ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’ এবং ‘২৭ দফা’র সমন্বয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। আজ শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় একটি হোটেলে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির পক্ষ থেকে এই ইশতেহার প্রকাশ করা হবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির এবারের ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ এবং খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানীসহ জনমুখী ইস্যুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নারী ও তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সমন্বয়ে ইশতেহারের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের বিভিন্ন বক্তব্য ইশতেহারে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ইশতেহারে বিএনপির ৩১ দফার আলোকে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাক-স্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদের আলোকে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার কর্মপরিকল্পনাও থাকছে।
বিএনপির ইশতেহারের অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকার আর্থিক সহায়তা অথবা চাল, ডাল, তেল, লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সমন্বয়ে খাদ্য সুবিধা প্রদান করা হবে।
প্রান্তিক কৃষকদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন করা হবে। এর আওতায় ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, সরকারি ভর্তুকি, স্বল্প মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, সেচ সুবিধা ও সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দেওয়া হবে। এছাড়া কৃষি বীমা, ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের বিশেষ সুবিধা এবং মোবাইলে আবহাওয়া ও বাজার তথ্যের সেবা নিশ্চিত করা হবে।
সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়তে প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা হবে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি মহানগর ও জেলা শহরে নাগরিকদের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আধুনিক শিক্ষা : ইশতেহারে ‘আনন্দময় শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি ও আধুনিক বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে বিশেষ পরিকল্পনা থাকছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান এবং দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তাদের ট্যাবলেট কম্পিউটার সরবরাহ করা হবে। শিক্ষামূলক ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্টারি ও অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে পাঠদান এবং নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে।
ভাষা ও দক্ষতা : ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের টিম-ওয়ার্ক, পার্সোনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময় করে তোলা হবে। দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, জাপানিজ, কোরিয়ান, ইতালিয়ান এবং ম্যান্ডারিনসহ বিভিন্ন ভাষা শিক্ষা মাধ্যমিক পর্যায় থেকে চালু করা হবে।
সহ-শিক্ষা : পাঠ্যক্রমে ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতারসহ সংগীত, নৃত্য ও নাটকের মতো সাংস্কৃতিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তৃতীয় ভাষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, আইটি ও কারিগরিসহ প্রতিটি বিশেষায়িত বিষয়ে মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করে তোলার মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। একইসঙ্গে বিদ্যমান সকল ক্যাডার ও নন-ক্যাডার শিক্ষকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হবে।
খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানী ও ধর্মীয় উৎসবে বিশেষ ভাতা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি অন্য ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য) উপাসনালয়ের প্রধানদেরও মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ রোপণ ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। নদী ও খাল খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে একে বাধ্যতামূলক করা হবে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির মাধ্যমে ১২-১৪ বছর বয়সী প্রতিভাবান খুদে অ্যাথলেটদের বিশেষ বৃত্তি প্রদান করা হবে। দেশের ৬৪ জেলায় ইনডোর সুবিধাসম্পন্ন ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ নির্মাণ করা হবে।
মেগা প্রকল্পের আড়ালেই দেশে বড় বড় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। তাই ইশতেহারে বিশাল বাজেটের প্রকল্পের চেয়ে জনকল্যাণমুখী ছোট ছোট প্রকল্প গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমানো হবে, যাতে টেন্ডারবাজি ও কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করা যায়।
এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) পূর্ণ স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি রোধে গণমাধ্যমকে ‘ওয়াচডগ’ বা পাহারাদার হিসেবে বিবেচনা করা এবং সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি ‘স্বচ্ছ প্রশাসন’ কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

