ভালো একটি বইয়ে ডুবে যাওয়ার অনুভূতিটা অনেকের কাছেই অসাধারণ। চারপাশের পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকের চেয়ে ধীর হয়, কাঁধের টান ছেড়ে যায়, মাথার ভেতরের অবিরাম মানসিক শব্দ নীরব হয়ে আসে। এই অভিজ্ঞতা শুধু বিনোদন বা জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর গভীরে রয়েছে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের জটিল কিন্তু উপকারী এক প্রক্রিয়া।
আমরা স্বাভাবিকভাবেই মনে করি বই পড়া আরাম দেয়। অতিরিক্ত উত্তেজনা ও তথ্যভারে ক্লান্ত এই সময়ে অনেকেই বইকে মানসিক ভারসাম্য ফেরানোর আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বই পড়ার সময় আসলে শরীরের ভেতরে কী ঘটে? কোন প্রক্রিয়াগুলো বই পড়াকে এতটা প্রশান্তিকর করে তোলে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে স্নায়ুবিক রাসায়নিক পরিবর্তনের ভেতরে। বই পড়া মানে শুধু পৃষ্ঠার শব্দগুলো বোঝা নয়; এটি এমন একটি জটিল স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যা আমাদের হৃদস্পন্দন থেকে শুরু করে হরমোন নিঃসরণ পর্যন্ত প্রভাবিত করে।
বই পড়ার স্নায়ুবিজ্ঞান
বই পড়ার সময় আমরা মস্তিষ্কের এমন কিছু স্নায়ুপথ ব্যবহার করি, যেগুলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন অংশের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের পূর্বপুরুষরা বই পড়তেন না, কিন্তু তারা পরিবেশ “পড়তে” জানতেন। কাদায় পশুর পায়ের ছাপ, আকাশে ঝড়ের লক্ষণ, ঝোপের নড়াচড়ায় লুকিয়ে থাকা বিপদের ইঙ্গিত- যারা এসব সংকেত বুঝতে পারতেন, তারাই টিকে থাকতেন।
এই প্রাচীন ধরণ-চেনার ব্যবস্থাই আমরা ব্যবহার করি যখন বই হাতে নিই। লিখিত ভাষার বয়স মাত্র প্রায় পাঁচ হাজার বছর, যা বিবর্তনের হিসেবে খুবই সাম্প্রতিক। তাই মানুষের মস্তিষ্কে বই পড়ার জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট স্নায়ু-কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বরং পুরোনো স্নায়ু নেটওয়ার্কগুলোই নতুন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্নায়ুবিজ্ঞানী স্ট্যানিস্লাস দেহেন এই ধারণাকে বলেছেন “নিউরোনাল রিসাইক্লিং তত্ত্ব”।
আরও পড়ুন: ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে কেন মানুষ আবারও চাঁদে যায়নি?
বই পড়ার সময় মস্তিষ্কের দৃষ্টিশক্তি-সংক্রান্ত অংশ অক্ষরের আকার চিনে সেগুলোকে শব্দে রূপান্তর করে। ভাষা-সংক্রান্ত অংশ শব্দের অর্থ খুঁজে নেয় স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে। মনোযোগ-ব্যবস্থা গল্পের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে, আর স্মৃতি-ব্যবস্থা নতুন তথ্যকে আগের জ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। একসঙ্গে বহু অংশ সমন্বিতভাবে কাজ করে।
এর ফলে পুরো স্নায়ুতন্ত্র একটি ভিন্ন অবস্থায় চলে যায়। ডিজিটাল মাধ্যম যেখানে ভাঙা ভাঙা মনোযোগ ধরে রাখে, সেখানে বই পড়া চায় একটানা মনোসংযোগ। এই দীর্ঘস্থায়ী মনোযোগ আমাদের স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রকে ধীরে ধীরে “লড়াই বা পালাও” অবস্থা থেকে “বিশ্রাম ও হজম” অবস্থার দিকে নিয়ে যায়। এর সরাসরি শারীরিক প্রভাব দেখা যায় শরীরের অন্য অঙ্গগুলোর প্রতিক্রিয়ায়। এ সময় হৃদস্পন্দন ধীর হয়, শ্বাস গভীর ও নিয়মিত হয়, পেশির টান কমে যায়।
কল্পকাহিনি পড়ার বিশেষ প্রভাব
কল্পকাহিনি পড়লে আরও একটি অনন্য ঘটনা ঘটে। মস্তিষ্কের চিত্রায়ণ গবেষণায় দেখা গেছে, গল্পে বর্ণিত অভিজ্ঞতা পড়ার সময় মস্তিষ্কের অনেক অংশ এমনভাবে সক্রিয় হয়, যেন সেই অভিজ্ঞতা বাস্তবে ঘটছে। বনে দৌড়ানোর দৃশ্য পড়লে চলন-নিয়ন্ত্রণকারী অংশ সক্রিয় হয়, আবেগের কষ্ট পড়লে সহমর্মিতা ও আবেগ-প্রক্রিয়াজাতকারী অঞ্চল প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এভাবে গল্প আমাদের জন্য তৈরি করে “মূর্ত পাঠ” অভিজ্ঞতা। কল্পনার ভেতর দিয়ে মস্তিষ্ক বাস্তব জীবনের জন্য অনুশীলন করে, কম ঝুঁকিতে নানা পরিস্থিতির মানসিক প্রস্তুতি নেয়। ফলে বাস্তব জীবনে অনুরূপ পরিস্থিতি এলে সেই স্নায়ুপথগুলো কাজে লাগানো সহজ হয়।
বই পড়াকে আরও আরামদায়ক করার ৫টি উপায়
১. বিভিন্ন ধরনের বই পড়ুন: তথ্যভিত্তিক বই বিশ্লেষণধর্মী মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে, আর কল্পকাহিনি সমস্যা সমাধানের চাপ থেকে মুক্তি দিয়ে কল্পনাকে কাজে লাগায়। মানসিক চাপ কমাতে কল্পকাহিনি বিশেষভাবে সহায়ক।
২. সময় বেছে পড়ুন: যেকোনো সময় বই পড়া উপকারী, তবে ঘুমের আগে পড়লে এর প্রভাব আরও বাড়ে। এতে স্ট্রেস-হরমোন কমে এবং ঘুমের প্রস্তুতি সহজ হয়। তাড়াহুড়া না করে এমন সময় নিন, যাতে গল্পে ডুবে যেতে পারেন।
৩. পড়ার রীতি তৈরি করুন: নির্দিষ্ট জায়গা, নির্দিষ্ট সময় বা ছোট কোনো প্রস্তুতি—এসব মিলিয়ে পাঠকে বিশেষ অভ্যাসে পরিণত করুন। এতে নিয়মিত বই পড়া সহজ হয় এবং উপকারও ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যায়।
৪. মানসিক অবস্থার সঙ্গে বই মিলিয়ে নিন: উদ্বেগে থাকলে কঠিন সাহিত্য ক্লান্তিকর লাগতে পারে। তখন হালকা কিছু দিয়ে শুরু করুন। মন শান্ত হলে ধীরে ধীরে জটিল পাঠে যান।
৫. কৌতূহলকে অনুসরণ করুন: বই পড়ার আরাম আসে গভীর মনোযোগ থেকে, জোর করে নয়। কোনো বই ভালো না লাগলে তা রেখে দিন, যেটা সত্যিই আগ্রহ জাগায় সেটাই পড়ুন।
বই পড়া স্নায়ুতন্ত্র নিয়ন্ত্রণের অন্যতম শক্তিশালী এবং সহজ উপায়। অবিরাম উদ্দীপনা আর মনোযোগহীনতার এই যুগে বই আমাদের এমন এক সুযোগ দেয়, যেখানে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে কিন্তু শরীর পায় বিশ্রাম।
তাই পরের বার যখন আপনি একটি ভালো বই নিয়ে বসবেন, মনে রাখবেন- আপনি শুধু সময় কাটাচ্ছেন না, আপনি এমন কিছু করছেন, যেটা মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করতে বিবর্তিত হয়েছে, আর আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে দিচ্ছেন নতুন করে শান্ত ও শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ।
পড়ুন:রমজানে প্রতিদিনের ধারাবাহিক ‘রহমত’
দেখুন:সচিবালয়ে কর্মচারীদের এক ঘণ্টার কর্মবিরতি, নতুন কর্মসূচি ঘোষণা |
ইমি/


