বাংলাদেশ থেকে প্রায় তিন দশক আগে অল্প কয়েকদিনের জন্য পাকিস্তানে গিয়েছিলেন শাহ আলম। কিন্তু দুই দেশের মধ্যকার তিক্ততা ও নিজের আর্থিক সংকটের কারণে তিনি মেগাসিটি করাচিতে আটকা পড়েন।
৬০ বছর বয়সী শাহ আলম এখন শুঁটকি বিক্রি করে কোনোমতে জীবনধারণ করছেন। বাংলাদেশে তাঁর মা-বাবা এবং প্রথম স্ত্রী মারা গেলেও শেষ দেখা দেখতে পারেননি। এখন তিনি জন্মস্থানে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
দীর্ঘ ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর গত মাসে ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। শাহ আলম ইতোমধ্যে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা শুরু করেছেন। ছলছল চোখে তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমি যাবই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন কিছুটা আর্থিক সমস্যা আছে। কিন্তু ঈদুল আজহার (আগামী মে মাসের শেষের দিকে হওয়ার কথা) পর ছেলেকে নিয়ে অবশ্যই যাব।’
পাকিস্তানে দ্বিতীয় বিয়ে করা শাহ আলমের এখনও বাংলাদেশে কৃষি জমি ও পৈত্রিক ঘরবাড়ি আছে। করাচির সুপরিচিত ‘বেঙ্গলি মার্কেট’-এর কাছে বসে প্রতিদিন তিনি ৭ থেকে ৯ ডলারের বিনিময়ে শুঁটকি ও চিংড়ি বিক্রি করেন। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘সবকিছু ওখানেই (বাংলাদেশ) আছে। আমি এখানে আটকা পড়ে আছি।’
শাহ আলম বলেন, ‘আমি ফিরে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। সম্পর্ক (পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে) ভালো ছিল না। আবার বাড়ি ফেরার মতো টাকাও ছিল না। এখন আমি আমার বড় ভাই এবং বিবাহিত মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই। তারা বাংলাদেশে থাকে।’
রাষ্ট্রহীন বাঙালি
বর্তমানে পাকিস্তানে অনুমানিক ১০ লাখের বেশি বাঙালি বসবাস করছেন। অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধের সময় এসেছিলেন। এখন তারা একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, পাকিস্তান তাদের কখনোই নাগরিক হিসেবে মেনে নেয়নি। ফলে শিক্ষা, ব্যবসার সুযোগ ও স্থাবর সম্পত্তির বাজার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
করাচির অন্যতম বৃহৎ বস্তি মাচ্ছর কলোনিতে বসবাস করেন ২০ বছর বয়সী হোসেন আহমেদ। এই কলোনির অধিকাংশ বাসিন্দা বাঙালি। হোসেনের কাছে পাকিস্তানের কোনো জাতীয়তা বা পরিচয়পত্র নেই। মাছের আড়তে কাজ করা এই যুবক এএফপিকে বলেন, ‘আমি (বাংলাদেশে) যাব কীভাবে? আমি সেখানে যেতে চাই। কিন্তু আমার বাবারও কোনো পরিচয়পত্র নেই।’
বাঙালি অধ্যুষিত করাচির এলাকাগুলোর বেশিরভাগই বস্তি। বাসিন্দাদের মতে, পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হওয়ার আগে থেকেই তারা এখানে বসবাস করছেন। বেশিরভাগ বাঙালি সাধারণত বস্তির বাইরে খুব একটা বের হন না। কারণ, বাইরে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ ও পাকিস্তানি নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখতে চায়।
২২ বছর বয়সী আহমেদ নামের আরেক তরুণ বলেন, তিনি একজন পাকিস্তানি, কিন্তু কোনো পরিচয়পত্র নেই। তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় সব নথি আছে। কিন্তু তাঁর পরিবার যে এখানে ১৯৭১ সালের আগে থেকে বসবাস করছে- সেটি প্রমাণ করতে পারছেন না। আহমেদ বলেন, ‘তারা আমাকে বাংলাদেশি ঘোষণা করেছে। কিন্তু আমি একজন পাকিস্তানি।’
অন্য অনেকের মতো আহমেদের আত্মীয়-স্বজনও বাংলাদেশে থাকেন। কিন্তু ‘রাষ্ট্রহীন’ হওয়ার কারণে তিনি বা তাঁর পরিবারের কেউই কখনও সাক্ষাতের সুযোগ পাননি।
সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, পরিবর্তনের আশা
২০১২ সালের পর প্রথম সরকারি সফর হিসেবে গত আগস্ট মাসে ঢাকা সফর করেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। সাক্ষাৎ করেন প্রধান উপদেষ্টা (সাবেক) মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। ইসলামাবাদ ওই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করে। মূলত, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকেই ঢাকা-ইসলামাবাদের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করে।
চলতি মাসে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর এই কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। করাচিতে জন্মগ্রহণকারী স্থানীয় রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ রফিকুল হোসেন এএফপিকে বলেন, তাঁর মতো বাঙালিরা পাকিস্তানজুড়ে বসবাস করছেন। তারা অন্য পাকিস্তানিদের মতোই অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।
করাচি পৌরসভায় বাঙালি সম্প্রদায়ের নির্বাচিত সাতজন প্রতিনিধির একজন রফিকুল। পাকিস্তানে তাঁর চতুর্থ প্রজন্ম বসবাস করছে। রফিকুল হোসেন বলেন, দুই দেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক পাকিস্তানি বাঙালিদের জন্য এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সবাই বেশ খুশি। এটি দুই দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। আগের মতো সেই ভ্রাতৃত্ববোধ জাগাবে।
পড়ুন:ইরানে ফের শুরু হয়েছে জেন-জি বিক্ষোভ
দেখুন:ভালোবাসার টানে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে মার্কিন তরুনী সামান্থা |
ইমি/


