প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েই প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে এককভাবে সরকার গঠনের এখতিয়ার নিশ্চিত করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। এ সুবাদে দলীয় প্রধান হিসাবে তারেক রহমানই হবেন প্রধানমন্ত্রী। অপরদিকে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার দেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেন কোটি কোটি ভোটার। যেখানে গড়ে ভোট প্রদানের হার ছিল প্রায় ৬২ শতাংশ। সংঘাত-সহিংসতার নানা পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে দেশব্যাপী একদিনে অনেকটা ঈদ উৎসবের মেজাজে বহুল প্রত্যাশিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কোনো আসনের পূর্ণাঙ্গ বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করতে পারেনি। তবে সারা দেশের প্রতিটি আসন থেকে নাগরিকের প্রতিনিধিদের পাঠানো সর্বশেষ সংবাদ এবং দলীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বিএনপির বিজয় নিশ্চিত হয়েছে ২০৪টি আসনে। এছাড়া জয়ের পথে এগিয়ে আছে আরও কয়েকটি আসনে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৫০টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৯টি, বরিশাল বিভাগে ১৭টি, ময়মনসিংহে ১৮টি, সিলেটে ১৭টি, রংপুরে ১৪টি, রাজশাহীতে ২৮টি এবং খুলনা বিভাগে ১১টি।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট জয়লাভ করেছে ৫৮টি আসনে। জয়ের পথে এগিয়ে আছে আরও কয়েকটি আসনে। তবে এসব ফলাফলের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যারা যে আসনে জয়লাভ করেছেন :
বিএনপি : ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ঠাকুরগাঁও-১ মির্জা ফখরুল ইসলাম আগমগীর, কক্সবাজার-১ সালাহউদ্দিন আহমদ, দিনাজপুর-১ মো. মনজুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-৬ ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, সুনামগঞ্জ-২ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-৩ মোহাম্মদ কয়সর আহমেদ, সুনামগঞ্জ-৪ নুরুল ইসলাম, সুনামগঞ্জ-৫ কলিম উদ্দিন মিলন, পঞ্চগড়-১ ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নওশাদ জমির, সিলেট-১ খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চৌধুরী, সিলেট-২ তাহসিনা রুশদী লুনা, সিলেট-৩ এমএ মালিক, সিলেট-৪ আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট-৬ এমরান আহমেদ চৌধুরী, ঝালকাঠি-১ রফিকুল ইসলাম জামাল, ঝালকাঠি-২ ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, সিরাজগঞ্জ-২ ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সিরাজগঞ্জ-৩ আইনুল হক, সিরাজগঞ্জ-৫ মো. আমিরুল ইসলাম খান, সিরাজগঞ্জ-৬ এমএ মুহিত, মানিকগঞ্জ-১ এসএম জিন্নাহ কবির, মানিকগঞ্জ-২ মঈনুল ইসলাম খান, মানিকগঞ্জ-৩ আফরোজা খানম রিতা, খাগড়াছড়ি ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাজবাড়ী-২ হারুন অর রশীদ, নেত্রকোনা-১ ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, নেত্রকোনা-২ মো. আনোয়ারুল হক, নেত্রকোনা-৩ রফিকুল ইসলাম হিলালী, নেত্রকোনা-৪ মো. লুৎফুজ্জামান বাবর, হবিগঞ্জ-১ ড. রেজা কিবরিয়া, হবিগঞ্জ-২ আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন, হবিগঞ্জ-৩ জিকে গউস, হবিগঞ্জ-৪ সৈয়দ মো. ফয়সাল, কুষ্টিয়া-১ রেজা আহমেদ, মাগুরা-১ মো. মনোয়ার হোসেন, মাগুরা-২ নিতাই রায় চৌধুরী, ঝিনাইদহ-১ মো. আসাদুজ্জামান, সুনামগঞ্জ-১ কামরুজ্জামান কামরুল, জামালপুর-১ এম রশিদুল জামান মিল্লাদ, জামালপুর-৪ মো. ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম, জামালপুর-৫ শাহ মো. ওয়ারেস আলী মামুন, পটুয়াখালী-১ আলতাফ হোসেন চৌধুরী, পটুয়াখালী-৪ এবিএম মোশাররফ হোসেন, নড়াইল-১ বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, বরিশাল-২ সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু, বরিশাল-৫ মজিবর রহমান সরোয়ার, জয়পুরহাট-২ মো. আবদুল বারি, খুলনা-১ আমির এজাজ খান, কুমিল্লা-১ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, কুমিল্লা-২ অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৩ কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, কুমিল্লা-৫ মো. জসিম উদ্দিন, কুমিল্লা-৬ মনিরুল হক চৌধুরী, কুমিল্লা-৮ জাকারিয়া তাহের, কুমিল্লা-৯ মো. আবুল কালাম, কুমিল্লা-১০ মোবাশ্বর আলম ভূঁইয়া, নোয়াখালী-১ এমএ মাহবুব উদ্দিন, নোয়াখালী-২ জয়নুল আবদিন ফারুক, নোয়াখালী-৩ মো. বরকতউল্লা ভুলু, নোয়াখালী-৪ মো. শাহজাহান, নোয়াখালী-৫ মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, ফেনী-১ রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ জয়নাল আবদিন, ফেনী-৩ আব্দুল আউয়াল মিন্টু, কক্সবাজার-২ আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ, কক্সবাজার-৩ লুৎফুর রহমান কাজল, কক্সবাজার-৪ শাহজাহান চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ এমএ হান্নান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ মো. খালেদ হোসেন মাহবুব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ মুশফিকুর রহমান, লক্ষ্মীপুর-১ শাহাদাত হোসেন সেলিম, লক্ষ্মীপুর-২ আবুল খায়ের ভূইয়া, লক্ষ্মীপুর-৩ শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি, লক্ষ্মীপুর-৪ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, ভোলা-২ হাফিজ ইব্রাহীম, ভোলা-৩ মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ভোলা-৪ নুরুল ইসলাম নয়ন, যশোর-৩ অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কিশোরগঞ্জ-১ মাজহারুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-২ মো. জালাল উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ-৩ ড. ওসমান ফারুক, কিশোরগঞ্জ-৪ অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-৬ শরীফুল আলম।
বিএনপির মিত্র : ভোলা-১ আন্দালিব রহমান পার্থ (বিজেপি), পটুয়াখালী-৩ নুরুল হক নুর (গণঅধিকার), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ জোনায়েদ সাকি (গণসংহতি), ঢাকা-৬ ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন।
স্বতন্ত্র : ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, কুমিল্লা-৭ আতিকুল আলম শাওন, কিশোরগঞ্জ-৫ শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল।
জামায়াত : মেহেরপুর-১ মাওলানা মো. তাজউদ্দিন খান, মেহেরপুর-২ নাজমুল হুদা, সাতক্ষীরা-৪ জিএম নজরুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা-১ অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল, চুয়াডাঙ্গা-২ অ্যাডভোকেট মো. রুহুল আমিন, খুলনা-৬ আবুল কালাম আজাদ, খুলনা-২ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, কুষ্টিয়া-২ মো. আবদুল গফুর, কুষ্টিয়া-৩ মো. আমির হামজা, কুষ্টিয়া-৪ মো. আফজাল হোসেন, রংপুর-১ অধ্যাপক রায়হান সিরাজী, রংপুর-২ এটিএম আজহারুল ইসলাম, গাইবান্ধা-১ মো. মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-২ মো. আবদুল করিম, পটুয়াখালী-২ মো. শফিকুল ইসলাম, নড়াইল-২ মো. আতাউর রহমান, জয়পুরহাট-১ মো. ফজলুর রহমান সাঈদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ মো. কেরামত আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ মু. মিজানুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ মো. নুরুল ইসলাম, কুমিল্লা-১১ ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, ঝিনাইদহ-৪ আবু তালিব, যশোর-২ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ।
জামায়াত জোট : কুমিল্লা-৪ হাসনাত আব্দুল্লাহ (এনসিপি), নোয়াখালী-৬ আব্দুল হান্নান মাসউদ (এনসিপি)।
এদিকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়াই বৃহস্পতিবার শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ২৯৯ আসনের ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। একই সঙ্গে হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও তাদের রায় জানাতে পেরেছেন। সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিয়ে নানা ধরনের শঙ্কা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও সরকার, নির্বাচন কমিশন (ইসি), প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অদম্য কঠোর অবস্থানের কারণে বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটেনি। ইসির আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের তথ্য অনুযায়ী গতকাল ২৯টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ১৩৫ জন আহত হন। কয়েকটি কেন্দ্রে ব্যালট ছিনতাই ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটে।
নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি জানিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো। যদিও দলগুলোর প্রার্থীদের কেউ কেউ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় গণমাধ্যমের কাছে কিছু অনিয়মের অভিযোগও তুলে ধরেন। কিছু ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের কেউ কেউ গিয়ে দেখতে পান তাদের ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এসব বিষয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে আমলে নেয়।
এদিকে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর করতে সহযোগিতা করায় সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক, ভোটারসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ায় আজ (শুক্রবার) সব মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ প্রার্থনা আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশেষ প্রেক্ষাপটে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। ইতিহাসে এই প্রথম সংসদ ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় ভোটারদের বিশেষ আগ্রহ ছিল। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পাঁচ শতাধিক বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে এসেছেন। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিশ্রুতি ছিল ইতিহাসের একটি শ্রেষ্ঠ নির্বাচন আয়োজন করা। গতকালের ভোটে সরকারপ্রধানের এ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে বলে অনেকে মনে করেন।
পোস্টাল ব্যালট পৌনে ১১ লাখ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ভোট দিয়েছেন ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন, যা নিবন্ধনের হার ৮০ দশমিক ১১ শতাংশ। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯২, যা মোট প্রদত্ত ভোটের ৭৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তারা গ্রহণ করেছে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭টি, যা বৈধ ভোটের হার ৭০ দশমিক ২৫ শতাংশ। প্রসঙ্গত : ভোট দেওয়ার জন্য প্রবাস ও দেশের অভ্যন্তর থেকে ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন ভোটার নিবন্ধন করেন।
নির্বাচন কমিশনে যত অভিযোগ : বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণকালে ইসিতে বড় ধরনের অভিযোগ নিয়ে আসেনি কোনো রাজনৈতিক দল। তবে দুপুরের পর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে মাত্র তিনটি আসনের কয়েকটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিতসহ কিছু দাবি নিয়ে ইসিতে আসে। বিকালের দিকে ইসলামী আন্দোলন ইসির কাছে চারটি আসনের কয়েকটি কেন্দ্রের বিষয়ে অভিযোগ তোলেন। তবে অন্যতম প্রধান দল বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের ইসিতে দেখা যায়নি।
দুপুর আড়াইটার দিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নেতারা ইসিতে আসেন। এ সময় তারা কুমিল্লা-৮, শরীয়তপুর-২ ও পটুয়াখালী-১ আসনের বহু কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে অভিযোগ করে ভোটগ্রহণ স্থগিতের দাবি জানান। আধা ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক শেষে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল সাংবাদিকদের জানান, লিখিত আবেদন, শতাধিক ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। কমিশন বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়, কুমিল্লা-৮ আসনে ভোট শুরুর কিছুক্ষণ পর থেকেই প্রায় ৩০টি কেন্দ্র থেকে তাদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়। এ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ হেলাল উদ্দিন শফিকুল আলম হেলাল লিখিতভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিতের আবেদন করেছেন বলেও জানানো হয়। শরীয়তপুর-২ আসনের ৩৯টি কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি তাদের। পটুয়াখালী-১ আসনেও একাধিক কেন্দ্রে এজেন্টদের বাধা দেওয়া ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ রয়েছে বলে জোটের প্রতিনিধিরা জানান। তাদের দাবি, এসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে হয়নি।
এছাড়া নরসিংদী-৪ (বেলাব), টাঙ্গাইলের গোপালপুর ও ভুয়াপুর, নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া), ঝালকাঠি ও বরগুনার পাথরঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনিয়ম ও সহিংসতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। বেলাব পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক সিল মারার অভিযোগ আনা হয়। টাঙ্গাইলের কয়েকটি কেন্দ্রে এজেন্টদের বের করে দেওয়ার কথাও বলা হয়।
নোয়াখালীর হাতিয়ায় গত রাত থেকে সহিংসতার ঘটনায় এক প্রার্থীর ভাই আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। পাশাপাশি এবি পার্টির সভাপতি ও ১১ দলীয় জোটের নেতা মুজিবুর রহমান মঞ্জুর গাড়িবহরে হামলার অভিযোগও তুলে ধরা হয়। জোটের নেতারা বলেন, ‘দেশবাসী একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করে। আমরা আশা করছি, নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে, যাতে চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে কোনো পক্ষ প্রশ্ন তুলতে না পারে।’
অপরদিকে পটুয়াখালী-১, নোয়াখালী-১, ভোলা-১ ও নরসিংদী-৫ আসনের বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ইসিতে আসেন ইসলামী আন্দোলন। এছাড়া অনিয়মের অভিযোগ এনে পটুয়াখালী-১ আসনের দুটি ইউনিয়নের সব কেন্দ্রের ভোট বাতিল চেয়েছে দলটি।
দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, নোয়াখালী-১ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাতপাখার প্রার্থী জহিরুল ইসলামের ওপর মহুরুগঞ্জ এলাকায় হামলা হয়েছে। এতে প্রার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন। এ হামলার সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ তাদের। ভোলা-১ আসনে দলের প্রার্থীর প্রধান এজেন্ট ও সেন্টারের পোলিং এজেন্টের ওপর হামলা হয়েছে। একই আসনের ভেদুরিয়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড ব্যাংকের হাটবালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মহিলা ভোটারদের জোরপূর্বক দাড়িপাল্লায় ভোট দিতে বাধ্য করেছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। পটুয়াখালী-১ আসনে মির্জাগঞ্জ উপজেলার আমগাছি ও মাদবখালী ইউনিয়নের সব সেন্টার থেকে হাতপাখার পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। নরসিংদী-৫ আসনে রায়পুরার মির্জানগর ইউনিয়নের ভোটকেন্দ্র রায়পুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে হাতপাখার পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়ে প্রশাসনের সামনে বিএনপি জাল ভোট দিয়েছে বলে দাবি করে ইসলামী আন্দোলন।
ভোটের হার ও অভিযোগ নিয়ে ইসির ব্রিফিং : ভোটগ্রহণ নিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ইসির পক্ষ থেকে দুই দফা ব্রিফ করেন সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তবে দুবারই সব কেন্দ্রের ভোট পড়ার হার জানাতে পারেনি তারা। বিকাল ৪টার পরে ৩৬ হাজার ৩১ কেন্দ্রের ভোটগ্রহণের হার নিয়ে কথা বলেন ইসি সচিব। তিনি জানান, দুপুর ২টা পর্যন্ত ওই সব কেন্দ্রে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর আগে তিনি জানান, দুপুর ১২টা পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের হার ৩২ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
তিনটি আসনের প্রায় শতাধিক কেন্দ্রে ভোট বন্ধে জামায়াতের দাবি প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, ভোট বন্ধের সুযোগ আছে কিনা তা নিয়ে প্রমাণের আগে আগাম বলা উচিত না। এ বিষয়ে আগাম মন্তব্য করলে মানুষ বিভ্রান্ত হবে। অভিযোগ খতিয়ে দেখে রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জানামতে কোনো ভোটকেন্দ্রের ভোট স্থগিত হয়নি। কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও তা স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। এটা আমি নিশ্চিত করেছি। ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছে জানিয়ে ইসি সচিব বলেন, ভোটারদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বাকিরা ভোটে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করছি।
ফিরে দেখা : চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এমন একটি ভোটের জন্য দেশের মানুষ অনেক দিন ধরে উন্মুখ হয়ে ছিল। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনে গণতন্ত্রকামী দেশের বেশির ভাগ মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তাদের কাছে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট ছিল বহুল প্রত্যাশিত এক পরম পাওয়া। বেশির ভাগ ভোটার নির্বিঘ্নে ঈদ আনন্দের মতো অন্যান্য ভোট উৎসব উপভোগ করেছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া এমন শান্তিপূর্ণ অবাধ নির্বাচন দেশ স্বাধীনের পর আর কোনো জাতীয় নির্বাচনে দেখা যায়নি। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসের পাতায় মাইলফলক হয়ে থাকবে। বহুকাল এ অভূতপূর্ব শান্তিপূর্ণ ভোটকে মানুষ দৃষ্টান্ত হিসাবে তুলে ধরবে।
আওয়ামী দুঃশাসনের টানা ১৫ বছরে অন্যতম রাজনৈতিক বিরোধী শিবির হিসাবে সবচেয়ে বেশি জেল-জুলুম ও হামলা-মামলার শিকার হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের লাখ লাখ নেতাকর্মী। অনেকে মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। বাড়ি-ঘর ছেড়ে মাসের পর মাস ফেরারি জীবন বেছে নিতে হয়। সেই দুঃসহ স্মৃতি যাদের সারাক্ষণ তাড়া করে ফেরে, তাদের কাছে এই ভোট বড় এক নিয়ামক।
এবারের এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০০১ সালের পর আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণ করতে যাচ্ছে বিএনপি। ইসির তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের ওই নির্বাচনে বিএনপি ১৯৫টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল। তখন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে জামায়াত ১৭টি আসন পেয়েছিল। এরপর ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও সরকার গঠন করতে পারেনি। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্র্বাচনে দলটি অংশ নেয়নি। যদিও ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নানাভাবে বিতর্কিত। এর মধ্যে ২০১৪ ও ২০২৪-এর ভোটারবিহীন একতরফা ও আমি-ডামি নির্বাচন ছাড়াও ২০১৮ সালের রাতের ভোট ছিল এক কলঙ্কিত অধ্যায়।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

