বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শফিকুর রহমান ওরফে সাফিকুর রহমানের বাসায় শিশু গৃহকর্মী মোহনাকে বাথরুমে রাখা হতো। বাথরুমের পেস্ট ও টিস্যু খেয়ে বেঁচে ছিল সে। দীর্ঘ সময় পানির সংস্পর্শে থাকায় তার পায়ের নখে পচন ধরেছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) গৃহকর্মী নির্যাতন মামলার আসামিদের রিমান্ড শুনানির সময় শিশুটির দেওয়া জবানবন্দি থেকে এ বর্ণনা তুলে ধরেন আদালত।
ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরার আগে বলেন, ‘বিষয়টি স্পর্শকাতর। চাঞ্চল্যকর। উচ্চপদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তার বাসায় এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা জাতির জানা প্রয়োজন।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুবেল মিয়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি আসামি সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী ও অপর দুই গৃহকর্মীর সাত দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানির জন্য তাদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। বিকেলে মাথায় হেলমেট ও বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে চার আসামিকে কাঠগড়ায় তোলা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ডিএমসি)-এর ফাহমিদা আক্তার রিংকিসহ কয়েকজন আইনজীবী। শতাধিক আইনজীবী রিমান্ডের পক্ষে সমর্থন জানান।
শুনানিতে ফাহমিদা আক্তার বলেন, ভিকটিমের ওপর চার আসামি পাশবিক নির্যাতন করেছেন। সাফিকুর রহমান কী কারণে নির্যাতন করেছেন তা জানতে রিমান্ড প্রয়োজন। ১২ বছরের নিচে শিশুকে নির্যাতন করা অপরাধ। বিথী তাকে বাসায় রেখে নির্যাতন করেছেন। প্রথমে শিশুটিকে খাটে রাখা হতো, পরে নিচে, এরপর বারান্দায় এবং শেষে টয়লেটে রাখা হয়। টয়লেটের পেস্ট ও টিস্যু খেয়ে বেঁচে ছিল শিশুটি। শীতের মধ্যে তাকে শীতের কাপড়ও দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, একটি ঘরের মধ্যে শিশুটির ওপর যে ধরনের নির্যাতন হয়েছে, তা প্রকাশ করা যেত। কিন্তু তা করা হয়নি। খুন্তি গরম করে তাকে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। সরকারি উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বাসায় এমন ঘটনা দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাকর। শিশুটিকে লোমহর্ষক নির্যাতন করা হয়েছে। এ সময় তিনি সর্বোচ্চ রিমান্ড প্রার্থনা করেন।
আসামিদের পক্ষে আইনজীবী এ কে আজাদ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। তিনি বলেন, সাফিকুর রহমান অফিস করতেন, সপ্তাহে মাত্র এক দিন বাসায় থাকতেন। তিনি এ ঘটনার বিষয়ে অবগত নন। অন্য আসামিদের ক্ষেত্রেও রিমান্ড নামঞ্জুরের আবেদন জানান তিনি।
এরপর আদালত অপর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে শিশুটির শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দেন।
বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়, ১১ বছরের শিশুর শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। মাথা থেকে গলা পর্যন্ত গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়ায় ঘা হয়ে গেছে। হাতের বিভিন্ন অংশে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। লাঠি দিয়ে পেটানো হয়েছে। মসলা পেষার নোড়া দিয়ে আঙুল থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। মাথার চুল টেনে তোলা হয়েছে। উরুতে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। পায়ের আঙুলের নখে পচন ধরেছে।
আদালত শিশুর জবানবন্দির কিছু অংশও পড়েন। জবানবন্দিতে শিশু জানায়, কারণে-অকারণে তাকে মারধর করতেন গৃহকর্ত্রী বিথী। বাসার অন্যরাও মারধর করতেন। পিঠে খুন্তি দিয়ে আঘাত করা হতো, চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া হতো। বাথরুমে আটকে রাখা হতো। খাবার দেওয়া হতো না। পানিতে থাকার কারণে পায়ে পচন ধরেছে। পুরো শীতে শীতের পোশাক দেওয়া হয়নি। টয়লেটের পেস্ট ও পানি খেয়ে ছিল। বাথরুম ও আশপাশে তাকে আটকে রাখা হতো।
এ পর্যন্ত বলার পর উপস্থিত আইনজীবীরা জবানবন্দি আর না পড়ার অনুরোধ করেন। তারা বলেন, এই নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা সহ্য করা যাচ্ছে না। একপর্যায়ে আদালত সাফিকুর রহমানের স্ত্রী বিথীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি নির্যাতনের কথা আংশিক স্বীকার করেন।
পরে আদালত সাফিকুর রহমান ও গৃহকর্মী রুপালী খাতুনের পাঁচ দিন, তার স্ত্রী বিথীর সাত দিন এবং আরেক গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে গ্রেপ্তারের পর গত ২ ফেব্রুয়ারি শফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বিথীসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর গোলাম মোস্তফাকে জানান, ওই বাসায় বাচ্চা দেখাশোনার জন্য ছোট মেয়ে খোঁজা হচ্ছে। পরে তাদের সঙ্গে দেখা করেন মোস্তফা।
তারা জানায়, যাকে রাখা হবে তার বিবাহসহ যাবতীয় খরচ বহন করা হবে। এতে সম্মত হয়ে গত বছরের জুন মাসে মোহনাকে ওই বাসায় কাজে দেন মোস্তফা। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর তিনি মোহনাকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন। এরপর আর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
গত ৩১ জানুয়ারি বিথী মোস্তফাকে ফোন করে জানান, মোহনা অসুস্থ, তাকে নিয়ে যেতে। পরে গোলাম মোস্তফা গিয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাথীর কাছ থেকে মোহনাকে বুঝে নেন। তখন তিনি দেখতে পান, মোহনাকে দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম।
মোহনা ভালোভাবে কথাও বলতে পারছিল না। কারণ জানতে চাইলে সাথী সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে মোহনাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মোহনা জানায়, ২ নভেম্বরের পর বিভিন্ন সময়ে অকারণে শফিকুর রহমান ও বিথীসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা তাকে মারধর এবং আগুনে গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেন।
পড়ুন: আজ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সিইসি
আর/


