বিশ্ব ডেনিম শিল্পে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে বাংলাদেশ। দেশের ডেনিম খাত থেকে রপ্তানি আয় ইতোমধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী উপখাত হিসেবে ডেনিমকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য—এই তিনটি কারণেই বাংলাদেশের ডেনিম শিল্প দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
গত এক দশকে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বড় বিনিয়োগে খাতটিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। প্রায় দশ বছর আগে দেশে ডেনিম মিল ছিল মাত্র ১২টি, যেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০টিতে পৌঁছেছে এবং মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায়। এসব মিল থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৪ কোটি গজ ডেনিম কাপড় উৎপাদিত হচ্ছে।
শিল্পমালিকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ডেনিম জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ হলো তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতা এবং মানসম্মত পণ্য উৎপাদন। বিশ্বের শীর্ষ ফ্যাশন ব্র্যান্ড যেমন H&M, Zara, Uniqlo, Primark, Marks & Spencer, Gap, Walmart এবং Ralph Lauren নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে ডেনিম পণ্য সংগ্রহ করছে।
দেশের ডেনিম মিলগুলো বর্তমানে স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ কাপড় সরবরাহ করছে। বাকি ৩০ শতাংশ কাপড় আমদানি করা হয় ভারত, চীন ও পাকিস্তান থেকে। তবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাপড় ব্যবহারে সময় ও খরচ কম হওয়ায় রপ্তানিকারকেরা এখন দেশীয় উৎসের ওপর বেশি নির্ভরশীল হচ্ছেন।
তবে প্রবৃদ্ধির মাঝেও খাতটি কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। শিল্প মালিকদের অভিযোগ, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা বর্তমানে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে। বিশেষ করে ডেনিম ওয়াশিং প্রক্রিয়ায় উচ্চ গ্যাসচাপ প্রয়োজন হওয়ায় উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিবেশগত দিক থেকেও ডেনিম শিল্প নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আগে এক কেজি ডেনিম কাপড় ধোয়ার জন্য ৩০০ থেকে ৩৫০ লিটার পানি লাগলেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে তা অনেক কারখানায় ৩০ থেকে ৬০ লিটারে নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে পানির ব্যবহার ১৫ লিটার পর্যন্ত নামানো সম্ভব। তবে অনেক কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ETP) থাকলেও তা নিয়মিত চালু না রাখার অভিযোগ রয়েছে, যা পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিশ্ব ডেনিম বাজারের আকার ভবিষ্যতে ৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে এই বাজারে বাংলাদেশ আরও বড় অংশীদার হতে পারবে।
পড়ুন : প্রায় শতভাগ কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ : বিজিএমইএ সভাপতি


