কুমিল্লার মুরাদনগরের আলোচিত ধর্ষণ মামলার মূল হোতা হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া ফজর আলীকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে শুরু হয়েছে বিভ্রান্তিকর প্রচার।
স্থানীয় সূত্র ও দলীয় নেতাদের বরাতে জানা গেছে, ফজর আলী দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। তবে গত ৫ আগস্টের পর তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে চলাফেরা শুরু করেন এবং নিজেকে বিএনপির কর্মী দাবি করতে থাকেন। এ অবস্থায়, ঘটনার পর তাকে কখনো আওয়ামী লীগ আবার কখনো বিএনপি নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছে কিছু পক্ষ।
এদিকে ধর্ষণের ঘটনায় ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া মো. সুমন রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি এবং অপর আসামি রমজান আলী, মো. আরিফ ও মো. অনিক আওয়ামী লীগ অনুসারী বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সজীব বলেন, গতকাল রাতে হিন্দু বাড়িতে একটি অনুষ্ঠান চলছিল। আমরা অনুষ্ঠান দেখছিলাম। রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে ভুক্তভোগীর চাচি এসে জানায়, পাশের বাড়িতে কিছু একটা হচ্ছে। আমরা গিয়ে দেখি দরজা ভাঙা, ভেতরে ফজর আলী জোরপূর্বক ধর্ষণ করছে। আমরা ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করি। অভিযুক্ত ফজর আলী ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপি নেতাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে ও নিজেকে বিএনপি নেতা বলে দাবি করে। এলাকায় এমন কোনো অপকর্ম নেই যা সে করেনি।
এ বিষয়ে মুরাদনগর রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আল আমিন বলেন, ফজর আলীর আওয়ামীলীগের সক্রিয় একজন নেতা ছিলেন। সে আওয়ামীলীগের সাবেক এমপি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের সকল মিছিল মিটিং এর আয়োজক ও মিছিলে নেতৃত্ব দিতেন। সে স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া খোকনের সাথে থাকতেন। এছাড়া সুমন ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি, বাকিরা আওয়ামীলীগের অনুসারি।
এ বিষয়ে মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন অঞ্জন বলেন, বিএনপির সঙ্গে ফজর আলীর কোনো সম্পর্ক নেই। সে বরং আওয়ামী লীগ করে এবং আওয়ামীলীগের এক চেয়ারম্যানের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করে। এখন অনেকে তাকে বিএনপি কর্মী হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে মহিউদ্দিন অঞ্জনের এ বক্তব্যকে “মিথ্যা ও মনগড়া” মন্তব্য বলে দাবি করেছেন রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা গোলাম কিবরিয়া খোকন। তিনি বলেন, আমি জনপ্রতিনিধি, আমার কাছে যে কেউ আসতেই পারে। কে কী মনে রাখে, সেটা আমি বলতে পারি না। আর ফজর আলীকে আমি তেমন ভালোভাবে চিনি না।
এদিকে মুরাদনগরের একটি গ্রামে বসতঘরের দরজা ভেঙে এক নারীকে (২৫) ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিষয়টি আজ রোববার (২৯ জুন) সকালে নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান।
ঘটনার পরদিন শুক্রবার দুপুরে, ভুক্তভোগী নিজেই মুরাদনগর থানায় মামলা করেন। পুলিশ আজ ভোর ৫টার দিকে ঢাকার সায়েদাবাদ এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত ফজর আলীকে গ্রেপ্তার করে। অপর চারজনকে ধর্ষণের ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সবাই মুরাদনগর উপজেলার বাসিন্দা।
মামলার এজাহারে বলা হয়, প্রায় ১৫ দিন আগে স্বামীর বাড়ি থেকে সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন ভুক্তভোগী নারী। গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ফজর আলী তার ঘরের দরজা খুলতে বলেন। তিনি রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করেন।
প্রতিবেশীরা জানান, ঘটনার রাতে ওই বাড়ি থেকে চিৎকার শুনে গিয়ে দেখেন দরজা ভাঙা এবং ভুক্তভোগী অসুস্থ অবস্থায় আছেন। তারা আরও বলেন, কিছু লোক ভিডিও ধারণ করে এবং ফজর আলীকে মারধর করে। পরে সে হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগে পালিয়ে যায়।
আজ ভোরে ঢাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ফজর আলীকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
পুলিশ বলছে, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে। এরপর তাঁরা অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত ফজর আলীকে (৩৮) ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে গ্রেপ্তার করে। ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে আরও চারজন—মো. সুমন, রমজান আলী, মো. আরিফ ও মো. অনিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও দেখে আমরা ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং মামলা নিই। তাঁর ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। মূল আসামি ফজর আলী অসুস্থ থাকায় পুলিশ লাইন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে, বাকিদের থানায় রাখা হয়েছে।
এনএ/


