“লবণ ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না। আর দেশের লবণ যদি অন্যের হাতে চলে যায়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?” — দেশীয় লবণ শিল্প রক্ষায় আয়োজিত বিশাল জনসমাবেশে এভাবেই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও প্রধান অতিথি ড. শরীফ জামিল।
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়ন মাঠে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে হাজারো লবণ চাষি, কৃষক ও পরিবেশ সচেতন মানুষ অংশ নেন। আয়োজনে ছিলো লবণ, মৎস্য ও কৃষি কল্যাণ সমিতি (ধারা) – পেকুয়া উপজেলা শাখা।
এক মন লবণে ৩২৮ টাকা ক্ষতি বেঁচে থাকা দায় চাষিদের। সমাবেশে বক্তারা জানান, কক্সবাজারে প্রায় ৫৫ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়, যাতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ২২ লাখ মানুষ জড়িত। কিন্তু বিদেশি লবণ আমদানির ফলে বাজারে দাম পড়ে যাচ্ছে, এবং চাষিরা প্রতি মণে গড়ে ৩২৮ টাকা করে লোকসানে পড়ছেন।
একদিকে জমির উচ্চ খাজনা, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশ বিপর্যয় এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতির অভাব — সব মিলিয়ে চাষিরা আজ দিশেহারা।
প্রধান অতিথি ড. শরীফ জামিল বলেন, “এদেশের চাষি যদি মাঠে না থাকে, তাহলে এই দেশের অর্থনীতি থাকবে কোথায়?”
তিনি বলেন, “লবণ শুধু একটি পণ্য নয়, এটি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার অংশ। আজ যেভাবে বিদেশি লবণ আমদানি করে দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করা হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে আমরা নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারাব। শুধু লাভের কথা ভেবে আমদানি নীতি সাজালে দেশের কৃষক ও চাষিরা ধ্বংস হয়ে যাবে।”
ড. জামিল আরও বলেন, “সরকার যদি দেশের প্রান্তিক চাষিদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে লবণ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও বিদেশের দখল প্রতিষ্ঠিত হবে। এটা শুধু চাষিদের সমস্যা নয়, এটা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন।”
তিনি লবণ গবেষণা কেন্দ্রের দুর্বল ব্যবস্থাপনারও কঠোর সমালোচনা করেন। বলেন, “যেখানে একটি গবেষণা কেন্দ্র আছে, সেখানে অধিকাংশ চাষিই জানেন না সেটার অস্তিত্ব। এটা চরম ব্যর্থতা।”
বিশেষ অতিথি ইকবাল হোসাইন বলেন, “আমার দেশের চাষিরা এখনও গত বছরের লবণ ঘরে ফেলে রেখেছে। কেন? কারণ তারা ন্যায্য দাম পায় না। আর বিদেশি লবণ এনে বাজার সয়লাব করা হচ্ছে।”
পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসাইন বলেন, “যেখানে দেশীয় উৎপাদন চাহিদার চেয়েও বেশি, সেখানে বিদেশি লবণ আমদানি করা শুধু চাষিদের প্রতি অবিচার নয়, এটি জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজ। সরকারকে অবিলম্বে এই অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।”ৎ
তিনি লবণ চাষিদের জন্য বিশেষ সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার দাবি জানান। বলেন, “জেলেদের জন্য প্রণোদনা থাকে, অথচ লবণ চাষিদের জন্য কিছুই নেই — এটা বৈষম্য।”
পরিবেশ ধ্বংস ও জমি দখলের অভিযোগ সমাবেশে আরও উঠে আসে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের করুণ চিত্র। বাশখালী ও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গরম পানি সাগরে পড়ায় মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণী কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা। এছাড়া ২৪ হাজার একর লবণের জমি দখল হয়ে গেছে অপরিকল্পিত শিল্পায়নের নামে।
নুরুল আলম শেখ বলেন, “মাতারবাড়ীর মতো এখানেও রামপালের পুনরাবৃত্তি চলছে। জমি দখলের জন্য দালাল নিয়োগ হচ্ছে, প্রান্তিক কৃষকদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমরা এটা আর মেনে নেব না।”
চাষিদের পক্ষে দাবি জানিয়ে উপজেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক মজিবুল হক চৌধুরী এবং লবণ চাষি প্রতিনিধি নুরুজ জমা মনজু বলেন, ওয়াকফ স্টেটের জমিতে দালালদের মাধ্যমে খাজনা আদায় বন্ধ করতে হবে। চাষিদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ ও সরকারি প্রণোদনা দিতে হবে। বিদেশি লবণ আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
সভাপতিত্ব ও উপস্থাপনা সভাপতিত্ব করেন আবুল হাসেম, প্রধান শিক্ষক, পেকুয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
উপস্থাপনায় ছিলেন পেকুয়া উপজেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক মজিবুল হক চৌধুরী।
সমাবেশ থেকে ঘোষিত প্রস্তাবনা হলো বিদেশি লবণ আমদানি বন্ধ. লবণ চাষিদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা, পরিবেশ বিধ্বংসী শিল্প প্রকল্প বাতিল, লবণ গবেষণা কেন্দ্রের কার্যকরী রূপায়ন এবং ওয়াকফ জমির দালাল চক্র রোধে আইনগত ব্যবস্থা।
পড়ুন :চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচনে কঠোর শর্ত আরোপ, ক্ষোভ ব্যবসায়ীদের


