১১/০২/২০২৬, ২১:৫০ অপরাহ্ণ
20 C
Dhaka
১১/০২/২০২৬, ২১:৫০ অপরাহ্ণ
বিজ্ঞাপন

ফরিদপুরে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা আ.লীগ নেত্রীর

ফরিদপুরের সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সদ্য নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ঝর্না হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গর্হিত অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তিনি জমি ও বাড়ি দখলের জন্য ভারতীয় এক নাগরিককে এদেশের নাগরিক সাজিয়ে জেলা প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে অর্পিত সম্পত্তিকে ব্যক্তির সম্পত্তি রূপান্তর করে নেপথ্যে থেকে তা দখলের চেষ্টা করছে। এমনকি বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন ছাত্রলীগের মাধ্যমে বহু ছাত্র-ছাত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। একাধিক পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রতিকারের জন্য একাধিক মামলা হলেও ঝর্ণা হাসানকে বিচারের আওতায় আনতে পারছে না কেউ।

জমি ও বাড়ি দখলের ঘটনায় সম্পত্তি ভোগদখলকারী ফরিদপুর শহরের কোতোয়ালী থানাধীন দক্ষিন আলীপুরের বাসিন্দা অচিন্ত কুমার চক্রবর্তী, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী গং ফরিদপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে সম্প্রতি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় বিবাদী করা হয়েছে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ফরিদপুর পৌরসভার তহশীলদার ও বীরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী নামের এক দৈত নাগরিককে। জমির হাতবদল হয়ে বিক্রি করে যাতে ভারতীয় নাগরিক পালিয়ে যেতে না পারেন তার জন্য একই আদালতে স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদনও করা হয়েছে যা ৪ টি ধার্য্য তারিখ অতিক্রান্ত হলেও আদালত থেকে কোন প্রকার নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে স্থানীয় সুবিধাবাদী কয়েকজন প্রভাবশালী লোকের মাধ্যমে ঝর্না হাসান ও বীরেশ চন্দ্র জমি ভরাট, বিভিন্ন ক্রেতার কাছে জমি দেখানো সহ ৫৪ বছর ধরে জমিতে বসবাসকারী কয়েকটি সংখ্যালঘু পরিবারকে উৎখাতের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।

জানা যায়, দক্ষিন আলীপুরের ২২ শতাংশ জমি অর্পিত সম্পত্তি হলেও সেটিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি করার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালীরা চেষ্টা চালাচ্ছেন। ২০০০ সালে ফরিদপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকার সময় আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা হাসিবুল হাসান লাভলু ওই জমি ও বাড়ি দখলের চেষ্টা করেন। তিনি কাগজপত্র গায়েব করে দিয়ে নিজের নামে রেকর্ডও করে নেন। ২০০৮ সালে তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ঝর্না হাসান ওই জমির উপর চোখ দেন। গত বছর ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ঝর্না হাসান পলাতক। কিন্তু পলাতক থেকেও বর্তমান জেলা প্রশাসনকে ব্যবহার করে ওই জমির দখলের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৫৪ বছর ধরে ওই জমির উপর বাড়ি করে থাকা দুটো হিন্দু পরিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

ফরিদপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, ফরিদপুরের কতোয়ালী থানাধীন আলীপুর মৌজার আরএস ৫৬৯ নম্বর খতিয়ানভুক্ত আরএস ৩১২৭ নম্বর দাগের ২২ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন দীনেশ চন্দ্র সমাদ্দার। তিনি স¡াধীনতার আগে সম্পত্তি রেখে ভারতে চলে যান। ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহন করে স্থায়ীভাবে বসবাস করায় এবং আর কখনো এ দেশে ফিরে না আসার সুযোগে দীনেশ চন্দ্র সমাদ্দারের বাড়ির গৃহকর্মী ননীবালা দেবী এসএ রেকর্ডে তার নামে করে নেন জমিটি। পরবর্তী সময়ে ফরিদপুরের ডেপুটি কমিশনার ননীবালা দেবীকে নালিশী সম্পত্তি কিভাবে নিজ নামে এসএ রেকর্ড করালেন সে জন্য কারণ দর্শানোসহ দলিল দস্তাবেজসহ তার কার্যালয়ে হাজির হতে নোটিশ দেন। ননীবালা ডেপুটি কমিশনের আদালতে হাজির হলেও এসএ রেকর্ড ননীবালার নামে করানোর পক্ষে কোন কাগজপত্র বা উপযুক্ত দলিল দস্তাবেজ হাজির করতে না পারায় ডেপুটি কমিশনার নালিশি সম্পত্তির বাবদে ননীবালা দেবীর নামিয় এসএ ৫৩২ নম্বর খতিয়ান কর্তন করে নালিশি জমিকে অর্পিত অনাগরিক সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন।

পরবর্তী সময়ে দেশ স্বাধীন হলে সরকার অর্পিত অনাগরিক সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করে অচিন্ত কুমার চক্রবর্তীর নামে ৫.২৫ শতাংশ এবং অন্যান্য বাদী ও তাদের আত্মীয়দের নামে বাকি সম্পত্তি সরকার লীজ প্রদান করে। এর পর থেকে তারা খাজনা দিয়ে আসছেন। তারা ওই জমিতে বাড়িঘর তৈরি এবং বৃক্ষ রোপন করেন। পরবর্তী সময়ে ননী বালা ওই সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি নয় ও নিজের সম্পত্তি দাবি করে ফরিদপুরের প্রথম সাব জজ আদালতে দেঃ ৮৯/১৯৭৯ নং মোকদ্দমা দায়ের করেন। দুই পক্ষের শুনানী শেষে আদালত মামলাটি ডিসমিস করে দেয়। পরে ননী বালা দেবী এ রায়ের বিরুদ্ধে ফরিদপুরের জেলা জজ আদালতে আপীল মোকদ্দমা করলেও তিনি পরাজিত হন। পরবর্তী সময়ে ফরিদপুরের পৌরসভার চেয়ারম্যান হাসিবুল হাসান লাভলুর যোগসাজসে জরিপ কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের দিয়ে ভারতের নাগরিক বীরেশ চন্দ্র চক্রবর্তীর নামে এদেশের ভুয়া জাতীয় পরিচয় পত্র বানিয়ে ননী বালা দেবীর মিথ্যা ওয়ারিশ সাজিয়ে ফরিদপুরে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে ভুল বুঝিয়ে এসএ রেকর্ডীয় মালিকের ভুয়া ওয়ারিশ দেখিয়ে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালত থেকে ডিক্রি লাভ করে। ডিক্রি পেয়ে এ সম্পত্তি বিক্রি করে বীরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী যাতে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য গত ২০ মার্চ সহকারী কমিশনার ভূমিকে এই সম্পত্তি বীরেশের নামে নামপত্তন না করতে নিষেধমূলক নিষেধাজ্ঞা প্রদান ও তদন্ত করে কার্যক্রম গ্রহনের জন্য বাদীরা প্রস্তাব করেন। কিন্তু সহকারী কমিশনার কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করায় বাদীরা আদালতে মামলা করতে বাধ্য হন।

বাদীদের একজন কালের কণ্ঠকে জানান, ওই জমির মালিক ছিলেন দিনেস চন্দ্র সমাদ্দার নামের একজন। তিনি স্বাধীনতার আগে ভারতে চলে যান। পরে তার সম্পত্তি দেখাশোনা করেন তার কাজের মহিলা ননী বালা। জমি রেকর্ড করার সময় ননী বালা তার নামে এসএ রেকর্ড করে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৮ সালে এ জমিটি সরকার অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এবং বাদীদের কাছে লীজ দেয়। তিনি বলেন, সরকারের জমি অন্য কেউ দখল করে নেবে সেটা মানবো না। আমরা ৫৪ বছর ধরে সরকারি সম্পত্তি পাহারা দিচ্ছি।

এই জমির বিষয়টি নিয়ে ২০১৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনও তদন্ত করে। কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, বর্ণিত জমিতে হাসিবুল হাসান লাভলু (বর্তমানে মৃত) সাবেক চেয়ারম্যান ফরিদপুর পৌরসভা, ননী বালা দেবী কর্তৃক আম মোক্তার নিযুক্ত হন ও উক্ত জমি দীর্ঘদিন তার ভোগ দখলে ছিল এবং বর্তমানে তার ওয়ারিশদের ভোগ দখলে রয়েছে। ভিপি/ হাল জরিপে বর্ণিত জমি হাসিবুল হাসান লাভলুর নামে রেকর্ড করা হয়। বর্ণিত জমি বিজ্ঞ আদালতের রায়ে ‘ভেস্টেট প্রপার্টি’ মর্মে উল্লেখ করা হলেও উক্ত জমি কখনই ভিপি সম্পত্তির তালিকাভুক্ত ছিল না এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন (সংশোধন) আইন-২০১১ মোতাবেক প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের ‘ক’ ও ‘খ’ তফশীলভুক্ত সম্পত্তি হিসেবে প্রকাশিত হয়নি। উল্লিখিত জমির মূল মালিক ১৯৬৫ সালে দেশ ত্যাগ করার কারনে তা ‘ভেস্টেট প্রপার্টি’ বা ‘নন রেসিডেন্ট প্রপার্টি’ বলে গণ্য হবে। উল্লেখিত জমি হাসিবুল হাসান লাভলু (বর্তমানে মৃত) এর পক্ষে বর্তমানে তার ওয়ারিশ গনের নামে যেভাবে জরিপে রেকর্ড হয়েছে তা অবৈধ মর্মে প্রতীয়মান হয়।

এক বাদীর অভিযোগ এসিল্যন্ড শফিকুল ইসলামের সঙ্গে ঝর্ণা হাসানের যোগ সাজসে ভারতীয় নাগরিক বীরেশ চন্দ্রের নামে জমিটি নামজারির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তার ধারনা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এ.সি ল্যাণ্ড আবার এর সাথে স্থানীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবির আহমেদের সংশ্লিষ্টতার কিছু তথ্য দিয়েছেন। সব মিলিয়ে এটি যে একটি জনস্বার্থ বিরোধী ঘটনা ঘটছে তা জনমনে বিশ্বাস তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন: ফরিদপুরে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রস্তুতিসভা অনুষ্ঠিত

দেখুন: ম*রতে বসেছে ফরিদপুরের কুমার নদ

এস

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন