বগুড়ায় এক হাফেজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক কর্তৃক শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর ভিকটিম শিশু ও তার বাবাকে থানার ‘আলামতঘরে’ রাখার অভিযোগ উঠেছে। অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক পরিবেশে রাত কাটাতে বাধ্য হওয়ায় শিশুটি বর্তমানে মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছে। এ ঘটনায় বগুড়া পুলিশ সুপারের বরাবর পুলিশের এই অমানবিক আচরণের বিচার চেয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভিকটিমের বাবা, যিনি মামলার বাদীও। ঘটনাটি ঘটেছে বগুড়া সদর থানায়। ১৮ অক্টোবর ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়েরের পর পুলিশ মাদ্রাসার শিক্ষক মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করে। এরপর আইনগত প্রক্রিয়ায় শিশুটি ও তার পিতাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হলে তাদের রাখা হয় থানার আলামত সংরক্ষণের কক্ষে। শিশুটি জানায়, “সারারাত আমাকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। সারারাত খাবার দেয়নি। অসংখ্য মশার কামড়ে ঘুমোতে পারিনি। দুই দিন দুই রাতে মাত্র দুইবার খাবার দিয়েছে। ক্ষুধায় খুব কষ্ট পেয়েছি। বাবাকে বলেছিলাম ক্ষুধার কথা, কিন্তু বাবার কাছেও টাকা ছিল না। এছাড়া আমি প্রচণ্ড ভয়ে ছিলাম, আবার যেন কেউ খারাপ কিছু না করে।” শিশুটির বাবা বলেন, “আমি ঢাকায় মিস্ত্রির কাজ করি। গরিব মানুষ, কষ্টের জীবনে অভ্যস্ত। কিন্তু থানায় এসে পুলিশের এমন ব্যবহার হবে, তা জানা ছিল না। পুলিশ যদি এরকম হয়, তাহলে আর কার কাছে ন্যায়ের আশায় যাব?” তিনি আরও বলেন, “রাতে ছেলে পানি চাইলে তার হাতে ছিল একটি বোতল। পরে বুঝতে পারি, সেটি আসলে মদের বোতল। আমি তখন ছেলেকে বুঝিয়ে বলেছি এসব পানি ভালো নয়। সারারাত পিপাসা নিয়েই আমার অসুস্থ শিশুটিকে কাটাতে হয়েছে। কাউকে ডাকতে ভয় পেয়েছি।” এ বিষয়ে বগুড়া নারী ও শিশু আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক বলেন, “ভিকটিমকে আলামতঘরে রাখা পুলিশের মারাত্মক গাফিলতি। এমন অমানবিক আচরণের তদন্ত হওয়া উচিত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “বলাৎকার হোক বা ধর্ষণ দুটিই জঘন্য অপরাধ। তবে ছেলেশিশুর ক্ষেত্রে শারীরিক উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী না হলেও মানসিক কষ্ট গভীর হয়। এ ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি স্পষ্ট।” থানায় গিয়ে দেখা যায়, যেখানে শিশুটি ও তার বাবাকে রাখা হয়েছিল, সেখানে মেঝেতে একটি পাতলা কম্বল বিছানো রয়েছে। পাশেই দুটি ব্যাগে পুরোনো মদের বোতল, বিভিন্ন অপরাধের আলামত, ছেঁড়া কাপড় এবং ধুলোয় ভরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এমন স্থানে ভিকটিম শিশুকে রাখা হয়েছিল ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। বিষয়টি জানতে সদর থানার ওসি হাসান বাসির বলেন, “থানায় কাজের চাপ বেশি থাকায় আমি বিষয়টি বিস্তারিত জানতাম না। যদি এমন কোনো দুর্ব্যবহার হয়ে থাকে, তাহলে তা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। তবে আমরা পুলিশ হিসেবে এতটা অমানবিক হতে পারি না।” বগুড়া পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তফা মঞ্জুর বলেন, “ভিকটিম শিশুকে নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কে রাখার নিয়ম। সেখানে জায়গা না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়, তবে তা অবশ্যই নিরাপদ ও মানবিক হতে হবে।” তিনি আরও জানান, “বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” পুলিশ সুপারের বরাবর আবেদনটি হাতে পেয়ে বগুড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুসাইন মুহাম্মদ রায়হান বলেন, “আবেদনটি পুলিশ সুপারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ঘটনার দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ১৯ অক্টোবর রাতে আবারও শিশুটি ও তার বাবাকে ওই আলামতঘরেই থাকতে বাধ্য করা হয়। শিশুটির বাবা ওই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে আপত্তি জানালে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং এক পর্যায়ে তাকে মারার জন্য তেড়ে আসে। পরে কৌশলে বিষয়টি তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে তা পুলিশ সুপারকে অবহিত করেন। এরপর পুলিশ সুপারের নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটি ও তার বাবাকে উন্নত পরিবেশে স্থানান্তর করা হয়। পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের জানান, ভিকটিমকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে রাখা হয়েছে। তবে পরে জানা যায়, থানার ওসি পুলিশ সুপারকে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন আসলে শিশুটি ও তার বাবাকে তখনও থানাতেই রাখা হয়েছিল। প্রসঙ্গত, গত ১৩ অক্টোবর বগুড়া শহরের এক হাফেজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মনির হোসেন (পিতা মোস্তাফিজার রহমান, গ্রাম গাংনগড়, শিবগঞ্জ) ১৩ বছরের এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকার করেন। এ ঘটনায় সদর থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষক অন্তত চারটি মাদ্রাসায় কর্মরত অবস্থায় একাধিক শিশুর সঙ্গে এমন জঘন্য কাজ করেছেন। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ভিকটিম শিশুর প্রতি পুলিশের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল ও মানবাধিকারকর্মীরা।
পড়ুন: নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে জয়পুরহাটে র্যালী ও আলোচনা সভা
দেখুন: ভারতে প্রথম বরফ এসেছিল কিভাবে?
ইম/


