডে উঠান বৈঠক ও কমিউনিটি সভাসহ মোট ১৫ ধরনের প্রচার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে এই প্রচারের অর্থায়ন নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। কেসিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে সংস্থাটির নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখ আট হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। এই রাজস্ব তহবিলের বড় অংশ আসে নগরবাসীর দেওয়া পৌরকর ও ট্রেড লাইসেন্স ফি থেকে।
একই নির্দেশনার আলোকে জেলা তথ্য অফিসও গণভোটের পক্ষে প্রচারে নেমেছে। বিভাগীয় তথ্য অফিসের পরিচালক গাজী জাকির হোসেন জানান, সরকারি তহবিল থেকেই এ প্রচারের ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এক লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা আরও বাড়বে বলে তিনি জানান।
এদিকে দেশের সব জেলা পরিষদের প্রশাসকদেরও গণভোটের প্রচারে অংশ নিতে চিঠি দেওয়া হলেও অর্থ সংকটে খুলনা জেলা পরিষদ এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, জনগণের দেওয়া পৌরকর দিয়ে রাজনৈতিক বা ভোটসংক্রান্ত প্রচার চালানো নৈতিক ও আইনগত প্রশ্ন তৈরি করছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের খুলনা জেলা সম্পাদক কুদরত ই খুদা বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে আমি হ্যাঁ ভোটের পক্ষে। কিন্তু নাগরিকদের সেবা প্রদানের শর্তে আদায় করা অর্থ এভাবে প্রচারে ব্যয় করা গ্রহণযোগ্য নয়। নগরীর ভাঙা সড়ক, অচল বাতি ও ফুটপাত সংস্কার না করে ভোটের প্রচারে করের টাকা খরচ করা অনুচিত।”
খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, “সরকার বা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো উচিত নয়। নাগরিক সেবার অর্থ নির্বাচনী প্রচারে ব্যয় করা একটি খারাপ দৃষ্টান্ত।”
স্থানীয় সরকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ও ব্যয়ের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট। আইনটির তৃতীয় তপশিলে জনস্বাস্থ্য, সড়ক সংস্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতিসহ ২৮টি সেবামূলক কাজের কথা বলা হয়েছে। নাগরিক সমাজের মতে, এসব সেবার জন্য আদায় করা অর্থ অন্য খাতে ব্যয় আইনটির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাজিব আহমেদ বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই এই প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আলাদা বরাদ্দ না থাকায় কেসিসির নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এই প্রচারও জনস্বার্থে। মানুষ গণভোট সম্পর্কে জানলে তবেই তারা সচেতনভাবে মতামত দিতে পারবে।”
তবে নির্দেশনা ও বাস্তবতার এই ব্যবধান, আর পৌরকরের অর্থ ব্যবহারের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে খুলনায় গণভোটের প্রচার এখন প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
পড়ুন : খুবিতে আন্তঃডিসিপ্লিন ক্রিকেটে ইসিই ও এসটিএটি ডিসিপ্লিনের জয়


