রাজনৈতিক চর্চাকে যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (বিডিএসএফ) আয়োজিত “রাজনৈতিক বক্তৃতামালা”র তৃতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে রবিবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর. সি. মজুমদার আর্টস অডিটোরিয়ামে। বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত চলা এ আয়োজনে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ আগামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পথচলার দিকনির্দেশনা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে বিডিএসএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক সাবিদিন ইব্রাহিম বলেন, “বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে তাত্ত্বিক রাজনীতি ও মাঠের বাস্তবতা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠছে। আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য হলো নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকে সংলাপের মাধ্যমে বাস্তববোধে ফিরিয়ে আনা।” তিনি বিডিএসএফ-এর চলমান আলোচনাগুলোকে “রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠনের এক সেতু” হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রথম বক্তৃতায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন “এনসিপির চোখে আগামীর বাংলাদেশ” বিষয়ে বলেন, “৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমরা এমন এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছি, যেখানে তত্ত্ব কেবল বইয়ে নয়, বাস্তব রাজনীতির ময়দানেও জায়গা করে নিয়েছে।” তিনি পূর্ববর্তী সরকারের নীতির ভালো দিকগুলো শুধু বিরোধিতার কারণে বাতিল না করার আহ্বান জানান। প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামোয় ধারাবাহিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে, যেখানে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাদের ভোটের মূল্য বাড়াতে হবে—ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের সদ্ব্যবহার করেই তা সম্ভব।”
দ্বিতীয় বক্তৃতায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন “বাংলাদেশে বাম রাজনীতির ভূত-ভবিষ্যৎ” শীর্ষক বক্তব্যে বলেন, “এই বিপ্লবের সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ। কিন্তু বাস্তবে তারা খুব বেশি সুবিধা পায়নি।” তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সংস্কার কমিশনগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে, … বেতন বৈষম্য দূরীকরণে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে এবং …অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবার পথ সুগম করতে হবে।”
“রাষ্ট্র সংস্কারের রাজনীতি কি সঠিক পথে আছে?”—এই বিষয় নিয়ে বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম। তিনি বিপ্লব-উত্তর সময়ের আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, রাষ্ট্র সংস্কার তখনই সফল হবে, যখন আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয়ে জনস্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখা হবে।” তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের রাজনীতি সঠিক পথে নেই। তবে যে প্রত্যাশা নিয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল সে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দেশে স্বস্তি আসবে না।’
শেষ বক্তা নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “রাজনৈতিক দলকে আর কেবল আদর্শ দিয়ে বিচার করা যাবে না; এখন সময় এসেছে কর্মসূচি ও কার্যকারিতা দিয়ে বিচার করার।” তিনি বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে ভিন্ন মতকে সম্মান করার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।” রাজনীতিকে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে জনাব মান্না বলেন, “যে রাজনীতি বাস্তবভিত্তিক নয়, তা টেকসই হতে পারে না।”
অনুষ্ঠান শেষে মুক্ত আলোচনা পর্বে শিক্ষার্থী, গবেষক ও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা বক্তব্য রাখেন। তারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশে এ ধরনের চিন্তাশীল আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
বিডিএসএফ-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বক্তৃতামালা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক গবেষণা, নীতি-প্রণয়ন এবং নাগরিক সংলাপের এক প্রাণবন্ত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। আয়োজকরা জানান, “বক্তৃতামালা”র পরবর্তী পর্বে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি সংস্কার ও তরুণ নেতৃত্বের অংশগ্রহণ বিষয়ে বিশেষ আলোচনা হবে।
‘বাংলাদেশের চোখে বিশ্ব দেখি’ স্লোগানকে ধারণ করে ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (বিডিএসএফ)। ফ্যাসিবাদি কাঠামো যখন ধীরে ধীরে সর্বত্র ঝেকে বসেছিল তখনই তরুণদের মাঝে মুক্ত জ্ঞানের বিকাশ, প্রশ্ন করার সংস্কৃতি বিস্তারে কাজ শুরু করে প্লাটফর্মটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুতে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারী তিতুমীর কলেজসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অর্ধ শতাধিক থেকে শতাধিক পাবলিক লেকচার ও সেমিনার আয়োজন করেছে সংগঠনটি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অনেক ছাত্র নেতৃত্ব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্লাটফর্মটির সংস্পর্শে এসেছেন এবং আমাদের সভ্যরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
৫ আগস্ট পরবর্তীতেও নয়া বাংলাদেশের রূপকল্প, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও সামাজিক বিকাশ, রাজনৈতিক সংস্কার ও নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আলাপ কোন দিকে যাচ্ছে, কোন দিকে যাওয়া দরকার এ নিয়ে নীতি নির্ধারণী বিভিন্ন পাবলিক লেকচার ও নাগরিক সংলাপ আয়োজন করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় বিডিএসএফ রাজনৈতিক বক্তৃতামালা সিরিজ। দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি নির্ধারকরা আগামীর বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের রাজনৈতিক ভাবনা তুলে ধরছেন। এখন পর্যন্ত যারা আলোচনা রেখেছেন তাদের মধ্যে আছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান, মজিবুর রহমান মঞ্জু, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ।
পড়ুন : জোটের প্রার্থীদের দলীয় প্রতীক, আপত্তি জানিয়ে ইসিকে চিঠি বিএনপির


