ভোটের দিন শুধু একটি তারিখ নয়–সেদিনই নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগ্য, বদলে যায় রাজনীতির মানচিত্র। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪–১২টি সংসদ নির্বাচন পেরিয়ে বাংলাদেশ দেখেছে ক্ষমতার উত্থান-পতনের নাটকীয় পালাবদল। কোনো ভোট ছিল বিজয়ের উল্লাসে মুখর, কোনোটি সহিংসতার আতঙ্কে আচ্ছন্ন। কোথাও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন নাগরিকরা, কোথাও ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্ধারিত হয়েছে ফল। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দেশ যখন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে, তখন অতীতের এই ১২টি নির্বাচনের ব্যবচ্ছেদ আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
গত ১২টি সংসদ নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায়, মঙ্গল, শুক্র বা শনিবারে কখনোই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ক্ষমতার লড়াই সীমাবদ্ধ থেকেছে কেবল রবি, সোম, বুধ আর বৃহস্পতিবারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট হয়েছে বুধ ও রোববারে। দিন-তারিখ, বার, বিজয়ী দল ও রাজনৈতিক বাস্তবতা–সব মিলিয়ে নির্বাচনী ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হলো এই প্রতিবেদনে।
প্রথম সংসদ নির্বাচন (১৯৭৩): সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ, বুধবার প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি মো. ইদ্রিস। দলীয় সরকারের অধীনে হওয়া এই নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও বিরোধী দলগুলো বিচ্ছিন্নভাবে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল। নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধু ২৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেন। তবে মাত্র আড়াই বছরের মাথায় ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডিতে এই সংসদ ভেঙে যায়।
দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৭৯): ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, রোববার অনুষ্ঠিত হয় দেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল অন্য সব নির্বাচনের চেয়ে ভিন্ন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশে দীর্ঘ সময় সংসদীয় গণতন্ত্র অনুপস্থিত ছিল এবং দেশ সামরিক শাসনের অধীনে চলে গিয়েছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক পোশাক ত্যাগ করে রাজনীতিতে নামেন এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। তার লক্ষ্য ছিল সামরিক শাসন তুলে দিয়ে একটি নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে বেসামরিক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলামের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। নির্বাচনে বড় ধরনের প্রাণহানি না ঘটলেও সামরিক ছায়ায় প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছিল বিরোধী দলগুলো। এরপর জিয়াউর রহমান ৪২ সদস্যের একটি বিশাল মন্ত্রিসভা গঠন করেন, যা ছিল তার রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার কৌশল। তবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৮২ সালে এইচ এম এরশাদের সামরিক আইন জারির মাধ্যমে এই সংসদের আয়ু শেষ হয়।
তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ নির্বাচন (১৯৮৬-১৯৮৮): ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ তার শাসনকে একটি গণতান্ত্রিক রূপ দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৬ সালের ৭ মে (বুধবার) অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ অংশ নেয়। তবে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে মাঝপথেই আওয়ামী লীগ ভোট প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয়। জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন নিয়ে জয়ী হলেও এই সংসদের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।
দুই বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ (বৃহস্পতিবার) চতুর্থ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই ভোট ছিল আরও বিতর্কিত। কারণ, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি–উভয় দলই এটি বর্জন করে। ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ নিয়ে গঠিত এই সংসদ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এর ফলে রাজপথে শুরু হয় প্রচণ্ড গণ-আন্দোলন।
নব্বইয়ের সেই উত্তাল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ সরকার দিশাহারা হয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যের কাছে নতি স্বীকার করে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার পতনের মধ্যদিয়েই দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে এবং বাংলাদেশে পুনরায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অবাধ নির্বাচনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
পঞ্চম সংসদ নির্বাচন (১৯৯১): ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, বুধবার প্রথমবারের মতো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অধীন এই ভোট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ। বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করে। পরাজয় মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভূমিকা নেন। এই সংসদ প্রায় পূর্ণ মেয়াদ অতিবাহিত করেছিল।
ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬): ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার তৎকালীন বিএনপি সরকারের অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই নির্বাচনটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগসহ সব বিরোধী দল এই ভোট বর্জন করে। একতরফা এই নির্বাচনে কেন্দ্র দখল এবং ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ আসনেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। ফলে নবনির্বাচিত এই সংসদ নৈতিকভাবে প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে।
রাজপথে বিরোধীদের প্রচণ্ড আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এই সংসদ মাত্র ১২ দিন স্থায়ী ছিল। তবে এই ১২ দিনেই বিএনপি সরকার একটি ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করে; তারা সংবিধানে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে। এরপরই সংসদ ভেঙে দেয়া হয় এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে। মূলত এই ১২ দিনের সংসদই পরবর্তী অবাধ নির্বাচনের আইনি পথ প্রশস্ত করেছিল।
সপ্তম সংসদ নির্বাচন (জুন ১৯৯৬): ফেব্রুয়ারির সেই অস্থিতিশীলতার রেশ কাটতে না কাটতেই ১৯৯৬ সালের ১২ জুন, বুধবার সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন প্রথম নির্বাচন। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন নিরপেক্ষ প্রশাসনের অধীন এই ভোট ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর এবং শান্তিপূর্ণ। দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং জাসদ ও জাতীয় পার্টির সমর্থনে সরকার গঠন করে।
ফেব্রুয়ারির সহিংসতার ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় জুনের এই ভোটে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক নিরাপত্তা ও উৎসাহ লক্ষ করা যায়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা একটি ছোট কিন্তু কার্যকর মন্ত্রিসভা গঠন করেন।
অষ্টম সংসদ নির্বাচন (২০০১): ২০০১ সালের ১ অক্টোবর, সোমবার দেশের অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমবারের মতো সফলভাবে ৫ বছর পূর্ণ করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেও, এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত।
বিচারপতি লতিফুর রহমান প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল ঘটান। ১৩ জন সচিবকে ওএসডি করা এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগকে ক্ষুব্ধ করে। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট (বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি-নাজিউর ও ইসলামী ঐক্যজোট) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বিএনপি একাই ১৯৩টি আসন পায়, আর আওয়ামী লীগ আসন সংখ্যা ৬২-তে নেমে আসে। বিজয়ী পক্ষ এই জয়কে ‘ব্যালট বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, আওয়ামী লীগ ‘স্থূল কারচুপি’র অভিযোগ এনে ফল প্রত্যাখ্যান করে এবং সংসদ বর্জন শুরু করে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে অন্ধকার দিক ছিল ভোট পরবর্তী দেশব্যাপী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ হামলা। বিশেষ করে বরিশাল, ভোলা, বাগেরহাট ও সিরাজগঞ্জে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, জমি দখল এবং নারীদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সহিংসতা ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন, যা আজও বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত।
এই নির্বাচনের মাধ্যমেই জামায়াতে ইসলামীর দুজন শীর্ষ নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পান, যা দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এই সংসদ ২০০৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদ স্থায়ী হয়।
নবম সংসদ নির্বাচন (২০০৮): ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর, সোমবার অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এই নির্বাচনের পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ এবং দীর্ঘ দুই বছরের এক বিশেষ অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের ফসল।
২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামায়াত জোটের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে রাজপথে তীব্র সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা শুরু হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করলে বিতর্ক চূড়ান্ত রূপ নেয়। এই পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (যা ইতিহাসে ১/১১ নামে পরিচিত) সেনাবাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং জরুরি অবস্থা জারি করে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের পেছনে সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান জেনারেল মইন উ আহমদের প্রকাশ্য সমর্থন থাকায় একে ‘সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলা হয়।
এই সরকার তথাকথিত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বা দুই শীর্ষ নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা করে ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত হয়। তবে তাদের অধীনেই বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসে। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং স্বচ্ছ ব্যালট বক্সের প্রবর্তন করা হয়, যা আগেকার ‘ভুয়া ভোটার’ ও ‘ভোট কারচুপি’র পথ বন্ধ করে দেয়।
দীর্ঘ দুই বছরের জরুরি অবস্থা শেষে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৩টি আসন (আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩০টি) পেয়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে হওয়া এই ভোট ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অন্যতম স্বচ্ছ নির্বাচন। সহিংসতা প্রায় শূন্যের কোঠায় ছিল এবং ২০০১ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতার বিপরীতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সম্পূর্ণ নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার সুযোগ পায়। এই জয়ের মধ্য য়েই শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং দেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে।
১০ম সংসদ নির্বাচন (২০১৪): ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি, রোববার অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি ছিল এক চরম মেরুকরণ এবং সংঘাতের বছর।
১৯৯৬ সাল থেকে চলে আসা ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমেই এই সংকটের সূত্রপাত হয়। ২০১০ সালে উচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রায় দেন। এই রায়ের প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে, যার ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয় এবং ‘নির্বাচিত সরকারের অধীনেই’ নির্বাচনের বিধান ফিরে আসে। বিএনপি ও বিরোধী জোট এই সংশোধনীর তীব্র বিরোধিতা করে এবং ‘নিরপেক্ষ সরকার’ ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
আওয়ামী লীগ সংবিধান রক্ষার দোহাই দিয়ে দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনের পথে হাঁটে, অন্যদিকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো ভোট বর্জনের পাশাপাশি দেশব্যাপী অবরোধ ও হরতাল ডাকে। ফলে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনেই প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অর্থাৎ, ভোটের আগেই অর্ধেকের বেশি আসনে জয়ী নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় সরকার গঠনের বৈধতা নিশ্চিত হয়ে যায়। এটি ছিল সংসদীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
ভোট ঠেকাতে বিরোধী দলের ডাকা হরতালে দেশজুড়ে নজিরবিহীন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পেট্রোল বোমায় বাস ও ট্রেনে আগুন, প্রিসাইডিং অফিসারদের ওপর হামলা এবং ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। নির্বাচনের দিন কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত নগণ্য। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার ভোট’ হিসেবে দাবি করলেও, পশ্চিমা বিশ্ব এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে এটি ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’ হিসেবে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে। ৫২ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন।
একাদশ সংসদ নির্বাচন (২০১৮): ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর, রোববার অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর এই ভোটকে ঘিরে দেশে-বিদেশে ব্যাপক কৌতূহল ছিল।
নির্বাচনের আগে বিএনপি ও নবগঠিত ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন করলেও শেষ পর্যন্ত তারা আলোচনার টেবিলে বসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে একাধিকবার রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সরকার সুষ্ঠু ভোটের আশ্বাস দিলে সব দল নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছিল। কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এই ভোটের আয়োজন করে।
‘রাতের ভোট’ বিতর্ক ও ফলাফল: ভোটের দিন সকালে অনেক জায়গায় কেন্দ্র খোলার আগেই ব্যালট বাক্স ভর্তি থাকার অভিযোগ ওঠে। বিদেশি গণমাধ্যম এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টেও অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই রাজনৈতিক মহলে এটি ‘রাতের ভোট’ বা ‘মিডনাইট ইলেকশন’ নামে পরিচিতি পায়। ফলাফলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে, যেখানে প্রধান বিরোধী জোট ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র ৭টি আসন।
পরাজিত পক্ষ এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ ও ‘ভোট ডাকাতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে এবং পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানায়। তবে ক্ষমতাসীনরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে একে উন্নয়নের পক্ষে ‘জনগণের রায়’ হিসেবে দাবি করে। এই সংসদের মেয়াদে ৪৮ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠিত হয় এবং সংসদ ৫ বছর পূর্ণ করে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন (৭ জানুয়ারি ২০২৪): পূর্ববর্তী দুটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এই ভোটও তীব্র বিতর্কের মুখে পড়ে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে অনড় থেকে ভোট বর্জন করে। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখাতে আওয়ামী লীগ তাদের দলের নেতাদেরই ‘স্বতন্ত্র’ বা ‘ডামি প্রার্থী’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে লড়াইটি হয় মূলত আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের মধ্যে। ২৮টি দল অংশ নিলেও কার্যত কোনো শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ ছিল না। কম ভোটার উপস্থিতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয় এই নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ ২২৩টি আসন পেয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে।
বিজয়ীদের অভিমত ও শপথের আনুষ্ঠানিকতা
প্রতিটি নির্বাচনের পর বিজয়ী দল দাবি করেছে–তারা জনগণের ভোটে এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই ক্ষমতায় এসেছে। তবে পরাজিত বা বর্জনকারী দলগুলোর কাছে এই নির্বাচনগুলো ছিল ‘গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক’। প্রতিটি নির্বাচনের পর প্রথা অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা সংবিধানের রক্ষণ ও সমর্থনের শপথ নিয়েছেন এবং বিশাল আকারের মন্ত্রিসভা (গড়ে ৪০-৪৫ সদস্য) গঠিত হয়েছে। যদিও সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েই গেছে।
আগামীকাল ত্রয়োদশ নির্বাচন: আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) দেশ যখন ত্রয়োদশ নির্বাচনের মুখোমুখি, তখন সাধারণ মানুষের চোখ এই একটি জায়গায়–অতীতের এই ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনগুলোর ছায়া কি এবার কাটবে? ইতিহাস বলছে, আগের দুটি বৃহস্পতিবারের ভোট (৪র্থ ও ৬ষ্ঠ সংসদ) ছিল বিতর্কিত। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই অপবাদ ঘুচিয়ে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট উপহার দেবে–এমনই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

