দক্ষিণ মুম্বাইয়ের অভিজাত এলাকা সোবো। যেখানে আদালতের নির্দেশ আছে, রাত ১০টার পর জনসমক্ষে যে কোনো ধরনের উচ্চ শব্দ বা কোলাহল নিষিদ্ধ। কিন্তু কে মানে কার কথা, ১৪ বছর পর টি২০ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় জয় পাওয়ার আনন্দে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের আশপাশ যেন রোববার রাতে ‘একখণ্ড নেপাল!’ ইংল্যান্ডের সঙ্গে অদম্য লড়াইয়ের পর থেকেই বিশ্বকাপে গ্যালারিতে সবচেয়ে আবেগি উপস্থিতি এই নেপালিদেরই।
হার্শা ভোগলের মতো ধারাভাষ্যকার যার সঙ্গে তুলনা করেছেন তাঁর দেখা ৯০ দশকের বাংলাদেশকে। ‘১৯৯৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কুয়ালালামপুরে এমন বাংলাদেশ দেখেছিলাম, যেখানে পুরো মালয়েশিয়া থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের ক্রিকেট দলের খেলা দেখতে এসেছিল। এবার নেপালকে দেখেও তেমনই মনে হচ্ছে। ভারতজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নেপালিরা যেন মুম্বাইয়ে চলে এসেছে।’
আসলে ১২ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখলেও এবারই প্রথম নেপাল তাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে খেলতে এসেছে। এবং মুম্বাইয়ে তাদের ক্যাম্প বসিয়েছে। এখানেই চারটি ম্যাচ খেলেছে তারা। যে কারণে ওয়াংখেড়ের প্রায় ৩৩ হাজার দর্শক গ্যালারির পুরোটাই দখলে চলে যায় নেপালিদের। নিজেদের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই সব নেপালি দর্শকের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন দিপেন্দ্র আইরিরা। সেই সঙ্গে আইসিসির সুদৃষ্টি পড়েছে হিমালয়পুত্রদের প্রতি। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে এই নেপালের মধ্যেই ভবিষ্যতের বাজার দেখছে সংস্থাটি।
হিমালয়ের কোলে বেড়ে ওঠা নেপালিদের মধ্যে এখনও জনপ্রিয়তায় শীর্ষে ফুটবল। কিন্তু ২০২৪ টি২০ বিশ্বকাপের পর থেকে পাহাড়ের গায়ে ক্রিকেট ছড়িয়েছে ভালোবাসার চাদর গায়ে জড়িয়ে। সে দেশের ভারত সীমান্ত সংলগ্ন তরাই অঞ্চলে ক্রিকেটের প্রসার বাড়ছে দিন দিন, সেই তুলনায় পাহাড়ি ও হিমালয় অঞ্চলে এখনও ফুটবলের ফ্যানবেজ বেশি। ইতিহাস বলে নেপালে ক্রিকেটের সূচনা সেই ১৯২০ সালে, তবে নেপাল ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৬ সালে। এরপর ১৯৫১ সাল থেকে পাহাড়ের গায়ে নিয়মিত ক্রিকেট শুরু হয়। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে পেশাদারিত্ব এসেছে খুব বেশি দিন হয়নি। বছর তিনেক ধরে সেখানে নেপাল প্রিমিয়ার লিগ, প্রধানমন্ত্রী কাপ, জাতীয় টি২০ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক দলগুলো নিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট হলেও সেখানে নেপাল পুলিশ, নেপাল আর্মির মতো সার্ভিসেস দলগুলোর আধিপত্যই বেশি। কেননা, ক্রিকেটারদের বেশির ভাগই এসব সার্ভিসেস দলগুলো থেকেই জাতীয় দলে আসে। তবে সম্প্রতি ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি২০ টুর্নামেন্ট চালু হওয়ায় লগ্নি বেড়েছে সেখানে। কেন্দ্রীয় চুক্তিতে লামিচানে-আইরির মতো তারকা ক্রিকেটার মাসে এক লাখ রুপি পাচ্ছেন। তার সঙ্গে স্পন্সরও মিলছে। কীর্তিপুর আর কাঠমান্ডুতে মোট তিনটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু রয়েছে নেপালের। তবে তার কোনোটিতেই ফ্লাড লাইট নেই। তাই এবারে বিশ্বকাপে আসার আগে মুম্বাইয়ে ফিটনেস ক্যাম্প করেছিল তারা। এ ছাড়া বেঙ্গালোর, আহমেদাবাদের মতো শহরে এসে তাদের দল নিয়মিত ভারতের রাজ্য দলগুলোর সঙ্গেও খেলে থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো নেপালেও তারকা ক্রিকেটারদের এখন বিজ্ঞাপন চাহিদা বাড়ছে। লেগ স্পিনার সন্দীপ লামিচানে তাদের পুরোনো তারকা, তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আইরি, কুশল, আসিফ, রোহিত, লোকশ বামরা। ইংল্যান্ডের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে মাত্র ৪ রানে হেরেছিল দলটি। শেষ ওভারটিতে স্যাম কারেনের বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ের কাছে হেরে যায় তারা। শেষে এসে তরী ডুবে বলে ‘কার্ডিয়াক কিডস’ নামের একটি ডাক নামও আছে তাদের। তবে তাদের সমর্থকরা ‘দ্য রাইনোস’ বা একশৃঙ্গ গন্ডার বলে ডাকতেই বেশি পছন্দ করেন। কেউ কেউ বীর যোদ্ধা হিসেবে গোর্খাও বলে থাকে। কিন্তু ডাকনাম যাই হোক, একটি জায়গায় তাদের নিয়ে বেশ হতাশ হয়েছেন অসি কোচ স্টুয়ার্ট ল।
ইংল্যান্ডের সঙ্গে লড়াইয়ের পর নেপালি ক্রিকেটাররা সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ায় ইতালির কাছে ১০ উইকেটে হেরেছে বলে মনে করেন তাদের কোচ। তাদের অধিনায়ক রোহিত পাউডেলও স্বীকার করেছেন তা। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে একটি আবেদন করে গেছেন তিনি সবার কাছে। ‘আমাদের আরও বেশি করে টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর বিপক্ষে খেলতে হবে। নিয়মিত বড় দলগুলোর সঙ্গে খেললে আমরা এই পর্যায়ে এসে চাপ সামলাতে শিখব।’ কোথাও গিয়ে যেন সেই ৯০ দশকের বাংলাদেশের সুর মিলে যায়। এভাবেই এগিয়ে যেতে হয়।
পড়ুন:২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সরাসরি খেলবে বাংলাদেশ, নিশ্চিত করল আইসিসি
দেখুন:সচিবালয়ে কর্মচারীদের এক ঘণ্টার কর্মবিরতি, নতুন কর্মসূচি ঘোষণা |
ইমি/


